আল মুজাহিদী
মঞ্জিল তো বহুদূর

মঞ্জিল তো বহুদূর
পৃথিবীর প্রান্তসীমা ছুঁয়ে বয়ে যায় বাতাস।
যতোই দুর্লঙ্ঘ হোক পথ আমাকে পৌঁছতে হবে
মঞ্জিলে। আরও জোরে পা মাড়িয়ে চলতে হবে আমাকে
এ পথে ছড়ানো পাথর।
নতুন পথের বাঁক তৈরি করতে হবে এ পাহাড় কেটে কেটে
দূরের যাত্রীরা। দ্যাখো, চেয়ে দ্যাখো
মুসাফির, চেয়ে দ্যাখো। মরুপথের
উষ্ট্রদল পান্থপাদপের ছায়ায় দাঁড়াবে এখন;
আমার দূরত্ব ঘুচে যাবে এখনই
হাজার দিনের মঞ্জিল পেয়ে যাবো আমি, পেয়ে যাবো
এ-পৃথিবী আজও যতো প্রত্যাশী আমাদের
আমাদের দুঃখ ও ভালোবাসার তো কোনো কমতি নেই
আমরা তো বেশ পূর্ণ করেছি দুঃখ ও যন্ত্রণায়
এ-পৃথিবী তো আমাদের অনেক স্বপ্নের পৃথিবী
হে প্রেয়সী, আমাদের মঞ্জিল তো হাজার বছরের
এ জীবনে আমার প্রেমের সব অধিকার আছে।

 


হাসান হাফিজ
অগ্নি হয়ে ছুঁয়ে দাও

কয়লা তার হৃদয়ের অভ্যন্তরে
আগুনে পোড়ার তীব্র
আকাক্সক্ষাকে পুষে রাখে
আশ্চর্য ঘুমের মধ্যে সময় গড়ায়
কখন অগ্নির শিখা চুম্বন ছোঁয়াবে ঠোঁটে
কখন কখন?
অপেক্ষা প্রহর কেন ফুরোয় না
দীর্ঘ ও জটিল হয় ক্রমে

আমিও তোমার জন্য হে মৃত্যু কয়লা হয়ে
অপেক্ষায় আছি
অগ্নি হয়ে পাড়াবে কখন ঘুম
আনন্দে শীতল হবো
ধন্য ও কৃতার্থ হবো

 

ফেরদৌস সালাম
যখন আমি একলা একা

আমার কেবল ইচ্ছে করে ইচ্ছে করে যাই হারিয়ে
বিজন বনে একলা একা
নেই যেখানে কারো ছায়া কারো মায়া শস্যফলা ঘামগন্ধ
রাত দুপুরে
একলা আমি শুনবো বাঁশি জোছনা ঝরা বন বাদাড়ে
রাতের পাখি ডাকবে তখন করুণ সুরে
কাঁদবে বাঁশি কাঁদবো আমি অঝর ধারায় কাঁদবে ডাহুক
ঘনকালো অন্ধকারে।
হিসাব কষি বুকের শ্লেটে যখন তুমি দূরের কায়া
আমিও তখন একলা একা একলা একা চলেই যাব
তোমায় ছেড়ে অনেক দূরে অনেক দূরে...

তুমিও যাবে আমিও যাব এই পৃথিবী মরুভূমি
ঝাঁপ সে দেবে সমুদ্দুরে সমুদ্দুরে।

 

মাহফুজুর রহমান সৌরভ
শূন্য দশমিক সাত

যেমন চাঁদ তার চুমু দিয়ে যায়
রাতের ললাটে -
তেমনি আমিও হাত বাড়িয়ে দেই
শেষ ভোরের তারা পর্যন্ত।
ঘোর আনন্দে এতটাই ম্লান হয়েছি
পোয়াতি রাতের ঠোঁটে-চাঁদের চুম্বন!
তুমি তোমার অন্তর চক্ষু দিয়ে
চেষ্টা করো
যার মধ্যে তুমি আমাকে খুঁজছ
আর আমি নিজেকে হারিয়েছি
জন্ম-জন্মান্তরে

সেই আশ্রয়স্থল যেখানে আমরা
এখনো খুঁজে পাচ্ছি না
তাকে নিঃসঙ্গ, সম্পূর্ণ নির্জনে দ্যাখো এবং
আমি এখনো ... তোমার জন্য অপেক্ষা করছি...।

 

 

মুস্তফা হাবীব
মানুষ তাকেই মনে রাখবে

রূপের অহংকার, অর্থ-জৌলুস স্থায়ী নয়,
গুণের আবেদন চিরকালীন, শাশ্বত সুন্দর।
ভোগে মত্ত মানুষ অন্যের সুখে চরম নাখোশ থাকে
অন্যের স্বপ্নজমিনে নিক্ষেপ করে শেল
মানুষকে বিচিত্র গ্রেডে ফেলে করে রাখে পদানত।

তারাই প্রকৃত গুণীজন- কালোত্তীর্ণ মণিহার
যারা কখনো নিজের রূপে শাণ দেয় না,
খাদক হয়ে দৈর্ঘ্যরে চেয়ে পেটের প্রস্থ বাড়াতে
লুফে নেয় না গরিবের সম্বল, প্রান্তজনদের সুখ।
ভাবে, দেশের কল্যাণ, মানুষের উন্নয়নে প্রকল্প বোনে
দুস্থদের সেবায় রাত কাটায় নির্ঘুম,
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের সেবায় নিজকে বিলায়।

জাফরুল্লাহ, কুচকুচে কালো মানুষটি চলে গেল
রেখে গেল মেধার সৌন্দর্য ও ত্যাগের মহিমা,
মানুষ তাকেই মনে রাখবে আজীবন, আমাকে নয়।

 

 

জাহাঙ্গীর ফিরোজ
আশ্চর্য সুন্দর হবে ভোর

যখন রাত্রি হল কেউ কেউ ভাবল সকাল
যখন সকাল হবে কেউ কেউ ভাববে আঁধার
জানি এই পর্বের শেষ হবে
কেউ একজন আসবে আবার;
ভীতু মানুষের মাঝেই সে রয়েছে নিশ্চুপ

তার অপেক্ষায় সমতট
মগধ বঙ্গ কলিঙ্গ হরিকেল।
সে এলেই আঁধারের পেট চিরে আলো
বেরিয়ে আসবে আবার
আশ্চর্য সুন্দর হবে ভোর।

পাখিদের কলকাকলিতে
এই গজকচ্ছপের দেশে
প্রশান্ত প্রভাত নেমে আসবে
মৃতপ্রায় নদী জেগে উঠবে।

সে আসবে
নিশ্চর্য সুন্দর হবে ভোর

 


মুজতাহিদ ফারুকী
গাছের কথা

ইদানীং গাছের দিকে তাকাতে পারি না
ফ্যাকাশে রক্তশূন্য শরীর, আছে শ্বাসটানও
পিঁপড়েরা বিষদাঁতে কচি ডগা কাটে
হাওয়া এলে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে ডাল
হলদেটে চোখে তার তীব্র অনিশ্চয়
চোখে চোখ রাখতে পারি না।

কত দিন বৃষ্টি নেই!
ফেসো চুল অযতেœর সাক্ষ্যে রি রি ওড়ে
একটিও ফুল ফোটেনি কখনও
ফাল্গুন উঁকি মেরে গেছে আনবাড়ি।

রাতভর পাশে জেগে
টের পাই বোবা কাতরানি
পালা শেষ জোনাকিরা যখন ঘুমায়
তখন কি দুধসাদা পঙ্খিরাজ আসে
ছদ্মবেশী গাছ ধরে অশ্বারোহী সাজ?
ধূসর পাতার জালে আড়মোড়া ভেঙে
চাঁদ সুলতানা জাগে ফানা ফিল্লায়?
কার সাথে হাত নেড়ে এত কী সে কয়?

সিফাত কি নড়ে ওঠে আঁধার কবরে
আলোর বোরাক তার সখা নাকি? অন্ধকার...?

সব জানালার কাচ শুষে নিলে ঘণ্টার ধ্বনি
জোছনার বুড়ি লেপে টক চোখে মায়া
সান্ত¡নার ঢাল হয় তারার বুদবুদ
ঘুমের বারান্দাজুড়ে পাতার ফরাস পাতে
স্তব্ধ বোধিগাছ।
বারবার ভুল হয়, তবু গনি ১০০ থেকে এক।

 


মাসুদ চয়ন
ক্যাকটাস

ক্যাকটাস নিঃসঙ্গতা চায়-
নিজেতে বিদ্ধ হয় ক্ষণে-ক্ষণে;
নির্জন পারিপার্শ্বিকতায় বাঁচতে চাওয়া অপরাধ নয়,
ক্যাকটাস কোলাহলে অক্ষম-
সাফল্যে উর্বর রেণু তার কাছে মহৎ শিল্পকর্মের মতো নির্জনে ধরা দেয়,
ক্যাকটাস অন্তর্মুখী বিলাপ, আজন্ম হাহাকার পোষা রোদ-
নিভৃতচারী আদর্শের উচ্চাভিলাষ,
বেপরোয়া বোধের ধ্বংসাত্মক জাগরণ তাকে ঘটাতে হবে কেনো?
এভাবে লাঞ্ছিত করা নীতিবিরুদ্ধ!
এভাবে লাঞ্ছিত করা হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ!
ক্যাকটাস আত্ম ক্ষরণে বিচ্ছুরণ ঘটানো সুনীল বিশালতা-
ক্যাকটাস নিঃশব্দে হেসে খেলে বিবর্তন ঘটানো বোধ;
আড়ালেই জনপ্রিয় মনপ্রিয়,
বিপ্লবী বৃক্ষ গুল্মের জাগরণ ঘটাবে ইঙ্গিতে ইশারায়-
কোলাহলে স্বরূপতা হারায়!
লাইমলাইটে থাকে অনাবিল আঁধার।
যে নিভৃতি ওমের প্রজ্বলন সহজে নেভে না!
ক্যাকটাস নির্জনে বাঁচা অবিচল বিম্ব-
কোলাহলে তারে ডেকো না!
ডেকো না!
এহেন রুদ্ররূপে সে জ্বলতে অক্ষম,
বৈপরীত্যের বোঝা কে নিতে পারে হায়!
ক্যাকটাস নীরবে বাঁচো!
নীরবে সহ

 

 

শাহীন আরা আনওয়ারী
ঈদের মিলনমেলা

ঈদ এনেছে সবার জন্য
সবার জন্য আনন্দ।
আনন্দ আনন্দ
গরিব ধনী পথশিশু
সবাই যে হাসে।
ঈদ মানে মিলনমেলা
প্রেমসাগরে ভাসে।
সবার মনে দাওগো সুখ
দাও গো তুমি খুশি।
বুক ভরা ভালোবাসা
মুখে চাঁদের হাসি।
আনন্দে ভাসুক মন
বাজুক প্রেমের বাঁশি।
সবাই যেন বলে খোদা
তোমায় শুধু
তোমায় ভালোবাসি।
মনটা তুমি উদার করো
করো সবার জন্য।
কষ্ট দুঃখ ভুলে সবাই
হবে ঈদে ধন্য।
সব ভেদাভেদ ভুলবে ঈদে
থাকবে না যে দ্বন্দ্ব।
ঈদের মেলায় হাসুক সবাই
হাসুক মনের সুখে।
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে
স্বপ্ন বাঁধুক বুকে।
রঙিন হোক সারা বছর
থাকুক ফুলের গন্ধ।

 

 


গোলাম রব্বানী টুপুল
একটি পাখির গান

আমরা ঘুমোতে ঘুমোতেই একটি সকাল ডেকে আনি
কবি জাগতে জাগতে একটি কবিতাকে ডেকে আনে
রাতের আঁধার ভেঙে ভেঙে শব্দ কুড়োয় আকাশের তলে
আমাদের আঙিনার পারে শব্দের গোছালো দেয়াল
যার ভেতর দিয়ে ওপারে দেখি, কবি হেঁটে যায় নীরবে
টুকরো টুকরো আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয় ছন্দের গহ্বরে
কদমের ডালে তুলতুলে মুরগিছানার মতো ফুলগুলোতে
হাত বোলায় কোন কুমারী মেয়ে, নাকি দ্বাদশীর চাঁদ!

আমাদের বটগাছটি বেশামাল ঝড়ে ভেঙে পড়ে আছে
এই সেই গাছ, যার ছায়াতলে কবি বসেছিল বলে
মুক্তদানার মতো ঝকঝকে সুরে গেয়েছিল একটি পাখি
কখন সে উড়ে গেছে অনন্ত আলোকের দেশে একা একা
আমরাও প্রভাত ভালোবেসে গেয়ে উঠি, কণ্ঠে ভৈরবীরাগ
তৃপ্ত অণুদাহ মনে কবি ছেঁড়া বটপাতায় লিখে রাখে-
অবরুদ্ধ মানুষের একান্ত মুক্তির কথামালা।