বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
(পরম করুণাময় আল্লাহর নামে)
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবারের সদস্য এবং উজ্জ্বল সৌভাগ্যবান সাহাবিদের ওপর।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমি এই প্রিয় দিনে আপনাদের আমার উষ্ণ স্বাগত জানাতে চাই, যা প্রতি বছর সউদী আরবের জাতীয় দিবসের স্মরণে আমাদের কাছে আসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য। এটি ইতিহাসের স্মৃতিতে খোদাই করা একটি দিন, যেটি সউদী নাগরিকের মনের গহিনে প্রোথিত। এই দিনে, বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান আল-সউদ (আল্লাহ তার কবরকে শান্তিময় করুন) এই মহান বিক্ষিপ্ত ভূখণ্ডটিকে একীভূত করেন, আর বিভাজন ও শত্রুতাকে ঐক্য, সংহতি এবং একীকরণে পরিবর্তন করেন। আমাদের দেশ এই মহান দিবস (৯২তম জাতীয় দিবসের বার্ষিকী) উদযাপন করছে। এটি এমন একটি চিরস্থায়ী ঘটনা এবং গৌরবময় উপলক্ষ, যে সময়টিতে এই বিশাল ভূখণ্ডের নির্মাণের মূল্যবোধ, উপলব্ধি, ত্যাগ এবং অসাধারণ প্রচেষ্টা বুঝতে পারে নতুন প্রজন্ম। এই বরকতময় ভূমি ও আমাদের প্রিয় দেশকে কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার অনুগ্রহ দানের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর পরে যাদের কৃতিত্ব সেই ব্যক্তিত্বদের জন্য আমাদের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছা প্রকাশ করার জন্য আমরা এই দিনটি উদযাপন করছি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, সউদী আরব সব ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে। অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে এ দেশের অর্জন কল্পনাতীত, তাই দেশটি আঞ্চলিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সউদী আরবের ভিশন ২০৩০ জীবনের সব দিকের জন্য অনন্য, ব্যাপক এবং অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত দিক থেকে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক সুনির্দিষ্ট গৌরবময় অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ এবং রয়েল হাইনেস ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আব্দুল আজিজের দূরদর্শী নেতৃত্বাধীন (আল্লাহ তাদের হেফাজত করুন) এই আশীর্বাদপূর্ণ দেশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে নাগরিকদের প্রয়োজন এবং তাদের মিথস্ক্রিয়াকে প্রতিফলিত করে প্রজ্ঞার সাথে এই রূপকল্প তৈরি করা হয়েছে। অল্প কথায় রূপকল্প ২০৩০কে তুলে ধরা কঠিন, কারণ এই রূপকল্পে অনেক চিন্তাভাবনা, প্রকল্প, উদ্যোগ, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য গভীর দর্শনের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি মহান উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে। কারণ এটি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ দ্বারা সুচিন্তিতভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাকে এবং তার কল্যাণকামী সরকারকে হেফাজত করুন।
এ মূল্যবান দিবস উপলক্ষে, আরব ও ইসলামী জাতির জন্য সউদী আরবের মহান সেবা আমাদের সবার স্মৃতিতে স্মরণীয় হয়ে আসছে। এই ভূমি ওহির অবতরণের স্থান, আল্লাহর বাণীর সূচনাকেন্দ্র এবং মুসলমানদের কেবলা। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগ দিয়েছে। দেশটি দুই পবিত্র মসজিদের সম্প্রসারণ কাজ থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে। সউদী রাজবংশের শাসনামলে, এই দুটি পবিত্র মসজিদ পূর্ববর্তী সব যুগের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারণ কাজের সাক্ষী হয়েছে। এতে হজ ও ওমরাহ পালন করা এবং মসজিদে নববী পরিদর্শন করা প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য খুবই সহজ এবং আরামদায়ক হয়ে উঠেছে। তাদের ভালো উদ্দেশ্য, আগ্রহ এবং আরামের সব উপায় সরবরাহ করে হজ্জের আচার-অনুষ্ঠানকে হজ্বযাত্রী এবং মসজিদে নববীর (সা.) দর্শনার্থীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক করে তুলেছে। সউদী নেতৃত্ব এ দেশের সব সুযোগ সম্ভাবনাকে তাদের সেবার জন্য আন্তরিকভাবে ব্যবহার করেছে, যা নিকটবর্তী ও প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ অনুভব করছে। দেশটি আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদসহ লক্ষ লক্ষ কপি মুদ্রণ শুরু করেছে বিতরণের জন্য, যাতে এটি ভাষা এবং স্থান নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের কাছে বোধগম্য হয়।
সউদী-বাংলাদেশ সম্পর্ক ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্কের মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সুগভীর ও চমৎকার। বিশেষ করে দুঃসময়ে সউদী আরব সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকে সাহায্য করেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে তাদের প্রসারিত সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ ইসলাম ধর্মের অনুরাগী বাংলাদেশী জাতি সউদী আরবকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী (প্রায় ২৬ লাখ) বিশ্বের বৃহত্তম শ্রমবাজার হিসেবে স্বীকৃত সউদী আরবের বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছে। প্রতি বছর সউদী আরব থেকে বাংলাদেশী কর্মীরা সাড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। এ দেশের সব মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সউদী আরবের বিরাট অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলে অনেক জেলা রয়েছে যেসব এলাকা প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হয়। সউদী আরব নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃত যে দেশটি তাদের প্রতি সর্বদা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং যখনই বাংলাদেশ দুর্যোগে আক্রান্ত হয় তখনই সাহায্য করে।
সউদী আরব তাদের জন্য বাড়ি, স্কুল, মসজিদ, এতিমখানা এবং আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মতো বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নে সহায়তা দিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা কাঠামো তৈরির পাশাপাশি হাসপাতাল, সেতু, বৈদ্যুতিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সউদী আরব সফর এবং সউদী আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি ঘন ঘন উচ্চপর্যায়ের সফরের পর সউদী-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সউদী আরবে সফর করেছেন এবং তার বিপরীতে সউদী কর্মকর্তারা বাংলাদেশে এসেছেন।
এ ছাড়া বর্তমানে সউদী কোম্পানিগুলো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিয়ম-কানুন ও ভালো প্রণোদনার কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আন্তরিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি দ্বিপক্ষীয় দৃঢ় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ২০২৬ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় পৌঁছানোর লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করবে। একটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে সউদী আরব সব সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে থাকবে, যাতে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ হয়।
অনন্ত স্মরণীয় অগ্রগতি সম্পর্কে উপরে যা বলা হয়েছে, তা কিছু আলোকিত ঝলক এবং প্রোফাইল মাত্র। আমি আমাদের দেশের নেতা ও জনগণের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাতে এ মূল্যবান উপলক্ষটি গ্রহণ করছি। আমি এ উপলক্ষে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে মুনাজাত করি যেন তিনি প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করেন যিনি আমাদেরকে এর অন্তর্গত হতে সক্ষম করেছেন। আর এ দেশটিকে তিনি আরো বেশি করে অনুগ্রহ দান করুন এবং উত্তাল আঞ্চলিক পরিবেশে সৌহার্দ্য ও নিরাপত্তার জন্য যারা এখন দেশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং নেতৃত্ব দেবেন তাদের প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করে দিন।
এ উপলক্ষে আমার এবং দূতাবাসের সব সদস্যের পক্ষ থেকে, দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং রয়েল হাইনেস ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আর মহান রাজপরিবারের সব সদস্য ও সউদী জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
এসা বিন ইউসুফ আল দুহাইলান
বাংলাদেশে নিযুক্ত সউদী আরবের রাষ্ট্রদূত
