সেই ছোটবেলার কথা। অর্ধশতাব্দী তো হবেই। আমাদের দু’গ্রাম পর মল্লিøকা দীঘির পাড়। ছোটবেলার সে দীঘি তো দীঘি নয়, মনে হতো সাগরের চেয়েও বড় কিছু। আসলে তখন নদীও দেখা হয়নি। আমাদের গ্রাম থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি।
গ্রামের পুকুর আর খাল-বিল এই তো দেখা। সবে তো ক্লাস থ্রির ছাত্র। দুনিয়াদারির অনেক কিছুই দেখা হয়নি। হাটবারে খিলপাড়া হাটে, আর দাদার হাত ধরে দু’চার জন, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি পায়ে হেঁটে যাওয়া। নানাবাড়ি এক কিলোমিটার দূরে। মাঝে একটা খাল। খালের উপর একটি সাঁকো। হাতল ধরে ভয়ে ভয়ে খাল পার হতাম। নিচে তাকিয়ে ভয় পেতাম। বর্ষায় থাকত খালভর্তি পানি। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে পুঁটি, কই, শিং, খলসে, কাইক্যা মাছের লুকোচুরি খেলা দেখতাম। কেউ জাল বা বড়শি দিয়ে মাছ ধরলে বেড়াতে যাওয়ার ভাবনাটা মোটেও কাজ করত না।
মল্লিøকা দীঘির এপার-ওপার তো ধোঁয়াশার মতোই। এক পারে দাঁড়ালে অন্য পারের নিশানা যেন নেই মনে হতো। পারটা মিশে গেছে বিলের সাথে। যার জন্য বর্ষায় মনে হতো বাস্তব সাগরই।
মল্লিøকা দীঘির পাড়ে দুটো ঈদের জামাতে ১০ গ্রামের হাজার হাজার মানুষের পদচারণা। পাশে বসত মেলা। হাওয়াই মিঠাই, জিলাপি, অঙ্গুলি, খাজা-বুট-বাদাম ভাজা, নানান জাতের পিঠা তৈরি হচ্ছে আর গরম গরম বিক্রি।
একপাশে হাতপাখা থেকে টেবিল, চেয়ার, খাট, চৌকি, পিঁড়ি, বেলুন আরো কত কী! মাঝখানে রাধাচক্কর, সাইকেল খেলা, জাদু খেলা, রকমারি পরিবেশনা। ভিন্ন গাঁ, ভিন্ন জেলা থেকে পসরা নিয়ে আসত নানান মানুষ। বেদেনীদের চুড়ি, কাঁকন, বেলুন, রকমারি আলতা আর সাজানি।
একবার ঈদের নামাজ পড়ে বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে গেলাম মেলায়। দু’পয়সার বেলুনবাঁশি, এক পয়সার হাওয়াই মিঠাই খেয়ে ফুর্তি করছি। হঠাৎ চোঙের আওয়াজ পেলাম। কে একজন বলছে, জ্যান্ত ভূত, জ্যান্ত ভূত, দেখবেন তো দু’পয়সার টিকিট নিয়ে ঢুকে পড়–ন। সাবধান, গলায় তাবিজ না থাকলে ঢুকবে না। দোয়া জানা না থাকলে আসবেন না। অন্তত ‘লা-হাওলা অলা কুয়াতা’ জানতে হবে। তবেই চলবে। এক পলক দেখবেন, পয়সা উসুল। দেখবেন দূর গ্রামের শ্যাওড়া গাছ থেকে ধরে কষে বেঁধে এনেছি। আসুন, জীবনে প্রথম ভূত দেখবেন। অবিশ্বাসীরাও সাহসী হয়ে আসুন ও দেখে যান জ্যান্ত ভূত কাকে বলে?
একদল লোক প্যান্ডেলের গেট দিয়ে ভূত দেখে বেরুচ্ছে। তাদেরকে বাবা-কাকা-ভাই বলে জিজ্ঞেস করলাম কি দেখেছেন? সত্যি ভয় পাননি?
তারা তো মুচকি মুচকি হাসছেন আর লাইন ধরে বের হচ্ছেন। ভূত এমনই এর আকার কেউ বলতে পারবেন না। আসুন জ্যান্ত ভূত দেখুন। মাত্র দু’পয়সা দিয়ে টিকিট কাটুন, ভূত দেখুন।
বন্ধুদের অনেকেই আগ্রহী হলো আমি পিছপা হতেই তারা জোর করে ধরল। বলল- অই ভিতুর ডিম। আয় সবাই মিলে দেখব। দেখছিস না, সবাই হাসছে- নিশ্চয় ঘাড় মটকাবে না।
মোল্লøা-মৌলভীর বংশধর। ‘লা হাওলা থেকে আয়াতুল কুরসি পর্যন্ত পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে ওদের পেছন পেছন ঢুকলাম। যাদের দেখা হয়ে গেছে তাদের ঠেলে ঠেলে এগোলাম। প্যান্ডেলের একপাশে একটি বটগাছ। প্রথম বড় দুটো শীর্ষ ডাল ঘুরে চোখ নিচের দিকে নামালাম। বটের শেকড়ের একপাশে লাল শালু দিয়ে ঘেরা কি যেন একটা। ভিড় ঠেলে মানুষের ফাঁক গলিয়ে চার বন্ধু ঢুকে গেলাম। প্রথমবার চোখে ধাঁধা লাগল। পরের বার আবার তাকালাম। ইয়া বড় কি যেন একটা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। সারা শরীর চুন-কালিতে আঁকা। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, এ যে আমাদের পশ্চিম বাড়ির আতর আলী! ক’জন লোক মিলে ওর ১০ নাম্বারি পেটটাকে ভাসিয়ে চিৎ করে রেখেছে। হাত-পা বাঁধা। বিশাল একটা হাঁ। পা দুটো ছালার ভেতর। মাঝে মধ্যে চোখ বড় করে শোয়া থেকে উঠে বসছে আবার চিৎপাত।
আতর আলী একটা পেটুক। গ্রামের কেউ দাওয়াতে গেলে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যেত। একটা খাসি তার উদরের চাহিদাই পূরণ করতে পারত না। আমরা যারা চিনি- চোখ বন্ধ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। বেরুতে বেরুতে অনেকেই জিজ্ঞেস করছিল- আসলেই কি ভূত দেখেছ?
জবাব দিলাম- দেখে আসুন।
নিজেরা লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারিনি। সবার মতো মুচকি হেসে আমরা গরম গরম বুট ভাজা কুট কুট চিবোতে চিবোতে বাড়ি ফিরলাম।