কে কাঁদছে? কে? কে? কে?
প্রাণ মাথা উঁচু করল। হ্যাঁ, কাঁদছে তো, এই ঘরেই কাঁদছে। কিন্তু কাঁদছেটা কে? এই ঘরে তো প্রাণ ছাড়া আর কেউ থাকে না। তাহলে কাঁদছেটা কে?
প্রাণ গেম খেলা বন্ধ করল। ফোনটা অফ করে বালিশের পেছনে রেখে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। সত্যিই কাঁদছে। ছোট্ট সোনামণির মতো মিহি গলায় হেঁচকি টেনে টেনে কাঁদছে। কান্নার শব্দটা আসছে বুক সেলফ থেকে । প্রাণ অবাক হলো। বুক সেলফে কে কাঁদছে! ওখানে তো বই ছাড়া কেউ নেই। বই কী কাঁদে?
প্রাণ উঠে দাঁড়াল। বুক সেলফের কাছে গেল। দেখল একটি বই ধুলোবালি মাখা। অযত্নে বুক সেলফে পড়ে আছে। বইটি চিনতে পারল ও। গল্পের বই। লাইব্রেরি থেকে ছোটো মামা কিনে দিয়েছিল তাকে পড়ার জন্য। প্রাণ পড়েনি। বইটি এনে বুক সেলফে রেখে দিয়েছিল। তারপর আর বইয়ের কথা মনে নেই।
প্রাণ বইটি হাতে নিলো। ধুলোবালি ফুঁ দিলো। বইটি আবার ঝকঝকে হলো। নতুন বইয়ের মতো।
আদর করে প্রাণ বলল, কাঁদছ কেন বই?
হেঁচকি টেনে কাঁদতে কাঁদতে বই বলল, তুমি আমাকে ধরবা না, তুমি পচা, পালাও।
প্রাণ অবাক হলো। কেন? কেন পচা আমি?
আমি তো লাইব্রেরিতে ছিলাম। ভাইয়ের কাছে ছিলাম, বোনের কাছে ছিলাম। মা-বাবার কাছে ছিলাম। তুমি যদি আমাকে না পড়বে তাহলে কেন নিয়ে এসেছ লাইব্রেরি থেকে?
একটু লজ্জা পেল প্রাণ। বলল, পড়ব তো, তোমাকে পড়ব আমি। তোমার সব গল্প পড়ব আমি।
ঘোড়ার ডিম। ছয় মাস হলো একদিনও পড়োনি আমাকে। এনেই এই বুক সেলফে ফেলে দিয়েছ। ধুলোবালি আমাকে ঢেকে দিয়েছে। আজ একটি ইঁদুর এসেছিল। কুট কুট করে কেটেছে। ইঁদুরের দাঁত খুব শক্ত। কাটার সময় আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি, তাই কাঁদছি।
প্রাণ দেখল সত্যিই তো বইয়ের পেছনের পাতা ছেড়া, ইঁদুর কাটলে যেমন হয়। প্রাণের মনটা খারাপ হলো। বইয়ের জন্য কষ্ট হলো। আদর করে বলল, চলো তোমাকে এখন পড়ব আমি।


বইটি খুশি হলো।
প্রাণ বই পড়ছে। এত সুন্দর সুন্দর গল্প! মনে হচ্ছে সে বই পড়ছে না, বই গল্পগুলো তাকে শুনাচ্ছে। মুগ্ধ হলো সে। খুশি হলো। বই পড়ে অনেক মজা পেলো।
ফোনে গেম খেলে এত মজা নেই।
টিভিতে কার্টুন দেখে এত মজা নেই।
বই পড়ে সবচেয়ে বেশি মজা।
প্রাণ ঠিক করল, সে আর ফোনে গেম খেলবে না।
টিভিতে কার্টুন দেখবে না। বই পড়বে। অবসর সময়ে গল্পের বই , ছড়ার বই পড়বে।
আচমকা মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল প্রাণের। উঠে বসল। আমার বই?
চারপাশ তাকাল। বই নেই। বুক সেলফে তাকাল। দেখল বইটি বুক সেলফে পড়ে আছে। ধুলোবালি মাখা।
প্রাণ বুঝতে পারল সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল।
উঠে বইয়ের কাছে গেল। বইটি হাতে নিলো। ধুলোবালি পরিষ্কার করল।
মাকে বলল, মা, বইটা পড়ি?
প্রাণের কথা শুনে মা অবাক হলো। প্রাণ তো বই পড়তে চায় না, সময় পেলে শুধু মোবাইলে গেম খেলে। আজ নিজেই বই পড়তে চাচ্ছে!
মা হাসল। হাসিমুখে প্রাণের মাথায় হাত বোলাল। পড়ো।
প্রাণ খুশি হলো। হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসল।
সত্যিই অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প। পড়ে অনেক আনন্দ আর মজা পেল সে।
আজ শুক্রবার।
তার স্কুল বন্ধ।
বাবার অফিস বন্ধ।
মায়ের অফিস বন্ধ।
প্রাণ বলল, মা, বাবা আজ আমি তোমাদের সাথে বইমেলা যাব।
মা-বাবা খুশি হলো। রিকশায় চড়ে ছেলেকে নিয়ে তারা বইমেলায় গেল।
বইমেলা দেখে প্রাণের চোখ যেন কপালে উঠল।
এটি কী বইমেলা, না বইয়ের দেশ! কত্ত কত্ত দোকান! কত্ত কত্ত বই!
প্রাণ অনেকগুলো ছড়া আর গল্পের বই কিনল।
বই কিনার সময় অনেক লেখকের সাথে দেখা হলো। লেখকরা তাকে অটোগ্রাফ দিলো। কেউ কেউ তার সাথে সেলফি তুলল। একটি ছোটো শিশুর হাতে অনেক বই দেখে কয়েকটি টিভি চ্যানেল দৌড়ে এলো। তাকে ঘিরে ধরল। সাক্ষাৎকার নিলো। আনন্দ আর খুশিতে প্রাণের মনটা ভরে গেল। মুখের লম্বা হাসি কানে গিয়ে ঠেকল।