নতুন বছরের স্বাদই আলাদা, এমনটাই আমাদের মনে জাগে। কিন্তু আসলেই কি তা সত্য? এই প্রশ্নটি জাগছে আমার মনে। কেননা, ২০২২ সালের শেষ সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও আমরা সব কিছুই সহজ স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে। সূর্য যেমন ডুবেছে ৩১ ডিসেম্বরের সন্ধ্যায়, পয়লা জানুয়ারির সূর্যটিও একই শোভা নিয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। কারণ সময় ও প্রকৃতির এই কর্মগতি অবিভাজ্য। আমরা সময়কে ভাগ করে নিয়েছি নিজেদের সুবিধার জন্য, প্রকৃতি বা সূর্য তা করেনি। এ জন্য ৩১ ডিসেম্বরের আলো আর পয়লা জানুয়ারির সূর্যের আলোর মধ্যে কোনো তফাত নেই। তফাত কেবল গণনায়। আমরা কী গুনি (গণনা)?
নিজের কর্মফল, নিজের ভবিষ্যৎ? কাজের একটি রূপ বা আকার আমরা আঁকতে পারি। আর ভবিষ্যতের স্বপ্নেরও আকার তৈরি করতে পারি। কিন্তু সেই স্বপ্ন যতক্ষণ পর্যন্ত স্ট্রাকচারে পরিণত হতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার কর্মযোগ্য ফল নেই। আবার সেই কাজের ব্যবহার উপযোগিতাও বিবেচনার বিষয় আছে। তার ওপরই নির্ভর করছে কাজটি জনগণের জন্য কতটা উপকারী। কল্যাণকর বা উপকারী না হলে সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো মানে নেই, অপচয় ছাড়া। আর কে না জানে সরকারের মূল লক্ষ্য জনগণের উপকার সাধন করা। কেননা, সরকারের তহবিলের টাকাটা মূলত জনগণের। সেজন্য জনগণের কল্যাণ ও উপকারের বিষয়টি স্বপ্নকল্পনার সঙ্গে, পরিকল্পনার সঙ্গে, বাস্তবায়নের সঙ্গে ওতপ্রোত। কিন্তু আমাদের সরকার এবং সরকারগুলোর রাজনৈতিক অভিলাষের সঙ্গে জনগণের মৌলিক চিন্তা-ভাবনার তেমন কোনো মিল নেই। যা আছে তাকে যৎসামান্যই বলা উচিত। কারণ জনগণের বৃহত্তর অংশ বাস করেন গ্রামে। তারা রাত দিন খেটে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে এবং নগরবাসীর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে। বিপরীতে তাদের অবদান অস্বীকার না করলেও ইগনোর করতে ভালোবাসে। তার একটি নমুনা হচ্ছে সরকার ঘোষণা করেছিল কৃষককে মাগনা সার দেবে আর ১০ টাকায় চাল দেবে। তার কোনোটাই হয়নি। কারণ ওই ঘোষণা ছিল মিথ্যা আশ্বাস এবং অবাস্তবও।
আরো একটি উদাহরণ দিলেই তা বোঝা যেতে পারে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রাণপণ করছেন। লক্ষ্যটা ভালো। কিন্তু তার বেইজ বা ভিত্তি তৈরি না করেই সেই কাজের সূচনা করা হয়েছে। বেইজ হলো গ্রামের ৮০ শতাংশ মানুষকে শিক্ষিত না করে, তাদের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা কতটা উপকারী হবে, তা বলাই বাহুল্য। এ-কারণে এই প্রকল্প তেমনভাবে এগোয়নি। এগোনোর জায়গা যে আজো কাঁচা অবস্থায় রয়ে গেছে।


ক. দেশের সব গ্রামে বিদ্যুৎ কি গেছে?
খ. সব গ্রামের মানুষ কী শিক্ষা পেয়েছে কী করে তারা ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশ করবে, কাজ করবে? দেশের সব শিশু কী শিক্ষার প্রাথমিকের স্তর অতিক্রম করেছে? আজও দেশের হাজার হাজার গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নেই। যেসব গ্রামে আছে, সেগুলোর অধিকাংশ স্কুলেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। বছরের পর বছর সেই সব প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক বঞ্চনায় আছে।
গ. দেশে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ও কলেজের শিক্ষক ডিজিটাল জিনিসটা কি তা জানেন? তারা কী শিক্ষা দেবেন তাদের ছাত্রদের? ব্যবহারিক জীবনে তারা কিভাবে ডিজিটাল কর্মযোগ গ্রহণ করবেন?
ঘ. সরকার এখন ঘোষণা করছে স্মার্ট অভিধাটি। দেশকে স্মার্ট করে তোলার জন্য যে শিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞান ও বিদ্যার প্রসার ঘটাতে হবে, তার ধারেকাছেও নেই সরকারের চিন্তার রূপায়ণ।
ঙ. এসব ঘোষণা যে ফানুস বা অলীক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সব কিছুর আগে তৃণমূলের যে ভিত্তি সেটা সৃষ্টি করতে হবে। কাগজে কলমে আর মিডিয়াতে বলা মানেই সেটা বাস্তব নয়্ বরং অবাস্তব ও পরিকল্পনার স্বপ্নচারিতা মাত্র। স্বপ্ন ছাড়া যেমন পরিকল্পনার নকশা করা যায় না, তেমনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেও থাকতে হয় বাস্তবতার নিরিখ। আমাদের স্বপ্ন আছে ১৪২ তলা সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের কিন্তু তার বাস্তব উপযোগিতা ও সুযোগ সামান্যই আছে। কোনটা আমাদের আছে আর কোনটা নেই সেটা আগে বুঝতে হবে।
দ্বিতীয় উদাহরণ দেয়া যাক রাজধানী মহানগর থেকে।
খুবই ছোট বিষয়, কিন্তু তার উপযোগিতা এই মহানগরের তৃণমূলের কাছে খুবই জরুরি। সরকার গণপরিবহনে ই-টিকিট সিস্টেম চালুর জন্য বেসরকারি বাসগুলোতে হাতে ব্যবহারযোগ্য মেশিন দিয়েছে। বাসে চলতে গিয়ে প্রথম দিন ভালো লাগল। কিন্তু তারা কনডাক্টর তিন-চারজনের টিকিট করল, সবার করল না। বুঝতে পারলাম না, এর কী কারণ। এরপর কোনো ই-টিকিটের ব্যবহার দেখিনি আমি। বরং ১৫ টাকার ভাড়া কুড়ি টাকা নিতে কার্পণ্য করছে না হেলপার কনডাক্টরগণ।


প্রশ্ন হলো, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা শ্রমিক নেতা, মালিক নেতারা এই সিস্টেমটাকে যানবাহনে চালু করতে পারলেন না কেন? পারলেন না, কারণ তারা এই ব্যবস্থা চান নাই বা এটা তারা বিশ্বাস করেন না। সরকার চাইলে তা বাস্তবায়ন হবে না কেন? যদি বাস্তবায়নের যোগ্যতা না থাকে সংশ্লিষ্টদের তাহলে সব কিছুর আগে যোগ্য করে তুলতে হবে। কিন্তু তা করা হয়নি বা হচ্ছে না। তার মানে সরকারের যোগ্যতার ঘাটতি আছে। এসব কর্মযোগীদের দিয়ে কি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বেন সরকার? এসব ঘোষণা যে কতটা অবাস্তব ও অপরিকল্পিত, অনভিজ্ঞতার ফসল তা জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
ঢাকা মহানগরের যাতায়াতব্যবস্থাকে মসৃণ বা দ্রুতগতিসম্পন্ন করার জন্য নেয়া হয়েছিল ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত। অনেক ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। অনেক যানবাহনও সে সবে চড়তে গিয়ে যেমন জ্যামে কাই হচ্ছে, তেমনি নেমেও পড়ছে জ্যামের সিংহ দরোজায়। ফলে ২৮ মিনিটের রাস্তার জন্য ব্যয় হচ্ছে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। এতে করে প্রতিদিন যানবাহনের তেল/ডিজেল/অকটেন কতো বেশি পুড়ছে? কতো লাখ কর্মঘণ্টা হজম হয়ে যাচ্ছে পথে, সেই হিসাব করলে (অবশ্যই সরকার সেই হিসাব করেছেন) ফ্লাইওভার যাত্রায় জনগণের টাকা বিনিয়োগ করতেন না এবং এই ফ্লাইওভারের যুগের সূচনা শেষ হতে না হতেই আমরা এসে পড়লাম মেট্রোরেলের সুপারসনিক যুগে।
মেট্রোরেলে পথ-নকশা তৈরি হয়েছে। সংশোধন হয়েছে। ৬টি মেট্রোপথ সৃজনের যে মহা বা মেগা প্রকল্প নিয়ে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে পল্লবী ও আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল, তারপর কমলাপুর পর্যন্ত যে নকশাটি ধরে বাস্তবায়ন সর্বপ্রথম হচ্ছে, তার খণ্ডিত অংশ (দিয়াবাড়ি টু আগারগাঁও) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন ২৮ ডিসেম্বর। প্রশ্নটি হচ্ছে এত দীর্ঘ সময় পেয়েও কেন ওই লাইনের কাজ ঠিকাদার শেষ করতে পারল না? আর কেন তাঁকে খন্ডিত লাইনের উদ্বোধন করতে হচ্ছে বা হলো? কেন এবং কারা তাঁকে প্ররোচিত করলেন ওই খণ্ডাংশ উদ্বোধনের জন্য। এর পেছনের কারণ বা রহস্য কি? এত তড়িঘড়ি করার পেছনে কি এমন উদ্দেশ্য? সরকার প্রধান কি এতটাই নাজুক যে তাকে খণ্ডিত একটি যাতায়াতব্যবস্থা উদ্বোধন করতে হবে? সরকারের এই মানসিকতার পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।


এই মেট্রোরেল-এর লাইনটি যদি মতিঝিল পর্যন্তও চালু হতো, তাহলে ব্যবহারকারীগণ উপকৃত হতেন। কিন্তু আগারগাঁও পর্যন্ত যাত্রীরা গিয়ে পড়বেন আবারও জ্যামের সড়কে। ঠিক ফ্লাইওভারগুলোতে যে জ্যাম হচ্ছে এখানেও তাই হবে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য যাত্রীদের জন্য সুদৃশ্য বিআরটিসির ডবলডেকার রেখেছেন, কিন্তু সেগুলোও যে জ্যামে আটকে থাকবে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবেন?
এগুলো কেবলই প্রশ্ন। এর জন্য সংশ্লিষ্টদের কোনো উত্তর দিতে হবে না। কারণ, এটা পরীক্ষার হল নয়। তবে কথা হচ্ছে যাত্রী সাধারণের জন্য সুব্যবস্থা করার যে মন-মানসিকতা তা যে ভেস্তে দেয়া হলো সেটাই আসল। কারণ, মেট্রোরেল বলুন বা ফ্লাইওভার, সরকারের সব উদ্যোগই তো জনগণের জন্য, জনগণের অর্থে, জনগণের দীর্ঘমেয়াদি উপকারের জন্য। কিন্তু সেটা যদি প্রাক্কলিত সময়ে শেষ বা সম্পন্ন করা না যায়, তাহলে তার দায় কার? সেটা নিশ্চয় সরকার প্রধানের নয়। সে দায় নিশ্চয়ই ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের? (ডিএমটিসিএল)। এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে প্রশ্নটি এখনো কেউ তোলেনি। তুলবে যদি সত্য সত্যই স্বপ্ন দেখানো ৬টি মেট্রোরেল লাইন বাস্তবায়ন হতে পারে নির্ধারিত সময়ে, তাহলে প্রশ্নটি সামনে আসবে।


আমাদের মনে আরো বহু প্রশ্নই উদিত হচ্ছে নতুন বছরের নতুন আলোতে দাঁড়িয়ে। কেননা, আমরা পুরাতন বছরের লিগেসি টানব কেন? এই মহানগরকে অপরিকল্পিতভাবে বাড়তে দিচ্ছেন কেন সরকার(গুলো)। সরকারের পরিকল্পনাগুলো কেন ভেঙে দিচ্ছে রাজউক/ডিআইটি? কেন বাড়ি নির্মাতারা বিল্ডিং কোড মানছেন না? কেন খাস ভূমি কিছু ভূমিদস্যু গ্রাস করে চলেছে, কিন্তু তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, দেশের ৮৫ হাজার গ্রামের জনগণের সার্বিক সাংবিধানিক অধিকার কায়েমের নকশা না করে, রাজধানীকে কেন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে? সেটা কি যাতে কেন্দ্রীভূত প্রশাসন আর ক্ষমতার নর্দমাগুলোকে আরো গান্ধা করার জন্য।
প্রশ্নগুলো বহু হতে পারে। কেন গাঁয়ের মানুষরা গ্রাম ছেড়ে শহরে, মহানগরে আসছে বস্তিবাসী হবার জন্য? কেন রাজধানী তাদের অর্থনৈতিক টার্গেট? লোকেরা বলে ঢাকায় টাকা ওড়ে? সেই উড়ে চলা টাকা ধরার জন্য তারা ঢাকায় আসে। গ্রামে তাদের কাজ নেই। খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিকতার অভাব। সরকারের প্রণোদনা এখানে তুলনামূলকভাবে কম। অথচ গ্রাম উন্নয়নই সবচেয়ে জরুরি। আমাদের অর্থনীতির আশি শতাংশই কৃষির অবদান। অথচ সেই কৃষি ও কৃষকই সব থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত। কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরগণ মহানগরের বাসিন্দা। তাই রাজধানীতেই সব কিছু করার পরামর্শ দেয় তারা।
এভাবেই আমাদের স্বপ্ন কল্পনাগুলো অপরিকল্পনা, হোমজিক্যাল ও অপরিণামদর্শী হয়ে উঠেছে।
আমরা কবে এ ধরনের রুটসলেস চিন্তার রাজনীতি ও প্রশাসনের কুপরামর্শ থেকে মুক্তি পাবো?