বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরানো যায়। সচরাচর ভাসমান মেঘকে জলের ফোঁটায় পরিণত করে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। কৃত্রিম মেঘ সৃষ্টির জন্য তিনটি ধাপ আছে- মেঘ সৃষ্টি করতে হয়। মেঘকে বৃষ্টিপাতের উপযোগী অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়। তার পর মেঘ গলিয়ে বৃষ্টি ঝরানো হয়।
বৃষ্টি কী? বৃষ্টি একধরনের তরল। আকাশ থেকে মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূপৃষ্ঠের দিকে পড়ে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘের সৃষ্টি করে। এসব ফোঁটা যথেষ্ট পরিমাণ ভারী হয়ে তা পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়ে। কিন্তু বর্তমান শতাব্দীতে পানি সমস্যা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে খরাপ্রবণতা অবস্থা ও মানুষের পানি ব্যবহারে হুঁশজ্ঞান না থাকা। এখন বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রচণ্ড পানি সঙ্কটে ভুগছে। পানি সঙ্কটের কারণে ফসলি জমিতে সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কারণ পর্যাপ্ত পানির অভাব। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় সব ক’টি দেশই তীব্র পানি সঙ্কটে ভুগবে। এ অবস্থায় একমাত্র সমাধান হলো ক্লাউড সিডিং বা কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো। স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টি না হলে ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি অর্থাৎ রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিম বৃষ্টি নামানো একমাত্র সমাধান। এটি একটি যুগান্তকারী পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে একটি এলাকার গড় বৃষ্টিপাত ১০-২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভারী বৃষ্টিপাত হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেয়ার চেষ্টাও করা হয়। ঘূর্ণিঝড় প্রবল শক্তি নিয়ে লোকালয়ে আঘাত হানার আগে ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তিতে বৃষ্টি ঝরিয়ে ঘূর্ণিঝড় দুর্বল করে ফেলা যায়। সম্প্রতি এ ধরনের কাজ করেছে ইন্দোনেশিয়া। আবার খরাপ্রবণ এলাকায় ফসল ফলাতে এ পদ্ধতির জুড়ি নেই।


১৮৯১ সালে লুই গাথমান প্রথম কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টিতে তরল কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। ১৯৩০ সালের দিকে বার্গারন-ফাইন্ডিসেন বরফের স্ফটিক কণার উপস্থিতিতে অতীব ঠাণ্ডা পানির কণা জমে এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে নামে- এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তত্ত্ব তৈরি করেন। এ তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেন জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষক ভিনসেন্ট শিফার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালের জুলাইতে তিনি কৃত্রিম বৃষ্টির মূলনীতি আবিষ্কার করেন। পরে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আরভিং ল্যাংমুর সাথে যৌথভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টি করার পন্থা উদ্ভাবন করেন।
ক্লাউড সিডিংয়ে সাধারণ রাসায়নিক-সিলভার আয়োডাইড, পটাশিয়াম আয়োডাইড শুষ্ক বরফ বা কঠিন কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। তরল প্রোপেন গ্যাসও ব্যবহার করা হয়। এ গ্যাস সিলভার আয়োডাইডের চেয়ে ও বেশি তাপমাত্রায় বরফের স্ফটিক তৈরি করতে পারে। সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাবার লবণ এ কাজে বেশ কার্যকরী এবং দামে ও খুব সস্তা। তাই এর ব্যবহার বাড়ছে। ক্লাউড সিডিংয়ের উপাদানগুলো উপযুক্ত স্থানে উড়োজাহাজে করে অথবা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ সময় মেঘের ভেতরে তাপমাত্রা ২০-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে তখন তুষারপাত বেড়ে যেতে পারে। এ রকম পরিস্থিতিতে মেঘের ভেতর সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর ক্ষুদ্র স্ফটিক দানাগুলোই মেঘের সিড হিসেবে কাজ করে। আর দানায় ভাসমান জলীয়বাষ্পে পানি কণাগুলো জড়ো হয়ে বড় ফোঁটায় পরিণত হয়। তার পর ওজন বেড়ে গিয়ে মহাকর্ষের টানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।
চীনই সবচেয়ে বেশি ক্লাউড সিডিং উপায়ে বৃষ্টি ঝরায়। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক গেমসের ঠিক আগে ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টি ঝরিয়েছিল চীন। যাতে পুরো আয়োজন বৃষ্টির জন্য বিঘিœত না ঘটে। এ ছাড়াও যে সব দেশ ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তিতে বৃষ্টি ঝরায়- শ্রীলঙ্কা, ইসরাইল, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বুলগেরিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, রাশিয়া, স্লোভেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার মালি, নাইজার, মরক্কো, বুরকিনা, ফাসো ও সেনেগাল। ভারতে ও ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।