মানুষকে মহান স্রষ্টা সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাদের সৃষ্টি নিয়ে নানা কথা। স্রষ্টার যতগুলো সৃষ্টি আছে তার মধ্যে মানুষ ও জিন ভিন্ন প্রকৃতির। মানুষ দৃশ্যমান কিন্তু জিনরা দৃশ্যমান নয়। মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার বছর আগে জিনদের এখানে পাঠায়। তারা হেন কর্ম-অপকর্ম নেই যা তারা করেনি। ফলে বিভিন্ন সময়ে তাদের গজব দিয়ে শেষ ধ্বংস কিন্তু নিপাত করেনি। মানুষ সৃষ্টিকালে ফেরেস্তারা বাধা দিয়েছিল। কিন্তু মহান স্রষ্টা কোনো বাধা তিনি মানেননি। মানুষ স্রষ্টার অনেক আদর ও আহ্লাদের। মানুষ ও জিন ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টি অন্যায় বা অপকর্ম করতে পারে না। তাদের সে যোগ্যতা স্রষ্টা দেননি। এই দুই সৃষ্টিকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন এবং তারা তা ন্যায় অন্যায় কাজে তা প্রয়োগ করতে পারে। জিনরা যেহেতু অদৃশ্য তাই তাদের কথা এখানে আলোচনার প্রয়োজন নেই।
আমাদের মধ্যে মানুষ ও অমানুষ বলে দু’টি শব্দ আছে। আসলে অমানুষ বলে স্রষ্টা কোনো প্রাণী সৃষ্টি করেনি। কর্ম দোষে মানুষকে অমানুষ বলে গালি দেয়া হয়। অমানুষ মূলত একটি গালি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম দুঃখ করে বলেছেন- ‘মানুষ আর অমানুষ দেখতে এক রকম’। কর্ম দোষের এ রকম নানা শব্দ আমাদের সমাজে প্রচলন আছে। যেমন ‘মীর জাফর’ এখন একটি গালি। নবাব সিরাজুদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান তার সাথে বেঈমানি করায় ওই নামটি এখন গালিতে পরিণত হয়েছে। এটা তার কর্মের ফল। এখন কোনো মীর বংশের ছেলে সন্তানের নাম মীর জাফর রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না মানুষ।
মানুষকে মহান স্রষ্টা বহু মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ এখানে স্রষ্টার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধি শুধু মানুষের নয় গোটা সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার প্রতিনিধি। কিন্তু আমরা তা আজ ভুলে গেছি। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের বিনিময় আমরা হেন কর্ম নেই যা করতে পারি না বা করছি না। মানুষ কি মনে করেছে যে, এভাবে চলতে থাকবে অথচ কোনো প্রতিকার হবে না? একদিন প্রতিটি সূক্ষ্ম কর্মের হিসেব নেয়া হবে। কোনোটাতে ছাড় দেয়া হবে না।


পবিত্র কুরআনের সূরা ঝিলঝালের ৭-৮ আয়াতে বলা হয়েছে ‘অতঃপর অণু পরিমাণ ভালো কাজ মানুষ দেখতে পাবে আর অণু পরিমাণ খারাপ কাজ তাও তারা দেখতে পাবে’। দুনিয়ার জীবনে মানুষ পাঁচটি বিষয়ে যথা- ক্ষমতা, পদ-পদবি, কর্ম-পেশা, ধনসম্পদ ও নারী নিয়ে যতসব ঝামেলায় লিপ্ত হয়।
এক. ক্ষমতা- ক্ষমতা একটি লোভনীয় বিষয়। ছোট-বড় সবাই ক্ষমতার পাগল থাকে। ক্ষমতা একবার পেলে জীবন চলে গেলেও আর তা ছাড়তে চায় না। বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা সব ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগ প্রয়োগ করে থাকে। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও সরকারি কর্মকর্তার ক্ষমতা কিছুটা ফরমেটিভ। উনাদের কিছু ক্ষমতা থাকলেও তারা তা কেবল একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রয়োগ করতে পারে। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি ও সরকারি কর্মকর্তারা যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেন সে জন্য তারা খানিকটা ফরমেটিভভাবে দায়িত্ব শেষ করেন। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের সদস্যদের যেহেতু বারবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ থাকে তাই তারা ক্ষমতায় আসা বা আকড়ে থাকার মানসিকতা সমাজে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করছে।
দুই. পদ-পদবি- দুনিয়াতে মানুষ পদ-পদবির জন্য লালায়িত থাকে। কোনো রকম পদ-পদবি পেলে তা যেকোনো ভাবেই না হারায় সে জন্য হেন চেষ্টা নেই যা সে করে না। প্রথমে পদ পেতে রাজনৈতিক তদবির, অর্থ বিনিয়োগ ও দলীয় আনুকুল্য পেতে যা যা করণীয় তা সম্পন্ন করে। নিয়োগ কর্তৃপক্ষ কি চায়, তাদের খুশি করতে কী কী করা দরকার তা সবই তিনি করে থাকেন। তিনি যদি সরকারি কর্মচারী হয়ে থাকেন তা’হলে রাষ্ট্রের চেয়ে নিয়োগ কর্তাদের প্রতি নজর বেশি থাকে। জনগণ সেখানে কোনো বিষয়ই নয়। নিজের পদটিকে রাখার জন্য বা আরো ভালো পদ লাভের বিবেক বিক্রি করে তিনি কখনো কখনো জনগণের ওপর অন্যায়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক পদ-পদবি পেতে প্রতিপক্ষকে জানে মালে ক্ষয়ক্ষতি করতে আজ বিবেক নাড়া দেয় না।
তিন. কর্ম পেশা- নিজ কর্ম বা পেশা, তা ব্যবসাই হোক বা চাকরিই হোক কর্মের যাতে কোনো সমস্যা না সে জন্য তিনি ব্যাকুল থাকেন। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো বালাই নেই। বৈধ ও অবৈধতার কোনো বাদবিচার নেই। মনে রাখতে হবে মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ায় আগে, মায়ের পেটে থাকতে পিতা-মাতা বা রাষ্ট্র অথবা কেউ যখন খাবার-দাবারের কোনো ব্যবস্থা করে নাই, তার খাবারের ব্যবস্থা করেছে অদৃশ্য কোনো এক শক্তি। তার প্রতি রুজু হলে দুনিয়াতে তার রুজি রোজগারের কোনো অভাব হবে না।


চার. ধনসম্পদ- দুনিয়াতে মানুষের ধনসম্পদের প্রতি আগ্রহ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হলেও মরার পর আপনার ধনসম্পদ আপনার কোনো কাজে আসবে না, যেটুকু আপনি মানব কল্যাণে কাজে ব্যয় করেছেন ততটুকু ছাড়া। মানুষ ছাড়া দৃশ্যত অন্য কোনা প্রাণী ধনসম্পদ উপার্জন করে না। আবার তারা না খেয়েও থাকে না। আপনি সৃষ্টি সেরা জীব হয়েও হারাম-হালাল বাদবিচার না করে দিদারছে ব্যবসায়ে ফাঁকি দিচ্ছেন, চাকরিতে হারাম পয়সা উপার্জন করছেন। ঠিকাদারির কাজ পাওয়ার জন্য অন্যায়ভাবে অন্য ঠিকাদারদের সিডিউল ছিনতাই করছেন অথবা তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো ভয় আপনাকে থামাতে পারছে না। হারাম অর্থ উপার্জন করে তা রেখে চলে যাওয়ার পর সন্তানরা সুখে আছে এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষ দুনিয়াতে এসে ধনসম্পদের জন্য পাগল হয়ে গেছে। রাশিয়া এখন নিজে নানা সঙ্কট সৃষ্টি করছে এবং ইউক্রেনকে কোনো কিছু রফতানি করতে বাধা দিচ্ছে। ফলে বিশ্ব এখন নানা সঙ্কটে আবর্তিত হচ্ছে। জানা যায় খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টির জন্য মানুষ খাদ্যশস্য পানিতে ফেলে পৃথিবীতে কৃত্রিম সঙ্কটের জন্ম দিচ্ছে।
পাঁচ. নাারী- নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ একটি সহজাত বিষয়। এভাবেই আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। যখন সেই আকর্ষণ বিবাহের আগে হয় সেটিই কাল হয়। বিবাহের পর স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ প্রতিটি নারী-পুরুষের জন্য নেয়ামত। আজ বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগের ফলে তা আজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ ভিন্ন পথে পা বাড়াচ্ছে। এখানে রাজা-উজির বলে কোনো কথা নেই বা ভবিষ্যৎ রাজাও এখানে বাদ যাচ্ছে না। নৈতিকতার মান এত নিচে নেমে যাচ্ছে যেকোনো নারী অন্যায়ভাবে হেনস্তার শিকার হলে প্রয়োজনে তাকে হত্যা করেও আলমত বিনষ্ট করতে দ্বিধা করছে না শক্তিশালীরা। প্রযুক্তি সঠিক ব্যবহার এখানে রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে না। নারীর মন রক্ষা করতে গিয়ে নবী ইয়াহিয়া আ:-কে শহীদ করেছে সে যুগের পাষণ্ড রাষ্ট্রশাসক। যুগে যুগে দেশে দেশে এমন নজিরের অভাব নেই। ইদানীং সরকারি ইডেন কলেজ ওই আগুনে জ্বলছে।


পৃথিবীর যত বড় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, অন্য মন্ত্রী বা উজির নাজির যেই হোন না কেন ক্ষমতায় আছেন মানুষ আপনার সাথে সম্মানের সাথে মানুষ মোলাকাত করে। আপনি একটু মরে দেখেন। মরার এক মিনিট পর কেউ আপনার সাথে মোলাকাত করবে না। মরার এক মিনিট পর কারোর সাথে আপনার হাতের স্পর্শ লাগলে সে ভালো করে হাত না ধুয়ে অন্য কিছু স্পর্শ করবে না বা ওই হাত দিয়ে খানাপিনা করবে না। আপনাকে তখন বলবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী. স্পিকার, প্রধান বিচারপতি অথবা অন্য মন্ত্রী বা উজির নাজিরের লাশ। আপনার আদরের সন্তানরাও তখন বলবে- এটা আমার আব্বার লাশ। তারাও আর আপনাকে বাবা বলবে না, ঘরে তুলবে না। যে আপনি, আপনার প্রাণের সন্তানদের সব সময় কোলে-পিঠে আদর করেছেন, তাদের জন্য দুনিয়ার ঘুমকে হারাম করেছেন। সেই সন্তান আপনি মরে গেলে আপনার কাছে আসতে চাইবে না। জীবিত আপনি আর মৃত আপনির মধ্যে পার্থক্য কত একবার অনুভব করে দেখুন।
মানুষ তার জ্ঞান বুদ্ধিকে সঠিক কাজে না লাগিয়ে ভিন্ন পথে ব্যয় করছে। তাই এখন আর মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞানও এখন কল্যাণ ছাড়া ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। আজকের রাশিয়া, মিয়ানমার ও ইসরাইল কোনো ভিন্ন ঘটনা নয়। আসলে এখানের মানুষগুলো দখল করে অমানুষের কাতার।