চৈত্রের দাবদাহে জনমনে যখন ক্লান্তির ছাপ, তখন সে ক্লান্তিকে ছাপিয়ে বাঁধভাঙা আনন্দের ঢেউ নিয়ে আসে পয়লা বৈশাখ।
এই মেলার জন্য ছোট-বড় সবাই অপেক্ষায় থাকে। একটি বছরের অপেক্ষার পর আসে এই মেলার সময়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সারা বছর বাঁশের খুঁটির গর্তে টাকা জমাতো মেলার জন্য। খুব বেশি টাকা তো নয় তবুও প্রশান্তি। আর কত জল্পনা-কল্পনা, এটা কিনব ওটা কিনব। অপেক্ষার পালা যেন শেষ হয় না। এখন যেমন টাকা জমানো সহজ বা টাকার প্রচলন বেশি। তখনকার সময়ে পয়সার প্রচলন ছিল। পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা, পঞ্চাশ পয়সা, ইত্যাদি পয়সার কয়েন ছিল। এই কয়েনগুলো যত্মসহকারে বাঁশের খুঁটিতে জমা করত। এবং মেলার পূর্ব মুহূর্তে খুঁটি কেটে পয়সা বের করে নিতো। ছোট ছেলেমেয়েদের অন্যরকম এক আনন্দ ছিল এই মেলা। মেলাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ চলতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে।
বৈশাখের প্রথম দিন থেকে এই মেলা জমে উঠত। মেলার স্থান নির্বাচনে সাধারণত ছোট্ট কোনো গ্রামের বাজারকে কেন্দ্র করে তার আশপাশের খোলা মাঠকে কাজে লাগাত। শুকনো ফাঁকা মাঠে জমে উঠত মেলা। মাটির মধ্যে বাঁশের খুঁটি পুঁতে চারদিকে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে দোকানের আকৃতি দেয়া হতো। সন্ধ্যা থেকেই চাঁদের স্নিগ্ধ আলো পাওয়া যায়। মেলার আশপাশে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হতো। তবে বর্তমানে আধুনিক লাইটিং থাকলেও তখনকার সময়ে হেজাক, নাল বাতি, হারিকেন বা কুপি বাতির প্রচলন ছিল বেশি। লাইটিং বলতে জেনারেটর সেট করে লাইটের ব্যবস্থা করা হতো মূল অনুষ্ঠান স্থলে। মেলার আয়োজক কমিটি দীর্ঘদিন থেকে মেলার এসব কাজের তদারকি করত। কাজগুলো আরো সুন্দর করে গোছানোর জন্য মূল কমিটির সাথে কিছু উপকমিটি কাজ করত। মেলায় থাকত গানের আয়োজন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাউলগানের আয়োজন করা হতো। গ্রামীণ লোকজ পরিবেশের মঞ্চে বাউল গান অনুষ্ঠিত হতো। মেলায় নানা বাহারি পণ্যের সমাহার থাকত। ছোট ছেলেমেয়েদের খেলনা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিস পাওয়া যেত এই মেলায়। মেলায় বহু লোকের সমাগম ঘটত। বাউল গান শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজনের আগমন ঘটত। মেলার দিন সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন তাদের দোকান নিয়ে আসত। সময় ভেদে মেলা ১, ২, ৩ দিন পর্যন্ত থাকত। সকালের নতুন সূর্য উঠার সাথে সাথে আঁধার কেটে তরতর করে আলো ফুটতে থাকত তখন মেলায় লোকজ বাহারি দোকান সাজাতে ব্যস্ত দোকানিরা।

গ্রামীণ লোকজ মেলার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মেলবন্ধন। এটি এই মেলার একটি বড় দিক। সারা বছর যে সব আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা হতো না এই মেলা উপলক্ষে তাদের সাথে দেখা হতো। অনেকে পুরো একটি বছর অপেক্ষায় থাকতো মেলা উপলক্ষে বেড়াতে আসার জন্য। সারা বছর অবসর না পেলেও মেলা উপলক্ষে ঠিকই অবসর করে নিতো। মেয়েরা সারা বছর বাবার বাড়ি না এলেও মেলা উপলক্ষে এক দু’দিন আগেই চলে আসত। মা-বাবা, বোনে-বোনে, নানা-নানী, দাদা-দাদী সকল আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা হতো। এ যে কত বড় প্রাপ্তি আর আনন্দের বিষয় তা বলে শেষ করা যাবে না। মেলায় যাওয়া বড় উদ্দেশ্য নয়, একে অপরের সাথে দেখা করাটা ছিল তাদের মধ্যে বড় বিষয়। এলাকার অনেক বড় ভাই বা ছোট বেলার বন্ধুরা হয়তো কাজের সূত্রে দূরে কোথাও থাকে। সারা বছর দেখা না হলেও মেলা উপলক্ষে বাড়ি আসে এবং সকলের সাথে দেখা হয়। একে অপরের খোঁজ খবর নেয়, কত কথা! কত আনন্দ, বেদনা, সংসারের কত গল্প যে এই মেলার ভিড়ে মিশে যায়! এমন অনেক স্বজন আছেন যারা সারা বছর কেন, কোনো দিনই আসেনি, কিন্তু মেলাকে কেন্দ্র করে আত্মীয় বাড়িতে আসে। স্বজনে স্বজনে অনেক গল্প হয়, অনেক স্মৃতি জড়িয়ে থাকে মেলাকে কেন্দ্র করে। সারা রাত জেগে একে অপরের সাথে সুখ-দুঃখের গল্প করে, হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে। প্রতি বছরের মেলায় জড়িয়ে থাকে কতই না মধুর স্মৃতি।
মেলাকে কেন্দ্র করে যেসব দোকান বসে বাহারি পণ্যের পসরা নিয়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে সরব হয়ে ওঠে বেচাকেনা। সারা বছর ধরে গ্রামের বৌ-ঝি’রা অল্প অল্প করে টাকা জমায় মেলায় খরচ করার জন্য। তারা মেলা থেকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনেন। সারা বছর কাজে লাগে এমন কিছু জিনিস তারা কেনেন। এগুলো নিজেদের পছন্দের আবার সংসারের প্রয়োজনীয়। সারা বছর সহজে তারা পণ্য কেনেন না। মেলা উপলক্ষে মেলা থেকে তারা এসব জিনিস কেনেন। নিজেরা যান না কিন্তু ছেলে, ভাতিজা, ভাইদের দিয়ে এসব পণ্য কিনিয়ে নেন। মেলা থেকে পণ্য কিনবে বলে সারা বছর নিজেদের প্রয়োজনীয় অংশ থেকে কিছু কিছু করে টাকা জমা করেন। সেই টাকা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখেন।
আধুনিক যুগে মেলার আয়োজন থাকলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে মেলার তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। তাদের কাছে মেলা মানে একটা দিন আনন্দ করা। কিন্তু একটি গ্রামীণ লোকজ মেলাকে ঘিরে কত আনন্দ, বেদনা, হাসি-কান্নার গল্প জড়িয়ে থাকে তা বলে শেষ করা যাবে না। একটি বছর একটি মেলার অপেক্ষায় থাকতে হয়। মেলাকে ঘিরে কত স্মৃতি তা ভুলার মতো নয়। মেলা শুধু একটি আনন্দের দিন নয়, মেলা মানুষে মানুষে প্রীতির মেলবন্ধন। তাই সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে মেলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।