আমার বাবা গ্রামের একজন খুবই সহজ সরল মনের মানুষ। তিনি মানুষ ও পশু-পাখিকে ভালোবাসেন। তিনি তার উপার্জনের সমস্ত টাকা-পয়সা গরিব দুঃখী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন।
একসময় তিনি পশু-পাখিকে সকাল ও বিকেলে শিয়াল খোওয়া বিদ্যালয়ের মাঠে খাবার দিতেন। শত শত পাখি ঝাঁক বেঁধে সে খাবার খেত? খেয়ে আবার যার যার স্থানে চলে যেত। কুকুরগুলো সুন্দরভাবে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকত খাবারের জন্য। খাবার সামনে পেলে খুব শান্তভাবে খেয়ে চলে যেত। এসব দৃশ্য দেখে পাড়ার লোকে তার নাম দিলো, পাগলা জয়নাল, তার আসল নাম হলো মো: জয়নাল আবেদীন। শুধু পশু-পাখি নয় মানুষও বাদ যায়নি, কিছু দুষ্ট লোক তার নাম বলে দোকান থেকে বাকি নিয়ে যেত। আর যখন বাকি বিল দিতে হতো, তখন হালের গরু, পালের গরু বিক্রি করে সে বিল পরিশোধ করতে হতো। বিশেষ করে রমজান মাস এলে, রোজাদারদের জন্য গ্রামের বাজারের একটি হোটেল সারা মাসের জন্য বুকিং নেয়া হতো। যা শুধু রোজাদারের ইফতার জন্য। ঈদের তিন চার দিন আগে পাড়ার লোক ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে চিনি সেমাই জামা-কাপড় কিনে দিতেন। গত কয়েক বছর হলো, পৌষের হাড় কাঁপানো শীতে তার গায়ের শাল এক অসহায় মানুষকে দিয়ে দেন। এখন তিনি আর আয় করতে পারেন না, আমাদের ওপর নির্ভরশীল; তার জন্য একটু থেমে গেছেন। বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়েছেন।
২০০৫ সাল তখন আমি ঢাকা থাকি, আমার চাচাতো ভাই নারায়ণগঞ্জ থাকে। আমার বাবা গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে প্রথম বেড়াতে আসেন। আমার কাছে এক দিন ছিলেন তারপর বাবাকে সাথে নিয়ে চললাম নারায়ণগঞ্জ। গুলিস্তান থেকে বন্ধন বাসে উঠলাম, নামতে হলো চাষাঢ়া। সেখান থেকে রিকশা করে যেতে হবে কিল্লারপুল। এক রিকশাওয়ালাকে বললাম মামা যাবে কিল্লারপুল? তখন চাষাঢ়া থেকে কিল্লারপুল রিকশা ভাড়া মাত্র পাঁচ টাকা। আমি রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ভাড়া কত, তিনি বললেন ১০ টাকা, আমি রিকশাচালককে বললাম ভাড়া তো পাঁচ টাকা। আমি রিকশচালকের সাথে কথা বলছি, মামা ভাড়া তো পাঁচ টাকা, তুমি যে ১০ টাকা চাইলে বেশি হলো না? এ কথা বলতেই আমার বাবা রিকশাচালকের হাত ধরে বলল, তুমি কিছু মনে করো না ভাই?
রিকশা উঠার পর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বাবা রিকশা চালানো অনেক কঠিন কাজ, তুমি বসে আছো তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পায়ে প্যাডেল মেরে তোমাকে বহন করছে, জীবনে আর কখনো তুমি ভাড়া নিয়ে দামাদামি করবে না? ভাড়ার চেয়ে দুই টাকা বেশি দাও, দেখবে তখন তার সমস্ত দুঃখ ক্লেশ ভুলে মুখে খুশির হাসি ফুটবে?
যে কথা সে কাজ রিকশা থেকে নামার পর বাবা পকেট থেকে ১৫ টাকা বের করে দিলেন, চা-নাশতা খাওয়ানোর পর রিকশাচালকে বিদায় দিলেন। বিদায়ের সময় আমি দেখেছি রিকশাচালকের সেই হাসিটা আমার আজো চোখের সামনে ভাসে।
আমার বাবা আজো বেঁচে আছেন, বয়সের ভারে নুয়ে গেছেন? আমার বাবা হাজার বছর বেঁচে থাকুক, মহান আল্লøাহ তায়ালা কাছে আমরা কামনা করি। আমার বাবা একজন আদর্শবান বাবা।
আমার বাবা গ্রামের একজন খুবই সহজ সরল মনের মানুষ। তিনি মানুষ ও পশু-পাখিকে ভালোবাসেন। তিনি তার উপার্জনের সমস্ত টাকা-পয়সা গরিব দুঃখী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন।একসময়...
