মহাজগতের রহস্যময় সৃষ্টি মানুষ। বিচিত্র তাদের জীবন। ঐশ্বর্যের অনুপম মাধুর্যে ভরপুর। অপরাপর সৃষ্টির সাথে রয়েছে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। প্রাণী ও ফেরেশতাকুল থেকে আলাদা ধারায় গতিশীল। মানুষ যেভাবে স্বাধীন একইভাবে আবার একটি বাঁধনে আবদ্ধ তাদের জীবন। এ জীবনে আছে নানা বৈচিত্র্য। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার সমবায়। জীবনের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে নতুন নতুন ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। নানা জনপদের মানুষের আছে চিন্তাধারার স্বাতন্ত্র্য। স্বকীয়তা। মানুষ একা থাকতে করতে পারে না। মিলেমিশেই তাদের বসবাস। সমাজের রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন জীবনের জন্য গুরুত্ববহ। যেখানে একে অপরের তরে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ অবারিত। মানুষের ভালোবাসা জীবনকে সৌন্দর্যময় করে তোলে। আদর্শ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সমাজ। মূল্যবোধের বিকাশে সমাজ হয় উন্নত।
মানুষের জীবন মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রতীক। সমাজেই এর বিকাশ। প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষভাবে সমাজকে ঘিরে এর অনুবর্তন। উন্নত সমাজের চিত্র আর অধঃপতিত সমাজের প্রতিকৃতি কখনো এক নয়। সত্য সুন্দরের লালন আর দুষ্টের দমন সমাজেরই অন্তর্গত। সামাজিকতায় মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। অপরের কল্যাণে নিবেদনের ভাবনা প্রবল হয়। জীবনের দুঃখ-দুর্দশা ভাগাভাগির সুযোগ সৃষ্টি হয়। আনন্দের অংশীদারিত্বও এর মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। জীবন স্বচ্ছন্দে ভরে ওঠে। অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্য এখানেই। নৈতিকতার কোনো স্পর্শ নেই এদের। আর মানুষ নৈকিতার গুণে দ্যুতিময়। মূল্যবোধে উজ্জীবিত। তাই মানুষের মর্যাদা অনেক উন্নত। মহিমান্বিত।
মূল্যবোধ মানুষের জীবনের রক্ষাকবচ। যে সমাজে ভালোর কদর আছে, প্রতিভার মূল্যায়ন আছে, সেখানে তা-ই ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। আর যেখানে গুণীদের কদর নেই সেখানে জ্ঞানীদের জন্মও হয় না। আর জ্ঞান প্রজ্ঞার লালন ছাড়া সমাজ ডুবে যায় অজ্ঞানতার গহিন অন্ধকারে। জীবনেও নেমে আসে হতাশা। নিরাশার অথৈ সাগরে দিগবেদিক ছুটতে থাকে মানুষ। ঠিকানহীন তরীর মতো। যার নেই কোনো মনজিল। নেই কোনো কাণ্ডারী। অবশেষে জীবন নদী যেন হারিয়ে যায় ব্ল্যাক হোল বা অন্ধকার গহ্বরে। যেখান থেকে আর ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকে না। হারিয়ে যায় চিরকালের তরে।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে অনৈতিকতার বিষবাষ্প। এ বাতাস যেন সব জায়গা দখল করে নিয়েছে। রক্তপ্রবাহ যেভাবে শরীরকে কার্যকর রাখে তেমনি নৈতিক মূল্যমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। দিকনির্দেশনা দেয়। ভুলপথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসে। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ধাবিত করে। সত্য সুন্দরের প্রতি প্রাণিত করে। অপর দিকে, রক্তপ্রবাহের অভাবে শরীর অকার্যকর হয়ে যায়। একইভাবে মূল্যবোধের অভাবে মানুষের জীবনকে গতিহীন হয়ে পড়ে। প্রাণহীন হয়ে যায় জীবনের পথ চলা। স্বপ্নহীন জীবনের মূল্যও কমে যায়। নতুন সৃষ্টির নেশা জাগে না। উদ্যমতা বিদায় নেয়। দিন দিন এর মাত্রা বাড়তে থাকে।
সমাজের সর্বস্তরে যেন অনৈতিকতার সয়লাব। মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার আয়োজন চলছে সর্বত্র। এমনকি খাবারে ভেজালের প্রবণতা বোধ হয় বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোথাও নেই। স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভাব সর্বত্র। শিশুখাদ্য থেকে শুরু থেকে সব ক্ষেত্রে ভেজালের সয়লাব। সামান্য মুনাফার জন্য যারা এ কাজে লিপ্ত তাদের জীবনও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। অন্যের ক্ষতির বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে নিজেরাই। অপরের অকল্যাণ যে নিজেরই অকল্যাণ ডেকে আনা। এমনকি তাদের কলিজার টুকরো সন্তানরাও এতে হুমকির মুখে পড়ছে। ভয়াবহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এগুলো প্রতিকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। জবাবদিহিতার বিন্দুমাত্র আলামত নেই কোথাও। বিবেকের যেন মৃতু ঘটেছে। অদৃশ্য শক্তির হাতে সব বন্দী।
সত্য চিরকালই সত্য। ন্যায় চিরকালই ন্যায়। এমনকি অনৈতিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিরাও স্বীকার করেন সত্যকে সত্য হিসেবে। মিথ্যাকে মিথ্যা। তবুও মানুষ ডুবে আছে গহিন অন্ধকারে। লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ অকল্যাণ ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না। অপরের অধিকার হরণে মনুষ্যত্বেরই অবমাননা। অপমান করা হয় নিজেকেই। ভাবনার বিষয় হলো- কীসের নেশায় তারা বিভোর। আলোর পথে আসতে বাধা কোথায়। মূলত সাময়িক মোহ মানুষকে আত্মিক প্রশান্তি দিতে পারে না। এক জীবনে মানুষের কতটুকুই বা ভোগের ক্ষমতা রয়েছে। ভোগের সুখ খুবই সীমিত। ত্যাগের সুখ অনাবিল। ত্যাগের মহিমায় ভরে ওঠে জীবন।
পরিবারকে ঘিরে বেড়ে ওঠে একটি শিশুর জীবনের নানা বাঁক। কালের কপোলতলে সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে জাতির কর্ণধার। বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসার পরশে তার বৃদ্ধি ঘটে। দিন দিন আমরা ব্যস্ততার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছি। শিশুদের মানসিক বিকাশে তাদের সময় দেয়ার মতো ফুরসত কোথায়। ব্যস্ততার যেন অন্ত নেই। তাদের জীবনকে সম্পদের পাহাড়ে ডুবিয়ে দিতে আমরা অধিক মনোযোগী। মূল্যবোধের বাগানের সুরভি তাদের কাছে পৌঁছানোর পদক্ষেপ খুবই গৌণ। এমনটি তাদের সামনেই আমরা অসুন্দর আচরণ করে বসি। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। জন্মগতভাবে তারা সত্যকে ভালোবাসলেও আমাদের আচরণে- কথা-কাজে বৈপরীত্য দেখে তাদের কোমল মনে দাগ কাটে। একসময় তারাও এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কলিজার টুকরো সন্তানদের মিথ্যা বলাটা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। চেতনা ফিরতে ফিরতে বেলা অনেক বয়ে যায়। আফসোসের পাল্লা ভারী হতে থাকে। এমনকি তাদের ফেরানোর পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়ে যায়।
নতুন প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি, বন্ধু-বান্ধবী ও জাঙ্ক ফুডে আসক্ত। প্রযুক্তির অপব্যবহার ডেকে আনছে ভয়াবহ পরিণতি। মোবাইলের ব্যবহারের ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম অতি অল্প সময়ে ব্যবধানে মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। প্রযুক্তির নেশায় বড় বড় অঘটনও ঘটতে দেখা যায়। বিপথগামী বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গও কখনো কখনো কোমলমতি শিশু-কিশোরদের বিপথগামী করে তুলছে। এমনটি বাবা-মায়ের অজান্তেই ঘটে যাচ্ছে বড় বড় দুর্ঘটনা।
শিক্ষার মানে মূল্যায়িত হয় একটি জাতি। শিক্ষানীতি, পাঠ্যসূচি, শিক্ষার পরিবেশ একটি অপরটির পরিপূরক। জাতিকে এগিয়ে নিতে আগামী প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যোগ্য বানাতে শিক্ষাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই জাতীয় চাহিদা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে প্রণীত হয় শিক্ষানীতি। আর শিক্ষাঙ্গনগুলো থাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন। শিক্ষকদের মূল্যায়ন অন্য সবার চেয়ে ওপরে। কেননা, তারাই পরবর্তী প্রজন্মের মূল কারিগর। বাকি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও আর্থিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় তারা অগ্রগণ্য। শিক্ষাঙ্গনের অবকাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি থাকে উন্নত। এমনটি সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবাইকে তদের আউডি কার্ড প্রদর্শন করে প্রবেশ করতে হয়। এটি শুধুই জ্ঞানচর্চা ও মানুষ গড়ার সূতিকাগার। শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত। সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে তারা গড়ে তোলে নিজেদের। কালের কপোলতলে তারাই জাতির নেতৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করেন। জাতিও এগিয়ে যায় উন্নতি ও সমৃদ্ধির কাক্সিক্ষত মনজিলে।
বেদনার্ত হৃদয়ে বলতে গেলে আমাদের আফসোসের যেন অন্ত নেই। যে নতুন প্রজন্ম শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরুবে আলোকিত মানুষ হয়ে। সেখানকার দৈনন্দিন ঘটনাবলি আমাদের অন্তরকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। অনৈতিকতার সয়লাবে ভরপুর শিক্ষাঙ্গন। অস্ত্রের ঝনঝনানি, অনৈতিক কার্যকলাপের উত্তরোত্তর প্রতিযোগিতা, শিক্ষাঙ্গনে বহিরাগতের অবাধ বিচরণ পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই অনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোমলমতি নারী শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাদের অনৈতিক ছবি ও সংবাদ আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এত কিছুর পরও এর নেই কোনো প্রতিকার। ক্ষেত্রবিশেষে তারাই আবার পুরস্কৃত হয়ে থাকে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে মায়ের কোলে ফিরে যাচ্ছে সন্তানের লাশ। মায়ের বুকে এর চেয়ে বড় বেদনা পাহাড় আর কী হতে পারে! বাবার কাঁধে সন্তানের লাশের বোঝার চেয়ে ভারী বোঝা বোধ হয় পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই। আর আগামী প্রজন্মের এই বেড়ে ওঠায় জাতির আগামী দিন গহিন অন্ধকারের নিমজ্জিত হতে চলেছে। এমনকি শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষিত হওয়ায় মেরুদণ্ডহীন জাতির হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আমাদের বোধ হয় আর বেশি কাল অপেক্ষা করতে হবে না।
আমাদের কোমলমতি শিশুদের জীবন ভরে ওঠা উচিত শিক্ষার আলোয়। যেন অন্তরে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন পৃথিবী। স্বপ্নের ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় দিগন্তপানে। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের মনোবলে তারা এগিয়ে চলবে। জাতিকে নিয়ে যাবে উন্নয়নে শিখরে। প্রেমের বাণী, সত্যের আলো জ্বলজ্বল করবে তাদের মনের গহিনে। যার পরশে আলোকিত হবে জাতি। উন্নত হবে জীবন। বিদূরিত হবে অন্ধকারের সব কালিমা। পতাকা উড়বে সত্যে, ন্যায়ের।
আলোকিত জীবন গড়ার প্রধান উপাদান নৈতিক মূল্যবোধ। মূল্যমানের অন্তর্গত শক্তি খুবই প্রবল। সমাজের গহিনে লুপ্ত অনৈতিক প্রবণতার অপনোদনে চাই দৃঢ় মনোবল। সত্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। মূল্যবোধের প্রতি প্রবল ভালোবাসা। পরম স্র্রষ্টার প্রতি জবাবদিহিতার তীব্র অনুভূতি। চাই মানুষের প্রতি ভালোবাসার পরশ। যে ভালোবাসায় জাগতিক সব মোহ হয়ে যাবে গৌণ। অনৈতিক প্রাপ্তি কখনো হৃদয়ে প্রশান্তি দিতে পারে না। সাময়িক ভালোলাগার অনুভূতি ক্ষণস্থায়ী। চিরন্তন প্রেমের সুবাসে মন ভরে যায়। অন্তর আলোময় হয়ে ওঠে। যে আলোর পরশে আমাদের সমাজও ভরে উঠবে সুন্দরের সুরভিতে। স্বপ্নময় হবে মানুষের জীবন। সত্য ন্যায়ের আলিঙ্গনে ভেঙে যাবে সব অনৈতিকতা পাহাড়। গড়ে উঠবে একটি সুন্দর পৃথিবী। আগামী দিনের ঠিকানা।
