বয়স ষাটের ঘরে। সঙ্গত কারণে অন্তত ৫০ বছর আগের কথা মনে থাকবে। সে হিসাবে ১৯৬৮ সালের কথা মনে থাকাই সঙ্গত। তখন মানুষের হাতে এত পয়সা থাকত না। দেশের অধিকাংশ মানুষই ছিল কৃষিজীবী। বাড়ির ফসল বিক্রির টাকাই ছিল তাদের আমোদ-প্রমোদের অর্থের উৎস। এখন সময়ের ব্যবধানে মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হয়েছে ফলে আয় বেড়েছে। নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। তখন সংসারের স্বাভাবিক বাজার-ঘাট, চিকিৎসা, লেখা-পড়া সব কিছু চলত চাল বিক্রির টাকায়। আয়ের প্রধান উৎস ধানের ফলনও বেশি ছিল না। সুতরাং নেহায়েত জরুরি না হলে চাল বিক্রি অনুমোদন জুটতো না সংসারে। সংসারে দাদা ছিল প্রধান নির্বাহী আব্বা ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত পরিবারের প্রধান উজির। আমরা সব প্রয়োজনে দাদার কাছেই ছুটে যেতাম এমনকি আব্বাও। অন্যদিকে দাদীর কাছে অর্থের ভাণ্ড থাকলেও খরচ করা তো দূরের কথা, গোপনে তা গুনারও সাহস বা মানসিকতা ছিল না দাদীর। তবে এ নিয়ে দাদীর কোনো আক্ষেপ দেখি নাই। স্বামী ভক্তি বলতে যা, তা সেখানে পুরাপুরি বর্তমান ছিল। তারা কেবল জানতো স্রষ্টার পরে কাউকে সিজদাহ করার নির্দেশ থাকলে তা হতো স্বামীকে। এখনো মা-খালা-চাচীদের মধ্যে এই মানসিকতা অনেকটাই বর্তমান আছে।

যাক সে কথা। সে আমলে রোজায় এলাকায় মসজিদে মাইক ব্যবহার করার প্রশ্ন ওঠে নাই। সুতরাং ইফতার হতো মেঘলার দিনে মুরগি তার ঘরে ঢুকছে কি না? মুরগি ঘরে ঢুকলে ইফতারের সময় হয়েছে বলে ইফতার করা শুরু হতো। সাহরিতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে আকাশে সাতটি তারার একটি ছোট জোট ছিল, তাকে সাত ভাইয়ের বলা হতো এবং পাশে সারিবদ্ধ কয়েকটি তারার লাইনকে বলা হতো আদম সুরত। এ গুলির অবস্থান দেখে নিশানা ঠিক করে সেহেরি খাওয়া হতো। আর আকাশ মেঘলা থাকলে আল্লাহর উপর ভরসা করে অনুমানিক রাত ১টা বা ২টায় সেহেরি খাওয়া হতো। সাহরির পরে ঘুম দেয়া ছিল রুটিন ওয়ার্ক। তারপর ফজরের নামাজ। মহান আল্লাহ এখন আমাদের কত নিয়ামত দিয়েছেন- মসজিদে মাইক, ঘরে এলার্ম মোবাইলে এলার্ম বাইরে সাইরেন কত নিয়ামত দিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন। ইফতারির সময় রেডিও/টিভিতে খতমে কুরআন প্রচার, আজান প্রচার ইত্যাদি। সাহরির সময় শেষ রাতে সাহরি অনুষ্ঠান।
ইফতারিতে মেনু ছিল আওলা চালের জাউ যা শুধু পানি দিয়ে রান্না হতো, তার সাথে গুড় পরিবেশন করা হতো। মাঝেমধ্যে ছোলা ভাজি হতো সাথে মুড়ি। কখনো কখনো পেঁয়াজু, ডালের বড়া অথবা আওলা চালে পায়েস যাতে নারকেল, তিলের গুঁড়া ও গুড় সংমিশ্রণ থাকত। ১৯৮০ পর্যন্ত পল্লী অঞ্চলে বেগুনী, আলুর চপ, খেজুর, শসা/খিরাইয়ের সালাদ, আঙ্গুর, মাল্টা, কমলা, আপেল, জিলাপি, হালিম ও রকমারি শরবতের কোনো বালাই ছিল না। তারাবিতে কুরআন খতম গ্রামে ছিল না। সূরা তারাবি এবং তারাবি শেষে মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু পাঠ করে শুনানো হতো সওয়াবের আশায়। ইসলামী বই বলতে তখন বার চান্দের ফজিলত, বেহেশতি জেওর অথবা মোকছুদুল মো’মিনই ছিল তখনকার ধর্মীয় গ্রন্থ। বেশি হলে বিবি রহিমা অথবা বিবি খাদিজার জীবনী।

ঈদে নতুন কাপড়ের ব্যবহার তেমন ছিল না। দুই-চার বছর পর নতুন জামা জুটতো কপালে। অধিকাংশ বছরই পুরাতন কাপড় পরিষ্কার করে ঈদ করতে হতো। তখন কাপড় আয়রন করার কথা কোনো দিন চিন্তায়ও আসত না। গ্রাম অঞ্চলে পোলাও-কোরমার প্রচলন তেমন ছিল না। ১৯৭৫ সালের আগে ঈদে সাধারণ পরিবারে সেমাই-সুজির কারবার ছিল না বললেই চলে। ঈদুল ফিতরে সাদা ভাতের সাথে মুরগির গোশত তা-ও আবার দুই থেকে তিন পিসের বেশি নয়। এখন ছেলেমেয়েরা দুই ঈদে বায়না ধরে তাদের দুই ঈদেই নতুন কাপড় দিতে হবে। এক ঈদুল ফিতরে দিলে বলে এটা তো ঈদুল ফিতরের তবে ঈদুল আজহার কাপড় কই। পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাই, সুজি, কোরমা, মুরাব্বা, জর্দা আরো নানা রকম মজাদার খাদ্য ঈদে এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার।
তবে ঈদুল আজহায় সকালে পায়েসের সাধারণ মেনু, বিকেলে কোরবানির গোশত। এখন যেমন সপ্তাহখানেক কোরবানির গোশত বাসা থেকে শেষ হয়ই না। তখন কিন্তু ওই গোশত দুই ওয়াক্তের বেশি চলত না। গোশত সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তা ছাড়া ঈদের বাজেট যত হবে ধান বা চাল তত বেশি বিক্রি করে দাদাদের খরচ নির্বাহ করতে হবে এমন চিন্তাই বেশি কার্যকর ছিল তাদের মাথায়। ঈদে যে গরু কেনা হতো তাতে কোনোভাবে দেড় মণের মতো গোশত হতো। মগড়া প্রকৃতির গরু কোনো মতে হাট থেকে হেঁটে আসত, মধ্যে ছিল মধুমতি নদী। এমন গরু কেনা হতো যা মধুমতি পার হতে যথেষ্ট বেগ পেত। তখন লোকেরা বলাবলি করত এই গরু যা মধুমতি পার হতে পারছে না তা কিভাবে সাতজন ভাগীকে কিয়ামতে পুলসিরাত পার করাবে? তখন কোনো পরিবারে একটি গরু কোরবানি হতো না। প্রায় সবাই সাত ভাগে কোরবানি করত।
ঈদ সেলামি ছিল না বললেই চলে। পাঁচ পয়সা, ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা অথবা ৫০ পয়সা বেশি হলে এক টাকা। প্রায়ই এক আনার ভুনভুনি অথবা ১০ পয়সার মালাই আইসক্রিম। এখন নতুন জামা-কাপড়ের সাথে সম্মানজনক সেলামি। সেলামি বাবা-মা, দাদা-দাদী, মামা-খালা, চাচা-ফুফু সবারই অঙ্ক থাকতে হবে। এখন ঈদে মিষ্টি-গোশত খাওয়ার পর কোল্ড ড্রিংকস, দই অথবা মজাদার চটপটি না হলেই নয়। পাড়ায় পাড়ায় বিরাট বিরাট সাউন্ড বক্স নিয়ে রকমারি গানের আসর আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।