ঠিক কতটা অবহেলা পেলে নিজেকে মানুষ ভাবতে ভুলে যায় মন জানা ছিল না নয়নের। রেললাইনের ধার, ফুটপাথ তার একমাত্র আশ্রয়। রাত কাটে তারাদের সাথে। নক্ষত্ররাই তার বিশ্বস্ত পাহারাদার। কখনো কুলির কাজ। কখনোবা ফুল বিক্রি।
একদিন এক মমতাময়ী পতিতার কোমল হাত ছুঁয়েছিল নয়নের মাথা। পরম স্নেহে দুই শ’টা টাকা দিয়েছিল। বলেছিল একটা শার্ট কিনে নিস।
সেদিন রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। রাতের বিশাল আকাশে কেবলই মাকে খুঁজেছিল নয়নের চোখ। অশ্রু ঝরে বেয়েছিল বাহুতে।
আজ আবার সেই কথা মনে পড়ে গেল। উদাসী মনে হেঁটে চলল রেললাইন ধরে। সামনে কিছু দূর। নয়ন বসে বিস্তর ভাবনায় ডুব দিলো। হঠাৎ এক ধপাস শব্দ। ফিরে দেখে এক বৃদ্ধ রেললাইনের ওপর পড়ে আছে। ট্রেন আসার সময়। নয়ন দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধকে সরিয়ে নিলো। পুকুর থেকে একটু জল আনল। মুখে ছিটিয়ে দিতেই বৃদ্ধ চোখ খুললেন। আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। বললেন কে তুমি?
‘আমি নয়ন।’
বৃদ্ধ বললেন, তুমি আমাকে নিরাপদ করেছ।
নয়ন বলল, হ্।
‘হঠাৎ অসুস্থ বোধ হচ্ছিল। তারপর কিছুই বলতে পারি না। তা তুমি কোথায় থাকো?’ বৃদ্ধ জানতে চাইলেন।
নয়ন বলল, কখনো ফুটপাথে। কখনো প্লাটফর্মে।
‘তোমার বাবা-মা?’
নয়ন বলল : ‘কেউ নেই।’
বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, তোমার খরচ?
নয়ন বলল : স্টেশনে ফুল বিক্রি আর কুলির কাজ করি। যেদিন আয় রোজগার হয় না সেদিন বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে খাই। না খেয়ে কাটে কোন কোন দিন।
বৃদ্ধ চোখ নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, আমার সাথে যাবে? আমিও একা থাকি।
বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে নয়নের বুকটা আশায় ভরে গেল। যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে হলো। বৃদ্ধের সাথে নয়ন চললো অজানা গন্তব্যে।
বিশাল গেট। নয়ন লক্ষ্য করল, গেটের এক পাশে লেখা আসগর আলী নিবাস। ভাগ্যিস এক হিজড়া তাকে অক্ষরজ্ঞান দিয়েছিল। তাই কোনো রকমে নামটা পড়তে পারল। দারোয়ান গেট খুলল। বৃদ্ধ নয়নের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। এত বড় বাড়ি নয়ন কখনো দেখেনি। বৃদ্ধ বললেন, এ বাড়িতে মানুষ বলতে আমরা তিনজনই। আমি, বাবুর্চি ও দারোয়ান। আমার দুই ছেলে। থাকে আমেরিকায়। সম্পর্কের দায়ে চার-পাঁচ বছর পর একবার আধবার আসে। ওদের মা বেঁচে নেই। আমি নিঃসঙ্গ এখানে।
নয়ন আজ থেকে তুমি আমাকে দাদু বলে ডেকো। আগামীকাল তোমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবো। এবার চলো তোমার রুম দেখিয়ে দেই।
ক’দিন পর দাদু নয়নকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। শুরু হলো অসহায় নয়ন ও নিঃসঙ্গ দাদুর নতুন যাত্রা।
ঠিক কতটা অবহেলা পেলে নিজেকে মানুষ ভাবতে ভুলে যায় মন জানা ছিল না নয়নের। রেললাইনের ধার, ফুটপাথ তার একমাত্র আশ্রয়। রাত কাটে তারাদের সাথে। নক্ষত্ররাই...
