অর্ক ও মিথিলা দুই ভাইবোন। অর্ক এখন প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। মিথিলা তৃতীয় শ্রেণীতে। নিয়মিত স্কুলে যায় তারা। অর্ক যখন নার্সারিতে ভর্তি হয় মিথিলা তখন প্রথম শ্রেণীতে। মাত্র তিন মাস ক্লাস করেছে ওরা। অমনি শুরু হলো লকডাউন। সেই সাথে শুরু হলো অস্থিরতা। গৃহবন্দী থেকে থেকে সন্তানরা যখন অস্থির হয়ে গেল তাদের মা তখন ব্যাকুল হয়ে তাদের বাবাকে বললেন...
একটা কিছু করো, আমি আর পারছি না। ছেলেমেয়ের যন্ত্রণায় আমি পাগল হয়ে যাবো। অর্কের বাবাও তেমনটাই অনুভব করলেন। একটু আনন্দে সময় কাটানোর কথা ভেবে সন্তানদের জন্য দুটো ছোট্ট পাখি কিনে আনলেন। লাভবার্ডস। একে তো স্কুল বন্ধ, তার ওপর রঙিন পাখি ঘরে এসেছে। এ যেন স্বর্গসুখ। নীল রঙের পাখি দুটো সত্যিই চমৎকার। এর আগে এত আনন্দিত আর কোনো দিন হয়নি তারা। দুই ভাইবোনের মধ্যে এখন আর ঝগড়া হয় না। টুকটাক যা হয় তা ওই পাখি নিয়ে। পাখিদের গান শুনায় তারা এবং নিজেদের সব খাবারের ভাগ দেয়। ওদের দেয়া সব খাবার পাখিরা খায় না বলে মন খারাপ করে। ধান, কাউন, চিনা, বাজরা, তিসি, কচি ঘাসের পাতা সরিষা, সূর্যমুখী ফুলের বীজ এগুলো পাখির খাবার। কলমির ডাঁটা ও ধনে পাতা পেলে পাখিদের আনন্দের সীমা থাকে না। কচকচ করে খেতে শুরু করে।
কিছু দিন পর মা পাখি একটি ডিম পাড়ল। তার পর আরেকটা। এভাবে একে একে ছয়টি ডিম পাড়ল। এত ছোট ডিম আর কোনো দিন দেখেনি তারা। খুশিতে আটখানা দুই ভাইবোন। মা পাখিটা তা থেকে উঠে এলেই তারা গুণে দেখে ডিম ঠিকঠাক আছে কি না। কিছু দিন পর একটি ছোট্ট ছানা ফুটল। মিথিলা ও অর্ক অবাক হয়ে গেল ছানা দেখে। শরীর একেবারে পালকহীন মসৃণ। চোখও ফোটেনি তার। আর এমনভাবে পড়ে থাকে মনে হয় যেন বেঁচে নেই। তখন দুঃখিত হতে দেখা যায় তাদের। আবার যখন ছানাটি নড়ে উঠে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দু’জনই। ডিম ছয়টি পাড়লেও ছানা ফুটেছে চারটি। মা পাখিটা কেমন করে ঠোঁট দিয়ে ছানাকে খাওয়ায়। চোখ ফোটার আগেই একটি ছানা মরে গেল। ওরা আবার গুনতে থাকে...
রইল বাকি তিন।
যখন ছানাগুলো একটু বড় হলো ওদের শরীরে পালক গজিয়েছে। সেই তিনটি ছানা আবার তিন রঙের। একটি সাদা। একটি সবুজ। আরেকটি হলুদ। ভাইবোন মিলে তিনটি ছানার নাম দিয়েছে
ধলুদিয়া, সবুজিয়া ও হলুদিয়া। ছানাগুলো একটু বড় হলে খাঁচায় পাখি হলো পাঁচটি । সারাদিন কিচিরমিচির কূজনে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে। তাই দোখেই ওদের মন ভরে যায়। সে যে কী আনন্দ!
একদিন খাবার দিতে গিয়ে অসাবধানতায় হলুদ পাখিটা খাঁচা থেকে বের হয়ে উড়ে কোথায় চলে গেল। দুই ভাইবোন দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায় চোখ বুলাতে থাকে কিন্তুকোথাও হলুদিয়ার দেখা মেলে না। তাই অর্ক ও মিথিলার খুব মন খারাপ। মা তাদের বোঝালেন...
পাখি খাঁচায় বন্দী থাকতে চায় না। ওরা ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। তাই তো সুযোগ পেয়ে তোমাদের হলুদিয়া উড়ে চলে গেছে। মন খারাপ করে কোনো লাভ নেই । সে আর কখনো ফিরে আসবে না।
এভাবে দিন চলে যেতে থাকে। মা পাখিটা আবার ডিম দিয়ে আপন মনে তা দিতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে তারা হলুদিয়ার মায়া কাটাতে শুরু করে। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলা অর্ক চিৎকার দিয়ে উঠল। ছেলের এমন গগনবিদারী চিৎকার শুনে মা-বাবা ও মিথিলা দৌড়ে গেল। গিয়ে দেখে অর্ক কাঁদছে আর বলছে...
দেখো বাবা, হলুদিয়া ফিরে এসেছে।
মিথিলাও খুশিতে কেঁদে ফেলল। চোখ মুছলেন মা-বাবাও। আর বললেন...
সত্যি উড়ে যাওয়া পাখি এভাবে ফিরে আসে তা কখনো দেখিনি।
অতঃপর হলুদিয়া নিজ পরিবারে বসবাস করে কিচিরমিচির কূজনে মাতিয়ে রাখে তাদের আপন নিলয়।