আরবী মাসের জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্ব পবিত্র ঈদুল আযহা উৎসব উদযাপন করেন।পবিত্র কোরআনে বর্ণিত স্বপ্নযোগে আল্লাহ 'তালার নির্দেশে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কর্তৃক তাঁর অতি প্রিয় সন্তান হযরত ঈসমাইল (আঃ)কে বলিদান বা কুরবানী করার মধ্য দিয়ে ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার নিমিত্তে মুসলমান জাতি পবিত্র ঈদুল আযহা উৎসব উদযাপন করে আসছে।(সূরা হজ্জ ৭৮)
তবে প্রিয় বস্তুকে কুরবানী করার নিয়ম মানব সৃষ্টির প্রথম থেকেই চালু হয়েছিল।হযরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিল প্রথম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী দেন।তারপর ইসলামের গোড়াপত্তনে নবী রাসূলগণ (সা.) তা পালন করে এসেছেন।তবে তখনও বিশদভাবে কুরবানীর ঈদ তথা ঈদুল আযহা ঘটা করে উদযাপন করা হতো না।হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সময় থেকে নিয়মিত আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত হয়ে আসছে।
মুসলমানদের দুইটি বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে ঈদুল আযহা দ্বিতীয়। একে কুরবানীর ঈদও বলা হয়।পবিত্র কোরআনে কুরবান শব্দটি বিদ্যমান।কুরবান একটি ফারসি শব্দ আর কুরবানী উর্দু শব্দ যার বাংলা অর্থ নৈকট্য।অর্থাৎ আল্লাহ'তালার নৈকট্যে মিলিত হওয়ার নামই হলো কুরবানী।এটিকে ঈদজ্জোহাও বলা হয়।এটি ইসলামের এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব যা সুন্নাতে ইব্রাহিম হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র মদীনায় প্রতি বছর কুরবানীর ঈদ উদযাপন করতেন।
মুসলমানরা জিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের ভিতর পশু কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সেদিন ফজররের নামাযের পর উদগাহে দুই রাক্বাত ঈদুল আযহার নামায আদায় করে আল্লাহু আকবর তাকবির দিয়ে যে যার সামর্থ্যানুযায়ী গরু,মহিষ,ছাগল,উট,ভেড়া ও দুম্বা পশু কুরবানী করেন।ঈদের নামায আদায় করা পুরুষদের জন্য জন্য ওয়াজিব আর নারীদের জন্য সুন্নাত।ঈদের দিন সকালে যাকাত আদায় করাও উত্তম নেকীর কাজ।গরু,উট ও মহিষের সাত ভাগে কুরবান করা যায়।এবং পশুদের পরিণত বয়স হলেই কেবল তাদের কুরবানী দেয়া যাবে।কোন রকম শিং ভাঙা, রুগ্ন,অসুস্থ পশুকে কষ্ট দিয়ে কুরবানী জায়েয নয়।আল্লাহ 'তালার এই পরীক্ষা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ও নান্দনিক পছন্দ প্রিয় পশুকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী দেয়া। এই মহান ত্যাগ স্বীকার আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দনীয়।পশুর মাংস বা রক্ত খোদার কাছে গিয়ে পৌঁছে না বরং মানুষের ভিতরের দৃঢ় ঈমান,তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে যায়।


পবিত্র কোরআন ও হাদীসে ঈদুল আযহাকে গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।আল্লাহ 'তালা এরশাদ করেন,"আর কোরবানি পশুকে আমি তোমাদের জন্য নির্দশন হিসেবে প্রেরণ করেছি এবং এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে।"(সূরা হজ্জ,আয়াত ৩৬)
আল্লাহ আরো বলেন,"সত্যই তুমি স্বপ্নকে সপ্রমাণ করিয়াছ;নিশ্চয়ই আমি হিতকারী লোকদিগকে বিনিময় দান করিয়া থাকি।" (সূরা সাফফাত আয়াত ১০৪)
আল্লাহ'তালা আরো বলেন,"আমি তাহাকে সাধুদিগের অন্তর্ভুক্ত এক প্রেরিত পুরুষ এসহাকের সম্বন্ধে সুসংবাদ ূান করিলাম।"
আল্লাহর জন্য মহান ত্যাগ স্বীকারে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) দ্বিতীয় পুত্র সন্তান হযরত এসহাক (আঃ) কে আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার স্বরূপ পেয়েছিলেন।আল্লাহ কাউকেই নিরাশ করেন না।তাঁর ইবাদত করে, ত্যাগ স্বীকার করে কেউ বিফল হয় না এটাই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।পবিত্র কোরআনে সূরা আস সাফফাতের ১০০ থেকে ১১২ তম আয়াতে সবিস্তারে আল্লাহ কুরবানীর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন।
তবে আমাদের হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মতো এখন আর সেই অতীব কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় না।হৃষ্টপুষ্ট দেখতে সুগড়নে সুন্দর পরিপাটি পশু কুরবানী দিলেই আল্লাহ খুশি হন।এ আমাদের জন্য অনেক বড় নিয়ামত, ফজিলত আল্লাহর পক্ষ থেকে।
কুরবানীর পশুর মাংস তিনভাগে ভাগ করা হয়। একভাগ গরীব-দুঃখীদের জন্য,একভাগ আত্মীয় স্বজনদের জন্য আর একভাগ নিজেদের জন্য।নিজেরা খাব এবং প্রয়োজনে সংরক্ষণ করে রাখব এতে ইসলামে কোন বাঁধা নেই।
'মিল্লাতে ইব্রাহিম' মূলসূত্র মতে ঈদুল আযহা পালনে আল্লাহর হাবীব প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় হিজরতের পর দেখলেন মদীনাবাসীরা জাহেলিয়া যুগ থেকে দুইটি উৎসব পালন করে আসছে যা আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও চিন্তা চেতনা ফুটে উঠত যা ছিল খুবই জঘন্য ।তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন,"আল্লাহ 'তালা তোমাদের জন্য এর চেয়েও বেশি উত্তম দুইটি উৎসব দিয়েছেন। তাহলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ।"সুনানে আবু দাউদ হাদীস নং ১১৩৪;সূনানে নাসায়ী হাদীস নং ১৫৫৬;মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং ১২০০৬।


এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত গ্রন্থ "মাআরিফুল হাদীসে" মাওলানা মনছুর নেমানী (রা.) বলেছেন," বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের উৎসব সমূহ তাদের বিশ্বাস আকিদা,চিন্তা চেতনা,ইতিহাস ঐতিহ্যের মুখপাত্র এবং তাদের জাতীয় চরিত্রের চরিত্রের দর্পন হয়ে থাকে।রাসুলুল্লাহ( সা.) আমল থেকে আল্লাহ'তালার আদেশক্রমে জাহেলিয়াত যুগের উৎসব দু'টিকে বাতিল করে ইসলামের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উম্মতের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা এই উম্মতের তাওহীদী চরিত্র ও জীবনধারার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের চিন্তা চেতনা ও বিশ্বাসের আয়না স্বরূপ।মুসলমানরা যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষা ও হেদায়েত অনুযায়ী এই দুইটি উৎসব উদযাপন করেন তাহলে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা লাভ করতে পারবেন।"
ঈদ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত বিধায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন,"আমাকে ইয়াওমুল আযহা'র আদেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে।এই দিবসকে আল্লাহ 'তালা উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।"মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ৬৫৭৫;সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস নং ৫৯১৪;সুনানে নাসায়ী হাদীস নং ৪৩৬৫।
আমাদের বাবা দাদা দাদীদের দেখতাম ঈদের দিন পশু কুরবানী করার আগে তাঁরা কিছুই খেতেন না।আমাদেরও নিষেধ করতেন।ঈদুল আযহার দিন আমাদের নবীজি (সা.) নামায আদায়ের আগে কিছু খেতেন না।জামে তিরমিযী হাদীস ৫৪২।কুরবানীর গোশত দিয়েই যেন খাবার শুরু হয় তিনি তাই চাইতেন। এইদিন সবার ঘরে দাওয়াত ও আপ্যায়ন চলে এবং ভাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয়।
কুরবানীর ঈদ মানে শুধু পশু জবাই করে গোশত খাওয়া নয় বরং এ হলো ত্যাগের স্বমহিমায় নিজেকে তৈরি করা।পরার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া,আল্লাহ'তালার নৈকট্য লাভ করে মানবপ্রকৃতির সেবার মনোভাব পোষণ করা।মনের হিংস্র পশুকে বধ করে একজন সত্যিকার ভালো মানুষে পরিণত হওয়ার উপজীব্য ধারণ করে পবিত্র ঈদুল আযহা।