লোক সংস্কৃতির উদ্ভব কৃষি সমাজে। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি শুধু কৃষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সে সময়ের গ্রামীণ সমাজ তার ধারক এবং বাহক। কৃষি সমাজে উচ্চবিত্ত এবং উচ্চবর্ণের প্রভাব ছিল। কিন্তু লোক সংস্কৃতির সংগে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। চর্যাপদেই আমরা প্রথম বাঙালি সমাজের একটি পরিচয় লাভ করি। এই বাঙালি সমাজ ছিল অনার্য। আর্যদের দ্বারা ভারত ও বঙ্গদেশ দখল হওয়ার পর এ দেশের মানুষকে দাসে পরিণত করা হয়। অতঃপর ব্রাহ্মণ্য প্রবর্তিত বর্ণবাদের মাধ্যমে এ দেশের অনার্যদের ‘শূদ্র’ এবং ‘অস্পৃশ্য’ নামে চিহ্নিত করা হয়। অতঃপর তাদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হবার পরও তারা সমাজে অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য হতো।
এই অনার্য বাঙালিদের মধ্যে যারা বিত্তবান তাদের অনেকে ‘শূদ্র’ থেকে বেরিয়ে ‘কায়স্থ’ হিসেবে আর্যদের জাতে ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ অনার্যেরা ‘শূদ্র’ এবং ‘অস্পৃশ্য’ নামে পরিচিতি লাভ করে। আর্য রাজন্যবর্গ ব্রাহ্মণ প্রবর্তিত ‘সংস্কৃত’ ভাষাকে রাজভাষা হিসেবে গণ্য করে। এবং সংস্কৃত ব্যতিরেকে বাংলা ভাষার চর্চাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এবং এ ভাষা চর্চা করা হলে তারা ‘রৌরব’ নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হবে বলে এমন ঘোষণা দেয়। ব্রাহ্মণ্যদের নানা ধরনের অত্যাচারের কারণে হিন্দু অনার্যদের মধ্যে একটি বড় অংশ গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়। কিন্তু হিন্দু ব্রাহ্মণদের সাথে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের সম্পর্ক ভালো থাকে না। গৌতম বুদ্ধ একজন আর্য রাজপুত্র ছিলেন। কিন্তু হিন্দু আর্য সম্প্রদায় তাদের ধর্মকেও অস্বীকার করে। সেন রাজাদের আমলে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়।
এ সময়ে নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যে ঐক্য বা সমন্বয় সাধিত হয়। চর্যাপদে আমরা সেই সমন্বয় বা ঐক্যকে লক্ষ্য করি। হিন্দু ব্রাহ্মণদের প্রবর্তিত বর্ণবাদ সমাজে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মধ্যে যে প্রভেদ ঘটিয়েছিল তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় চর্যাপদাবলিতে। এ সম্পর্কে অতীন্দ্র মজুমদার বলেন :
“... কিন্তু ব্রাহ্মণ যারা নয় সমাজে উচ্চতর সম্মান এবং প্রতিষ্ঠা যারা নিতান্তই জন্মসূত্রের জন্যই অর্জন করতে পারেনি... তারা তখন কী অবস্থায় থাকত? সমাজের নিম্নতম পর্যায়ে যারা অধম সংকর বা অন্ত্যজ নাম নিয়ে বাস করত ... (সেই মলেগ্রহী, কুড়ব, চণ্ডাল,বরুর, বাউরি?) তক্ষণকার, চর্মকার, ঘট্টজীবী (পাটনী) ডোলাবাহী (দুলে?) মল্ল (মালো?) এবং আরো নিচের স্তরের অধিবাসী, পুক্কস, পুলিন্দ, খস, খর, কাম্বাজ, যবন, সুহ্ম, শবর, এদের জীবন ছিল চূড়ান্ত অভাব, যন্ত্রণা, বেদনা, নিঃস্বতা, শোষণ এবং নিগ্রহের জীবন্ত ইতিহাস। রজক, কর্মকার,নট, বরুড়, কৈবর্ত, মেদ, ভিল্ল, চণ্ডাল, পুক্কস, কাপালিক, নর্তক, তক্ষণশিল্পী, সুবর্ণকার, শৌদ্রিক ইত্যাদির অন্নগ্রহণ ছিল ব্রাহ্মণদের জন্য নিষিদ্ধ। শূদ্রের অন্নগ্রহণও ব্রাহ্মণেরা কিছুতেই করতে পারবেন না, এই রকম নির্দেশ ছিল। নির্দেশ অমান্য করলে প্রায়শ্চিত্ত, কৃচ্ছ্রসাধন ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। অবশ্য বিপদে পড়লে শূদ্রের হাতে তৈল পক্ব ভর্জিত দ্রব্য, পায়স ইত্যাদি খেতে ব্রাহ্মণদের নিষেধ ছিল না সামান্য মনস্তাপ করলেই দোষ কেটে যেত। তেমনি শূদ্রের হাতে ব্রাহ্মণ বিপদের সময় জলপান করলেও খুব একটা অপরাধের চোখে দেখা হতো না।
শহরের প্রান্তে টিলার ঘর বেঁধে এই অন্ত্যজরা বাস করত। অন্ত্যজদের অধিকাংশই ছিল ব্রাহ্মণদের অস্পৃশ্য, তাদের ছায়া মাড়ালেও ব্রাহ্মণদের পাপ হতো। স্পর্শ বিচারে নানা বিধি নিষেধ ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজে উদ্ধৃত উগ্রতায় প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

আর্যদের মধ্যে ব্রাহ্মণদের অবস্থান সর্বোচ্চ ছিল। ক্ষত্রীয় অর্থাৎ রাজেন্যবর্গ তাদের রাজকার্যে ব্রাহ্মণদের পরামর্শ দিতেন। ক্ষত্রীয়দের পরে ছিল বৈশ্য, যারা ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে জড়িত ছিল, তাদের অবস্থান ছিল তৃতীয়। শিল্প, বাণিজ্য-ব্যবসা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাদের প্রধান ভূমিকা ছিল। এরাও আর্য সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। এরা বিত্তবান ও মর্যাদাসম্পন্ন শূদ্রদের নানা ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্পকর্ম নিযুক্ত করত। ফলে এরা সমাজে নিম্নবর্ণ শূদ্রদের অপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন ছিল।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অষ্টম শতক পর্যন্ত শিল্প ও ব্যবস্যা- বাণিজ্যর প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু সপ্তম শতক থেকে সমাজে কৃষিনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। কৃষি এবং তৎসংলগ্ন কাজে যারা জড়িত ছিল সমাজে তাদের তেমন সম্মান ছিল না।
এমনি অসাম্য বা অনৈক্যের কথা অতীন্দ্র মজুমদার তাঁর গ্রন্থে বলেছেন। বিবাহের ব্যাপারেও ছিল নানা প্রকার বিধিনিষেধ। গ্রন্তু ব্রাহ্মণদের বেলায় এই বিধি নিষেধ তেমন কার্যকর ছিল না। কিন্তু নিম্নবর্ণের কোনো পুরুষই উচ্চবর্গের রমণীকে বিবাহ করতে পারত না। তবে ব্রাহ্মণ নিজের সাথে বিবাহিত নয় এমন নি¤œবর্ণের স্ত্রীলোকের সাথে ব্যভিচার করলে কিংবা তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করলে সংস্পর্শ দোষ ছাড়া অন্য কোনো নৈতিক অপরাধ হয় না। সেই দোষ সামান্য মনস্তাপে খণ্ডিত হতো। (অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ, পৃ: ৩০)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলাদেশ একটি সভ্যজাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের সে সভ্যতা নদীতে এবং সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। উভয় বাংলার প্রতœতত্ত্ববিদদের প্রচেষ্টায় এসব হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ভগ্নাবেশ দুই দেশেই আবিষ্কৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। ইতোমধ্যে পশ্চিমবাংলায় বীরভূম, বোলপুর, এবং অন্যান্য অঞ্চলে এ সব প্রতœতাত্ত্বিক ভগ্নাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
মহিশদল এবং বানেশ্বর ডাঙ্গা, পাণ্ডুরাজার টিবি ইত্যাদি আবিষ্কারের ফলে সভ্যতার মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পার সমসাময়িক। ফারাক্কা বাঁধ খননের সময় এমন অনেক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া গেছে যা দ্রাবিড় সভ্যতার পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের মহাস্থানগড়, ওয়ারী বটেশ্বর অঞ্চলে খননের মাধ্যমে অনেক প্রতœতাত্ত্বিক উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে, যা আর্যদের আগমনের অনেক পূর্বকালের স্থাপনা। এ থেকে বোঝা যায় যে বেদে উল্লিখিত ‘বঙ্গ’ দেশ প্রাচীন সভ্যতার ধারক এবং বাহক। আর্যকালীন সময়ে বৌদ্ধসভ্যতার অনেক প্রাচীন নিদর্শন এখন বাস্তব সত্য। ময়নামতী, পাহারপুর অঞ্চলের বৌদ্ধ মঠ, আজো এ দেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন ও পরিচয় বহন করে।
বৌদ্ধপূর্ব আমলের সভ্যতা কৃষিভিত্তিক ছিল। সে সময়ের মানুষ ‘বাঁধ’ বা ‘আইল’ দিয়ে সমুদ্র এবং নদীর প্লাবন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে মোগল আমলে বঙ্গদেশকে ‘সুবে বাংলা’ নমে অভিহিত করা হতো। সুতরাং এমন বলাটা অসঙ্গত নয় যে সিন্ধু ও পাঞ্জাবে মহেঞ্জোদারো, হরপ্পার মতো সভ্যতা বাংলাদেশেও গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এ দেশের মানুষও যে জ্ঞানচর্চায় অন্যদের থেকে পিছিয়ে ছিল না চর্যাপদাবলীতে তার নিদর্শন রয়েছে। ‘চর্যাপদাবলী’ প্রকৃত অর্থে বাঙালির তৎকালীন সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন।
এখানে আরো বলা যায় যে, সম্রাট আলেকজান্ডার তৎকালীন বঙ্গদেশের গঙ্গারিডি রাজ্যের রাজধানী কোটালীপাড়া, বর্তমান গোপালগঞ্জ আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েও তৎকালীন গঙ্গারিডি রাজ্যের নৌশক্তির কথা জানতে পেরে তার অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হল। গ্রিক ইতিহাসে ঘটনাটির উল্লেখ আছে।

‘সমন্বয়’ বলতে আমরা একপ্রকার ঐক্য ভাবনা বা চিন্তা-যা একার্থে বিভিন্ন ধর্ম বা গোত্র বা ধ্যান ধারণার নানা বিষয় ‘মেল বন্ধন’ এমন বলা যায়। ইংরেজিতে Harmony বা Harmonization সমন্বয় ধারণাকে আরো স্পষ্ট করে বুঝতে সাহায্য করে। তুর্কি এবং মোগল আমলে এদেশের হিন্দু বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে যে সমন্বয় সাধিত হয়েছিল তা ব্রিটিশ আমলে আর থাকেনি। বস্তুত ব্রিটিশ প্রশাসন Divide and Rule এই চেতনা থেকেই ভারতবর্ষকে ২০০ বছর ধরে শাসন করেছে। হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে একটি বিভাজন তারাই এ দেশে সৃষ্টি করেছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল তাদের এই প্রচেষ্টার প্রথম উদ্যোগ। অবশ্য ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের এই প্রচেষ্টো এ দেশের নেতাদের প্রতিবাদ ইত্যাদির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ব্রিটিশদের এই প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। তারা সার্থকভাবে বিভাজনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল দেশভাগের মাধ্যমে।
পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান দ্বিজাতিতত্ত্ব হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক চেতনার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। পরে পাকিস্তান ও ভারত এই নামে দুই দেশ বিভক্ত হলো। কিন্তু পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে যারা ‘পশ্চিম পাকিস্তানি’ হিসেবে পরিচিত ছিল তারা পরে মুসলমান মুসলমানে আর ঐক্য রাখতে সক্ষম হলো না। প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদে সে সময় পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ ছিল সমৃদ্ধ। সে তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তান ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানে সে সময় তেমন কোনো শিল্প বা কলকারখানা ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ পূর্ব পাকিস্তানের কিছু নেতাদের সহায়তায় গোটা পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করল। ফলে চাকরি-বাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীরা পিছিয়ে পড়ল। ১৯৪৭ সালের পর এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভাষাভিত্তিক সংগ্রামের বীজ বপন করল। অতঃপর ১৯৫২ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তান তার মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলো।
আমাদের এই বৃহৎ পৃথিবীর মধ্যে ক্ষুদ্র একটা চন্দ্রবিন্দুর মতো বাংলাদেশ। এই ছোট দেশে নানা ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষ রয়েছে। এরা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যে যাই হোক না কেন, তাদের ভাষা বাংলা। এই ভাষাই তাদের সব প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের মানুষ ভাষাার জন্য প্রাণ দিয়েছে এবং ভাষার সাথে যুক্ত যে তার কর্মজীবন, সেখানে পাকিস্তান আমলে উর্দুভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়ে যাওয়ায় তার কর্মজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাঙালির লড়াইয়ের শুরুও হয়েছে সেখান থেকে।
বস্তুত, সাহিত্য এবং গান একটি জাতিকে বেঁচে থাকবার প্রেরণা জোগায়। মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, লালন শাহ, হাছন রাজা প্রমুখ কবি সাহিত্যিক ও সঙ্গীত সাধক তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষকে লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের প্রেরণা জুগিয়েছে। ভাষার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি গান তাকে লড়াই করতে যেমন সাহায্য করেছে, তেমনি মহামূল্যবান প্রাণ দিতেও তাকে প্রেরণা দিয়েছে। এই স্বাধীনতার সর্বমূলে তার ছিল জাতীয়তাবোধ। বুলেটের সামনে দাঁড়াতেও সে আর ভয় করেনি। এমনি করে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকদের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহেও গানই তাকে প্রেরণা দিয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাইকে এক ঐকমত্যে আনতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশই সর্বপ্রথম তার স্বাধীনতার ইতিহাসে ধর্মের পরিবর্তে ভাষাকেই প্রধান করে এক মহা সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার এই বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে তুলতে সক্ষম হলো।
অতঃপর ৩০ লাখ মানুষের শহীদ হওয়ার বিনিময়ে মুক্ত বাংলাদেশ। আমাদের রক্তলাল স্বাধীনতা।
এই যে অসাধারণ মেলবন্ধন গড়ে উঠল তার মূলে এ দেশের মানুয়ের ভাষা ও তার লোক সংস্কৃতিই ছিল প্রধান। বাংলাদেশের বাউল ও তাদের গানে এই সমন্বয়ের সার্থক প্রকাশ ঘটেছে। বাউলদের গান কোনো সাম্প্রদায়িক গান ছিল না। এই গান ছিল হিন্দু-মুসলমান সবার। গায়কদের মধ্যেও হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। বাউলগান ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনাপুষ্ট দেশের পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের গান।

বাংলাদেশের সঙ্গীত মূলত বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করেছে। আজ যে সঙ্গীতের এত উন্নতি ঘটেছে-আমরা নিত্যনতুন সুর নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শিখেছি, এসবের উৎস মূলত লোকসঙ্গীত। মানুষ এক দিন পাখির ডাক, নদীর কলতানের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল সুর। তার আনন্দ-বেদনা ভালোবাসার ভাষা রূপ পেয়েছিল প্রকৃতির নন্দন কাননে, বাতাসের পেলব কোমলতায়, পাখির কূজনে। বুক চিরে বেরিয়ে এসেছিল গান।
সেই শুরু। আজো তা থামেনি। এক কণ্ঠ থেকে আরেক কণ্ঠে গান জেগেছে। এমনি করে বংশপরম্পরায় জনমে জনমে এই গান গীত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। প্রকৃতির বুকে লালিত এই গান প্রকৃতিগত সহজ তালে অভ্যস্ত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ’ নামে এই দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ কাজ করতে করতে, অথবা অবসরের মুহূর্তে ভালোবাসার মানুষের কথা মনে রেখে, তার দুঃখ-সুখের কথাগুলো নৃত্য-সুরের ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছে। এ গানের সুষমার কোথাও লেগেছে নোনা পানির সাথে সোঁদা মাটির গন্ধ, কোথাও বৃষ্টি আর নদীর পানিতে পলি কিংবা দোআঁশ মাটির স্বাদ। কোথাও মেঘের ধারায় লেগেছে প্লাবন-মাটি গেছে হারিয়ে। কোথাও খরা আর মাটির রুক্ষতা। কোথাও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জেগেছে বাঁচবার সাধ। কোথাও রুক্ষতায় ক্লিষ্ট প্রকৃতির বুকে নেচেছে বাউল। কোথাও ‘ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর’ বলে গেয়েছে উদাসী পথিক। কোথাও একটি রাতের মমতা মাখানো ভালোবাসার পরশে অজানা পথে পাড়ি দেয়া কোনো পথিককে ঘর বাঁধবার প্রার্থনায় আকুতিভরে ডেকেছে নারী। বাংলাদেশের নদী, মাটি, সমুদ্র, আকাশ, ঝড়ের হাওয়ার সাথে ঐকতান তুলে একতারা, দোতারা, খমক কিংবা মন্দিরা অথবা প্রেমজুড়িতে লেগেছে গান-সেই তো তার এ দেশের সঙ্গীত, হৃদয়ে হৃদয়ে মেলাবার বিনিসুতোর মালা-যার স্রষ্টা ‘লোক’ নামে কথিত মকল অবহেলার পাত্র মেঠো মানুষের দল। নদী-মাটি-মানুষকে নিয়ে এক দিন যে লোকসঙ্গীতের জন্ম হয়েছিল, এ দেশে তার সাথে সঙ্গতি রেখে উদ্ভব হয়েছিল লোকবাদ্যের।
সুর-তাল-রাগ-রাগিণী বা শাস্ত্রীয় আচারের ছোঁয়া সেখানে নেই। এই গান গাইবার জন্য দীক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। লোকসঙ্গীতের সহজ বুনন তাদের আপনা থেকেই পারদর্শী করে তোলে। এই গানের মাঝে জাগে যে নৃত্য-তাও আপনা-আপনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কোথাও সুর ও তালের বিপর্যয় ঘটেনি, সবকিছুই ঘটেছে তাদের নিজস্ব ঢঙে।
এই আমাদের মাটি মানুষের গান-তাতে বৈচিত্র্য আছে, মিশ্রভাবের স্বাদ আছে, সমতল বিশেষের রঙ আছে। গায়কিতে আছে ভিন্নতা। বাংলাদেশের আকাশ সুর্য, চন্দ্র-তারা, নদী হাওয়ার মতো, ধানের সুবাস এবং পাখির সুরের মতো অসাম্প্রদায়িক এ দেশের অজস্র লোকসঙ্গীত হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ, খ্রিষ্টনের মিলিত ভাবনা এবং চর্চার পূর্ণতা এবং সংহতির প্রতীক। এ সঙ্গীত কেবল একটি ধর্মের কিংবা গোষ্ঠীর নয়- এ সঙ্গীত গোটা বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ, তার হৃদয় উৎসর্গিত করা ভালোবাসার ছন্দ।