শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অংকশাস্ত্রের এম, এ ছিলেন।এবিষয়ে তিনি কিছুকাল ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যাপনাও করেন। কিন্তু তিনি যখন ইংরেজী লিখতেন তা ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও অতুলনীয়। জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দী, লিয়াকত আলী খান, রাগিব হাসান, Governor Lord Brabourne, Aurther Herbert এদেরকে লেখা চিঠি-পত্রগুলো ইংরেজী ভাষায় তার দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। আওয়ামী লীগের প্রথম Secretary General শামসুল হক সাহেবের স্ত্রী আফিয়া খাতুন (পরবর্তীতে আফিয়া দিল) ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স পড়াকালে তার সাবসিডিয়ারী ছিল অংক শাস্ত্র। একই সাথে ইংরেজী ও অংক পড়াতে পারেন এমন ব্যক্তি হর-হামেশা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের সদ্য প্রায়ত শিক্ষক বাবু সুবোধ চন্দ্র সাহা একই সাথে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ইংরেজী ও অংক পড়াতে পারতেন। এমন এক অসাধারণ গুণের অদ্ভুত মিলন ঘটেছিল তার ভিতর। বাবু সুবোধ চন্দ্র সাহার একজন B.Sc পাশ সহকর্মী তাকে অনুসরণ করে ইংরেজীতে কথা বলতে চাইতেন এবং চিঠি লিখতে চাইতেন। দুঃখের বিষয় তিনি তার সাধনায় সফল হতে পারেন নি। সুবোধ বাবু দশম শ্রেনীতে অংক ও ইংরেজী পড়াতেন। অংকে দশের ভিতর দশ পেতে কিভাবে লিখতে হবে এবং কিভাবে এক ধাপ থেকে অন্যধাপে যেতে হবে এটা তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে নৈপুন্যের সাথে শিখিয়ে দিতেন। তার এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে তারই ছাত্রী শিরিন বেগম অংকে একবার একশর ভিতর একশত পেয়ে গেল। তিনি বলতেন অংকে ভুল হয়ে গেলে সেই। অংকের উপর আর চোখ বুলাবেনা। নূতন করে শুরু করবে। ওনার প্রবেশিকা পরীক্ষায় সরল অংকটিতে এই ভুল হয়েছিল।
আশির দশকে শেষের দিকে তাকে একদিন প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্যার, আপনারা বি.এ.তে কি ইংরেজী পড়তেন। তিনি বলেছিলেন; পশ্চাশের দশকে বি,এ ক্লাশে ইংরেজি এক পেপার নেওয়া যেত আবার তিন পেপারও নেওয়া যেত। আমি নিয়েছিলাম তিন পেপার। Prose I Poetry মিলিয়ে দুই পেপার আর এক পেপার ছিল English Composition, Comprehensionইত্যাদি। Poetry পড়তাম Shakespeare, Donne Pope, Dryden, Wordsworth, Coleridge, Byron, Keats, Shelley, Tennyson, Robert Frost, T. S. Eliot - কবিদের লেখা কবিতার কোনটার আংশিকআর কোনটার সম্পূর্নটাই আমাদের পাঠ্য ছিল। Coleridge Gi The Rime of the Ancient Mariner এর প্রখ্যাত চরণ He praye+h best, who loveth best বলতেই তিনি আরও পাঁচ ছয় লাইন মুখস্থ বলে গেলেন। তেমনি Wordsworth Gi Tintern Abbey I The Solitary Reaper এর বেশ কয়েকটি লাইন তার মুখস্থ ছিল। বুঝলাম পড়া - শোনায় ধার ছিল।

তখন বাগেরহাট পি. সি কলেজের Principal ছিলেন জনাব আজিমউদ্দিন আহমদ (অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের পিতা)। সুবোধ বাবু বললেন; আজিমউদ্দিন সাহেব আমাদেরকে ৬ মাস বসে Coleridge এর কবিতার মাত্র দু পাতা পড়িয়েছিলেন। তার প্রতিটি ক্লাশে প্রতিটি কথা আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। একজন সহকর্মীর কথা বলতে গিয়ে স্যার বলতেন; ওনারা যখন বিশ বা ত্রিশের দশকে স্কুলে পড়তেন তখন তাদের শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংলিশ। এই সব বিখ্যাত ইংলিশ কবিদের কবিতার কোনটার বেশী, কোনটার কম তাদের পাঠ্য ছিল। ওনরা আজও তা স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করতে পারেন। এই ভৈরব নদীর তীরে আমরা তার ইংরেজী আবৃত্তিতে শুনতাম ভৈরবী গজনের অনুনাদ। এই সহকর্মীর মৃত্যুর পরে আয়োজিত স্মরণ সভায় একজন শিক্ষক বক্তব্য প্রদান কালে ভুল বাংলা ও ভুল ইংরেজী উচ্চারণ করলে সুবোধ বাবু আক্ষেপ করে বলেছিলেন ; ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করেনি এখনও করে না। মূল কথাটি ওখানেই। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্তার দুর্বল জায়গাটিকে তিনি আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যারা ছাত্রদের পড়তে বলে তারা নিজেরা কোন পড়াশোনা করে না। মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র একই। এ দেশে যে দর্জী (tailor) তার গায়ে ছেড়া জামা, যে carpenter সে শুয়ে থাকে ভাংগা খাটে আর যিনি শিক্ষক তার বাড়িতে বাচ্চা-কাচ্চাদের বই ছাড়া অন্য কোন বই নেই। পড়া শোনার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই-এমনকি খবরের কাগজটিও তারা কালে ভদ্রে পড়ে। এক সময়ের শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক তার নিজের জেলা কিশোরগঞ্জের এক স্কুলের শিক্ষার মান বর্নণা করতে যেয়ে বলেছিলেন; আমি যখন ফিরে আসব তখন যিনি হেডমাস্টার তিনি বললেন, স্যার; কষ্ট করে গেলেন, ভালোভাবে Hospital করতে পারলাম না। এই হল আমাদের দেশের শিক্ষার হাল-হকিকাত। এই হল আমাদের শিক্ষকদের যোগ্যতা। প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষার উপকরণ ও বই-পুস্তকের মান নিয়ে পুরাণ দিনের সাথে যদি বর্তমানের তুলনা করা হয় তা হলে বলতে হবে বর্তমানে যা পড়ান হয় পূর্বে তা ছিল না। গণিত শাস্ত্রের কথায় আসা যাক calculus থেকে Vector , Tensor, Matrix, Set Theory, Theory of Probability WISY B.SC PICY VÝTA FUIYA UL স্কুল পর্যায়ে চলে এসেছে। পূর্বে শিক্ষার কোন পর্যায়ে Computer Science বলে কিছুই ছিল না। শিক্ষার মান কমেনি বরং বই -পুস্তক আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সমৃদ্ধ। তার পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের "ক” থেকে “ঘ” ইউনিট পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ছাত্রদের মাঝে এক গবেষনা কার্য ক্রমে দেখা যায় ৭০% ছাত্র শুদ্ধ বাংলা ভাষায় একটা দরখাস্ত লিখতে পারে না। বৈশ্বিক বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান একেবারেই তলানিতে। সামাজিক অস্থিরতার সাথে যুগের ধনলিপ্সা যুক্ত হয়ে তারা আজ আর মানুষ নেই। শিক্ষক-ছাত্রদের মাঝে ন্যায়-নীতি মানবতা, ইনসাফের বানী আজ নিরর্থক। শিক্ষায়তনে পড়া শোনার চাপ নেই। তারা জানে পরীক্ষা দিলেই পাস হয়ে যাবার প্রথা চালু হয়ে গেছে বহুত আগেই।


অর্থনীতিবীদ রেহমান সোবহান ও সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবাহানের পিতা -খুলনার তৎকালীন এস. পি সোবহান সাহেবের নামানুশারে ১৯৩৭ সালে কচুয়া করোনেশন সোবহান হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই স্কুলে বাবু সুবোধ চন্দ্র সাহা ৪০ বছরের অধিক সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এই দীর্ঘসময়ে তাকে সরিয়ে অন্যকাউকে প্রধান শিক্ষক করতে হবে এটা কেউই ভাবত না। উল্লেখ যোগ্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও এক সময়ের সিভিল সার্ভিসের সদস্য মরহুম দরবেশ আলী খান কিছুকাল এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
কচুয়া হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার বহুত আগে ১৯১৬ সালের দিকে সোয়ালমাঠ রশিকলাল উচ্চ বিদ্যালয় এবং মসনি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সুবোধ বাবু সোয়ালমাঠ হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।কচুয়া হাই স্কুলের একজন ছাত্র তার শিক্ষাজীবনে খুব একটা কৃতিত্বের পরিচয় না দিতে পারলেও পরবর্তী সময়ে সে বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বছর দেড়েক আগে তিনিও মৃত্যুবরণ করেছেন। তার এই কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম - স্যার; শিক্ষকতার লাইনে আসলেন কেন? তিনি আমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলেন; পারিবারিক নিরাপত্তা ও সামর্থের কথা বিবেচনা করে আমি বি. এ পাশ করার পর শিক্ষকতার লাইনই বেছে নিলাম। পরবর্তীকালে তার পেশার কোন পরিবর্তন ঘটেনি-শিক্ষক হিসেবেই তার কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। আমার সহপাঠি শিরিন বেগমকে একদা কথা প্রসংগে বললাম ঐআমার পিতার শিক্ষকতার পেশাকে আমি পছন্দ করতাম না। তাৎক্ষনিক ভাবে সে তার উত্তরে বলেছিল ; উনি হয়ত পছন্দ করতেন। শিরিন নিজেও হয়ত উন্নত বিশ্বের কোন দেশে শিক্ষার সাথে জড়িত ছিল বা আছে। আজ তাকে আমার বলতে হবে - শিক্ষকতার পেশাই যেন সবচেয়ে ভাল পেশা। শিক্ষার মর্মবানী ও মানব বিদ্যা বিবর্জিত ব্যক্তিদের বড় নেতা-নেত্রী বানাতে গিয়ে আমি জাতির সমুহ ক্ষতি করেছি। দেশবাসীর কাছে এজন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি প্রায়সই বলে থাকেন; আমিত অধ্যাপনা করতাম- তোমরা আমাকে রাজনীতিতে নিয়ে এলে কেন?
এই নিবন্ধের কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে বাবু সুবোধ চন্দ্র সাহা কচুয়া হাই স্কুলে চল্লিশ বছরের অধিক সময় প্রধান শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এতটা দীর্ঘ সময় শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত থাকা - একটি বিরল ঘটনা। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন আসবে কোন বিশেষ যোগ্যতা বা দক্ষতার কারনে সুবোধ বাবুর পক্ষে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এতটা দীর্ঘ সময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এজন্য আমাদের ইতিহাসের পাতায় তার যথার্থ উত্তর খুঁজতে হবে।


ভারতবর্ষে বুদ্ধ দর্শনের আবির্ভাব হলে খাদে ভারতেই তা ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় এবং ভারতের উত্তর, দক্ষিন ও পূর্বদিকে তা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। এক সময় এই ধর্মের যারা মহা-মনীষী ছিলেন । বিদেশ থেকে তাদের ভারতের বাইরে যাবার আমন্ত্রণ আসতে থাকে। এমনি এক আমন্ত্রণে তিব্বত রাজার অতিথি হয়ে সে দেশে গিয়েছিলেন Eye of Asia, সহস্রাব্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামের জমিদার নন্দনঅতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সংহতি, ভালবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে তিনি দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অতীশ দীপঙ্করের যখন বাইরে যাবার প্রশ্ন আসে তখন কিছু মনীষী আশংকা প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে শ্রীজ্ঞান এ দেশ ছেড়ে গেলে ভারতের জন্য তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারন হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাদের শংকা সত্যে পরিণত হয়েছিল। বহুবছর ধরে সনাতন ধর্মের বিপক্ষ প্রবল বাধার সম্মুখীন বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে বিরাট এক রক্তপাতের মধ্যদিয়ে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা। ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়ে তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। আর এই ফাক দিয়ে মুসলমানরা ভারতে প্রবেশ করে। সুবোধ বাবু কচুয়া হাই স্কুলে এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলেন যে তিনি যদি স্কুলটি ছেড়ে চলে যেতেন তা হলে এই প্রতিষ্ঠানটি। সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হত। সুবোধ বাবু হিকমতে ও হিম্মতে অতি অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন এমনটি বলা যাবে না তবে আশে - পাশে, বলেশ্বর নদীর এপারে বা ওপারে যত হাই স্কুল ছিল তার প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সেরা। তার সমপর্যায়ের বা সমকক্ষ ব্যক্তি ঐ সময়ে ঐ অঞ্চলের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত ছিল না। ষাটের দশকে পরপর দুবছর মটবাড়িয়ার কে, এম, লতিফ ইনস্টিটিউটশন থেকে যশোর বোর্ডের অধিনে ঝ.ঝ.ঈ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। তখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম ইমাদুল হক। কে, এম, লতিফ বললেই ইমাদুল হক সাহেবের নাম সমস্বরে উচ্চারিত হত। সুদীর্ঘ ৪ টি দশকজুড়ে একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে থাকার কারনে কচুয়া হাইস্কুল ও সুবোধ বাবু তেমনি সমর্থক শব্দে পরিণত হয়েছিলেন। বাগেরহাট জেলা সদরে কচুয়া ও তার আশে পাশের উপজেলা গুলােতে এমনকি নদীর ওপারে নাজিরপুরেও লােকে তাকে জানত ও চিনত কচুয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে। তার জন্মস্থানের পরিচয় গৌন হয়েগিয়েছিল। তাই হয়ত তার মৃত্যু সমগ্র জনপদে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করে একটি প্রশ্নের জবাব রেখে গেল। কে বড়? ক্ষমতার অধিকারী রাজনীতিক না শিক্ষক। আজ আমাদের জাতীয় জীবনে বড় বড় মেগাপ্রজেক্ট হচ্ছে - তেমন জাতীয় পুঁজির ও বিকাশ ঘটছে। পুঁজির যখন বিকাশ ঘটে সে প্রাথমিক পর্যায়ে বড় নিষ্ঠুর আচরন করে। নূতন পুঁজির পার্শ প্রতিক্রিয়া বর্তমান সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিদারুণ ভাবে অনুভূত হচ্ছে। তা নগর থেকে শহরে, শহর থেকে বন্দরে, বন্দর থেকে গ্রামে দ্রুত ছরিয়ে পড়ছে। গান্ধীজী ও হস একদা ভারতীয় গ্রামীন সমাজ সম্পর্কে যে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন তা আজ গান্ধীজীর অনুকুলে নয়। বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের সমাজ এখন দ্বন্ধ - সংঘাত, দ্বেষ - বিদ্বেষ, হিংসা - প্রতিহিংসায় জর্জরিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলতেন; পরশ্রীকাতরা এই শব্দটি বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায় না। অনর্জিত অর্থে ধনী হতে চাইলে সমাজে যে বিষ- ক্রিয়া হয় তা বাংলাদেশের সোটা সমাজে দ্রুত বিস্তার ঘটছে। ঐতিহাসিক ভাবে কাশ্মীরের কলহন পন্ডিত, জন টেইলর, ই, এম, ফস্টার, লর্ড মেকলে বাঙালীর চরিত্রের এই বৈশিষ্টগুলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন। যুব সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিশোর গ্যাং শব্দটি সাম্প্রতিক কালের।

গ্রামীণ সমাজ জীবনের এই পরিবর্তনের হাওয়া সুবোধ বাবুকে বিভিন্ন সময়ে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে নিজেকে তিনি নিরাপদে রাখতে পারেন নি। গ্রামীণ দুবৃত্তদের এই আক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চরকাঠি গ্রামের মােহনবাশী সাহার স্বারস্বত পুত্র সুবোধ চন্দ্র সাহা বিচলিত হয়ে নিরাপদ স্থানের সন্ধান করেন নি। তার পুত্রদ্বয় দেশে ও বিদেশে অবসুন। করলেও তিনি তার ভিটেমাটি ছেড়ে তাদের কাছে নিরাপদ - নিরুদ্বেগে বসবাসের চিন্তা করেন নি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তিনি তার জন্মভূমি ছেড়ে ভারত ভূমিতে আশ্রয় নিতে পারতেন। তা না করে তিনি এ দেশে লেখাপড়া করে বেছে নিলেন শিক্ষকতার জীবন। তালেব মাস্টারের জীবন কাহিনী যেন আমার পিতার জীবন কাহিনীর সাথে তখনকার সকল শিক্ষকের জীবন ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি । এই জীবনের উপর ভর করে মৃত্যুর শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি জন্মস্থানের বসতবাড়ি আঁকড়ে ছিলেন। তিনি অনড়াম্বর জীবন যাপন করতেন। তাঁর ভিতর বিদ্যার , অর্থের বা প্রতিপত্তির কোন দম্ভ ছিল না। শিক্ষকতাকেই জেনেছিলেন তার জীবনের অনিবার্য অবলম্বন। তাঁর ধ্যান ধারনা, চিন্তা ও স্বপ্ন সমস্তই এই শিক্ষকতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ছে।
আজ অন্তদৃষ্টি পরিজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। অল্পজ্ঞানী, অদুরদর্শী, রুচিহীন, শিষ্টাচার বহির্ভুত, শিক্ষা ও ধর্মের মর্মকথার প্রতি বিতৃষ্ণ একদল জাঁকজমকপূর্ণ লোকে রাজনীতি থেকে অর্থনীতি , শিক্ষাঙ্গন থেকে ক্রিড়াঙ্গন সবখানেই জেঁকে বসেছে। তাদের কারনে কোন মহৎ কাজ প্রেরনার উৎসহিসেবে আজ আর কাজ করছে না। এর ফলে কোন উন্নত দর্শন, কালচার বা উন্নত শিক্ষার সৃষ্টি হয় নি বরং সৃষ্টি হয়েছে লালসা, মোসাহেবী, পরশ্রীকাতরতা আর অপ্রকাশ্য গুঁড় মনবাছার কদর্যতা। সুবোধ বাবুবোধ হয় তার প্রজন্মের শেষ পুরুষ যে ঐ জনপদের কোন অতীত গৌরবকে সামনে নিয়ে আসতে পারতেন। তাই ছাত্র অবস্থাতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চাৎপদ গ্রামীন সমাজের মুক্তির পথ রুদ্ধ হয়ে আছে মূলত শিক্ষার অভাবে। সমগ্র জীবনব্যাপী শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে সেই আগলকে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। গত ২৬ শে এপ্রিল হারিয়ে গেছে সেই অকম্পিত দীপশিখার অনন্য প্রভা। কোনদিন কোন ছলনায় সে এ পথ আর মাড়াইবে না। কাউকে কোন প্রশ্ন করবে না, কোন কিছু জানতেও চাইবে না। তৎকালীন খুলনা জেলার পূর্বাঞ্চলের মানুষের মনে যারা একদা শিক্ষার আকাঙ্খ ও স্বাতন্ত্রবোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের নামের সাথে উচ্চারিত হবে আর একটি নাম - সে নাম বাবু সুবোধ চন্দ্র সাহা। আমাদের ইতিহাস ও ভবিষ্যত গাইবে সে নামের জয়গান।