বছর শেষ হয়। বছর শুরু হয়। শুরু হয় নতুন বছর। শুরু হয় নতুন দিনের সূচনা। যদিও প্রতিটি দিনই নতুন হয়ে আসে। প্রতিটি সূর্যই নতুন। সূর্য যখন ওঠে না, তখনও সূর্য আছে। আমার সূর্যোদয় তখনি, যখন আমার আকাশে তার আবির্ভাব। যখন আমার আকাশে থাকে না। তখনও থাকে। বর্ষপরিক্রমায় হিসাব আছে, কখনও চন্দ্রের, কখনও সূর্যের। পৃথিবী যেহেতু ঘুরছে সূর্যের চারদিকে, তাই একদিকে যখন দিন, অন্যদিকে তখন অন্ধকার। কিন্তু আল্লাহ্র দুনিয়ায় সূর্য চন্দ্র নক্ষত্ররাজি সবই একইভাবে বিরাজমান। একই পথে ধাবমান। নতুন দিনের প্রভাতে কত চিন্তারা এসে ভিড় করে। কত চিন্তা মাথা তোলে। দেয়ালের চারপাশে জমে আছে বই আর বই। তার একটি টেনে এনে লিখতে বসি। অবাক হয়ে ভাবি হাফিজের চারটি লাইন নিয়ে যদি ভাবতে বসি, তাহলে কত সহজেই একটি ঘণ্টা পেরিয়ে যাবে। হাফিজ বলছেন, ‘শেষতক যা বপন করেছ তাই পাবে। যার পেছনে কোনদিন সময় দাও নি, তা পাবে কেমন করে’? আল্লাহ্কে ভাবোনি চব্বিশটি ঘণ্টার একটি সেকেন্ডও, অথচ আশা করছ অলৌকিকভাবে তার দর্শন পাবে। তোমার সব কিছু সে পরিবর্তন করে অলৌকিক যানে নিয়ে যাবে বেহেশ্তের অলিন্দে, তাই কি হয়? হাফিজ বলছেন, প্রতিটি মানুষই যখন থাকে প্রকৃতিস্থ অথবা যখন সুরার লহরে সম্পূর্ণ করায়ত্ত, তখনও সে ভাবছে প্রিয়ার কথা। কিন্তু প্রিয়া তো কাছেই। তাকে পাওয়া সহজ, যদি তাকে আপন করা যায়, যদি সত্যি তার মধ্যে ভালোবাসা থাকে। কে বলেছে, প্রিয় দর্শন মন্দিরে, মসজিদে বা দরগায়, সে যে নিজ কুটিরেই বাসা বেঁধে অবস্থান করছে। তাকে খুঁজলে এখনই পাওয়া যাবে, যেমনটি গেয়েছেন আমার পিতা: ‘ও তারে খুঁজলে পরে মিলবে রে অক্ষনি/ দিনার দিন বইসা রে দিন গুনি/ আমি বইসা রে দিন গুনি’।


আমরা ভালো থাকতে চাই। ভালো চাই সব কাজে। দিন গুনছি ভালো দিনের প্রত্যাশায়। যে দিন চলে গেছে সেটাই কি ভালো ছিল, না আরও ভালো দিন সামনে আছে? সবারই একই অবস্থা। বাইডেনও ভাবছেন একই কথা। একজন ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন যে অল্প সময়েই ট্রাম্পের বিদায় ঘটবে ইম্পিচমেন্টের মাধ্যমে। অবশ্য বিদায় ঘটেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। নরেন্দ্র দামোদর মোদি কয়েকটি ড্রেস বানিয়েছেন, সেগুলো আমার পছন্দ। কিন্তু তিনি সেগুলো পরার মুড হারিয়ে ফেলেছেন, তার আর মুড নেই অমিতাভ স্টাইলে বেশ জম্পেশ করে বক্তৃতা করার। কারণ, তার উদ্দেশ্যে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করেছেন রাহুল গান্ধী। রাহুল বলেছিলেন, কয়েক হাজার কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন মোদি নির্বাচনের আগে। যারা সে টাকা দিয়েছেন তারা ডকুমেন্ট সাপ্লাই করেছেন ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে। মোদি পরের দিন রাহুলের কথার জবাব দিতে পারেননি, বরং তাকে বিদ্রুপের কষাঘাতে করেছেন জর্জরিত। রাহুল কালবিলম্ব না করে হাফিজের শরণাপন্ন হয়েছেন, যেখানে হাফিজ বলছেন, ‘আমাকে যতই বিদ্রুপ কর আমি মেনে নিলাম। কিন্তু আমার কথার জবাব দিলে না তো’?


আমেরিকায় বলুন, ভারতেই বলুন, ভ্রষ্টতা আমাদের জীবনকে উল্টে পাল্টে দিয়েছে। আমরা কেউই এর ঊর্ধ্বে নই। তার অর্থ যেমন বপন করেছিলাম, তেমনি হবে তার শস্য। বেশ কিছু দিন আগে ভারতবর্ষ ঘুরে এলাম। চাক্ষুস অনেক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু যারা আমার ভাই ভাগ্নী তারা হয়েছেন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর। যারা কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন তারা ছিঁড়ে ফেলেছেন সে পতাকা। যারা বিজেপির সমর্থক ছিল, তারা আর উড়ায়নি সে পতাকা তাদের মিছিলে। বিভ্রান্ত সবাই। দু শ’ বছরের গোলামির জিঞ্জির ভেদ করে যে স্বাধীনতার ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উড়ছিল লাল কেল্লায় পত পত করে তার কারিগররা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ডলার সযতনে পাঠিয়ে দিয়েছেন সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে। এদের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। তাই ভারতের অগ্রগতি শুধু বক্তৃতা মঞ্চে, লাউড স্পিকারে, টিভির সদৃশ্য বক্তৃতামালায়। আমাদের অবস্থা কি তেমনি, না আর একটু ভালো? যারা লিখি তাদেরকে বলা হয় তোমরা আলোচনা লিখ না, লিখ আলোচনা। হয় ভালো লেখ, তা না হলে কলম চালিও না। ভালো বললে টিভিতে প্রোগ্রাম পাবে, না হলে বাসায় ‘সা’ল তুশতারির’ অনুবাদ কর। ওটির অনুবাদে পাঁচ বছর সময় লাগবে। তোমার বয়স হবে ৮৫। আমাদের কথা শুনলে, তোমার জন্য ভালো দাফনের ব্যবস্থা করব। শাহজালালের দরগা পছন্দ হলে সেখানেও খানিকটা জায়গা বের করতে পারব।


দেশের জন্য চিন্তা করে লাভ নেই, কারণ তার জন্য রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’য়ালা। যারা পড়াশোনা করেছি, তাদের জ্ঞান আছে যেসব গ্রন্থের উপরেই একটি কথা সবচেয়ে উপরে। তা হলো: ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’, যা হওয়ার তাই হবে। সম্রাট আকবর দরদী লোক ছিলেন বলে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা বারবার উল্লেখ করেছেন। ইংরেজরাও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রায় ১০০ বই বেরিয়েছে ‘দ্বীন-ই-এলাহী’র সপক্ষে। আল্লাহ্ পাঠালেন একজনকে, তার নাম মুজাদ্দিদ আলফে সানি। স্বপ্নে দেখলো জাহাঙ্গীর। কুরআনকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবে না। বরং ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ উড়িয়ে দাও, তা না হলে তোমাদের মোগল সাম্রাজ্য ছারখার করে দেব। যারা কুরআন হাদিসকে উড়িয়ে দিতে চান, তাদের জন্যে মুজাদ্দিদ আলফে সানির বইগুলো যথেষ্ট। আপনারা নিশ্চিহ্ন হবেন, যেমন হয়েছিল মোগলরা।


আল্লাহ্র কুরআনকে আল্লাহ্ই টিকিয়ে রাখবেন। দোমনা মুসলমান অর্থাৎ মুনাফিকদের আল্লাহ্ অভিসম্পাত দিয়েছেন। কুরআন অনুবাদ করেছি। প্রতি পাতায় একই কথা : ‘মুনাফিকি করো না, আল্লাহ্ তোমাদের মুখ দর্শন করবেন না’। মুসলমান নামধারী হলেও দোজখের প্রতিটি ইঞ্চি তোমাদের দিয়ে ভরিয়ে দেব। আগুনের লেলিহান স্পর্শ মৃত্যুর আগেই তোমাদেরকে দোজখের ঠিকানা বলে দেবে। যদি বাঁচতে চাও, নতুন জীবনের স্বপ্নের আভাস চাও, তাহলে আমার কাছেই এসো। পড়, বুঝতে চেষ্টা কর, সরল জীবন যাপন কর। বেশি খেয়ো না, বেশি ঘুমিয়ো না, বেশি ভোগ করতে চেয়ো না। সব বরবাদ হয়ে যাবে। বিধর্মীদের অনুসরণ করো না, ওদের ধর্ম, আচার, সংস্কৃতি আলাদা। ওদের মতো হতে চেয়ো না। কোনো দিন মিল খাবে না। কিন্তু প্রাণী বধ পরিত্যাগ কর। যদি একজন বিধর্মীকে বিনা কারণে কষ্ট দাও, তাকে সংহার কর, কোনো দিন বেহেশ্তের সুগন্ধ পাবে না। তুমি বিধর্মী হবে না, কিন্তু তাকে রক্ষা করবে, এটাই ইসলাম। এটাই নতুন বছরের জন্য আমার বাণী। এ বাণী সবার জন্য। সকলের জন্য। সকল মানুষের জন্য। এখানেই মানুষের মুক্তি।