কি যে হয় একেক দিন! মনটা ফুরফুর করে উড়তে থাকে। গুনগুন সুরে গাইতে থাকে। আজ সকাল থেকে একটা সুর বেজে চলেছে। আমিও গেয়েই চলেছি আপন মনে-
বালাগাল উলা বিকামা’লিহি
কাশাফাদ দুজা বি’জামালিহি
হাসুনাত জামিয়ু খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আ’লিহি।
আহা! কি চমৎকার! কি চমৎকার! শেখ সাদির অমর পঙ্ক্তিমালা। এই পঙ্ক্তিমালা লিখেছিলেন তার গুলিস্থান গ্রন্থেরভূমিকায়।
গুনগুন করতে করতে বেলকুনিতে এসে দাঁড়াই। ওমা, কি সুন্দর ব্লিডিং হার্ট ফুটেছে! থোকায় থোকায় ব্লিডিং হার্ট ঝুলে আছে নত মুখে। যেন লজ্জানত মুখে কলাবধূ! পরম আনন্দে ছুঁয়ে দিচ্ছি একটু একটু করে ঠিক এই সময় বেজে উঠল টেলিফোনটা। দৌড়ে এসে রিসিভ করি। হ্যালো-
অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো... মহারানী!
ও প্রান্তের কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই আমাকে চুপসে দিলো। বরফের মতো জমতে শুরু করেছি। এই কণ্ঠটায় ইদানীং খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে। বিশেষ করে মহারানী ডাকটি। শেষ পর্যন্ত সে আমার নাম দিলো- মহারানী!
আমি টেলিফোন রেখে দিলাম, কোনো কথা না বলেই। কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ভেতরের আনন্দ-স্ফূর্তির টেউ! চেয়ারে বসে পড়লাম বিষণœ হয়ে। চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকলাম শুরু থেকে। নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আমি কি এমন কিছু বলেছি? অথবা এমন কোন আচরণ কি প্রকাশ পেয়েছে আমার পক্ষ থেকে? হিসাব মিলাতে পারছি না। কই? কিচ্ছু তো বলিনি! বিন্দু পরিমাণে কিছু ঘটেনি আমার মনে। তাহলে সে কেন এমনটা করছে? অন্য আট-দশজনের মতোই তার সাথে সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করেছি, স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলেছি। তাহলে...?
যতদূর মনে পড়ে তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক সেমিনারে। আজ থেকে ৮ বছর আগে। সেদিন সে আমার পাশে বসে ছিল। সেমিনার চলাকালীন এবং শেষে অনেক কথা হয়েছিলো। একটা সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলছিল আপনি প্রচুর বই পড়েন মুমু। আপনার সাথেই কথা বললেই বুঝা যায়।
বিনয়ের সুরে বলছিলাম- চাকরি, সংসার, শিশুদের সামলিয়ে তেমনটা পড়তে পারি না। তবে চেষ্টা করি।
এরপরে আর যোগাযোগ হয়নি। তিন মাস আগে ফেসবুকে তার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দেখতে পাই। হাসি মুখের ছবিটা কয়েক দিন ঝুলে থাকল। ছুটির দিনে অবসরে তাকে ফেসবুক বন্ধু করে নিলাম। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল মেসেঞ্জারে শুভেচ্ছা বিনিময়। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতেই তার শুভেচ্ছা বাণী, খুদে বার্তা পেতে থাকলাম। এই করে কয়েকটা দিন পার হলো। কোনো এক সন্ধ্যরাতে সে কল দিলো। আমি টিভিতে মেগা সিরিয়াল দেখছিলাম। টিভি অফ করে তার কল রিসিভ করি। অনেক কথা বলল।
ওর সাথে কথা বলতে খারাপ লাগেনি। স্মার্ট ছেলে। একটু যেন আবেগপ্রবণ ও। ও মাঝে মধ্যেই কল দিত, আমিও সুযোগ পেলে ওর কল রিসিভ করে গল্প করতাম। প্রাণখোলা গল্পু ছেলে। কথা দিয়ে মনজোগাতে পারে। কেমন যেন খুব পরিচিত বন্ধুর মতো মনে হয় ওকে। বন্ধুত্বপূর্ণ আচার ব্যবহার। ভালোই লাগত। কয়েকদিন যেতে না যেতেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সায়াটিকার ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। হাসপাতালের বেডে ছটফট করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মোবাইলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমঘোরে বললাম- কে?
মোহোন। তোমার মোহোন বাঁশি।
এই প্রথম মোহন আমাকে তুমি করে বলল। কিছুটা অবাক হয়েছিলাম বটে। তবে সেটা কাটিয়ে নেই এই ভেবে যে- আমার ছোট্ট ছোট্ট ছাত্রছাত্রীরাও তো আমাকে তুমি করে বলে। আজকাল তুমি করে বলাটা একটা ফ্যাশন। এ যুগের ছেলে মেয়েরা এখন খুব সহজেই তুমি করে বলে।
মোহন অস্থিরতা নিয়ে বলল- বন্ধু, তুমি কই?
আবারো অবাক হলাম ও আমাকে বন্ধু মনে করছে! তবে কিছু বললাম না। মনে মনে আমিও ওকে বন্ধু হিসাবে মেনে নিলাম। বয়সে ছোট কিন্তু মনের দিক থেকে তো প্রায় কাছাকাছি। একজন ছোট বন্ধু থাকতেই পারে লিটিল ফ্রেন্ড।
মোহোন অভিমানের সুরে বলল, তোমাকে কতবার কল দিলাম তবু তুমি কল রিসিভ করছো না কেন বন্ধু?
স্যরি। আমি একটু অসুস্থ।
কী হয়েছে তোমার?
সায়াটিকার ব্যথা।
কি? আমি আসছি। আচ্ছা, তুমি এখন কোথায়?
আমি হাসপাতালে ভর্তি আছি।
ঠিকানা দাও।
আমি আসব তোমাকে দেখতে।
মোহন। কথা শোন। তোমাকে আসতে হবে না।
আমি আসব। তোমাকে একনজর দেখতে চাই। প্লিজ প্লিজ। না করো না।
মোহন আসবেই। কথা শুনলো না।
মোহন এলো রাত ৯টায়। দু’হাতে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ। ফুল আর ফল ভর্তি।
ব্যাস, বন্ধুত্ব পাকা হয়ে গেল। তাকে ভদ্র আর বিনয়ী মনে হলো। যদিও সে বয়সে আমার থেকে ১০-১২ বছরের ছোট। আর সে কারণেই ওর মনটা শিশুর সরলতায় ভরা। হাসপাতাল থেকে ফেরার পরে ও বেশি বেশি ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতে লাগল। আমাদের গল্প চলতে থাকল।
গত শনিবারে মোহন কল দিয়ে বলল- কোথায় আছ বন্ধু?
বাসায় আছি। আমি সহজভাবে বললাম।
কী করছ?
কিছু না।
বেবীরা কোথায়? ভাইয়া কোথায়?
বেবীরাতো স্কুলে, আর তোমার ভাইয়া আজ সকালে কুয়াকাটা রওনা দিয়েছে।
ভাইয়া কুয়াকাটায় কত দিন থাকবেন?
তিন-চার দিন। ওখানে ওর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে।
সত্যি বলছো বন্ধু?
মোহনের গলার স্বর বদলে গেল। গদগদ হয়ে বলল, আমি আসব তোমার কাছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম- কোথায় আসবে?
তোমার কাছে। তোমার বাসায়।
কেন?
তোমার সেবা যত্ন করব।
মানে কী?
এটাও বোঝ না বন্ধু! তুমি না দুই সন্তানের মা!
বুঝতে পারছি না। পরিষ্কার করে বলো তো।
আচ্ছা, বলছি। তার আগে বলো তো- তোমার বাসায় কি ক্যাপ আছে? নাকি আমি আসার সময় তোমার জন্য ফেমিকন নিয়ে আসব?
মোহনের কথা শুনে আমার দু’কান দিয়ে আগুনের ফুলকি বের হতে লাগল। ভাষা হারিয়ে বোবা হয়ে গেলাম। এটা কি বলল! কি করে বলতে পারল? আমরা কেমন সময়ের মধ্যে আছি! প্রেম ভালোবাসা কি মিলাদের তাবারক নাকি পূজার প্রসাদ যে সবাইকে বিলিয়ে দিতে হবে।
মোহনের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। এই লিলি, কথা বল। প্লিজ। একটিবার তোমাকে সেবা দিতে চাই। একটিবার চান্স দাও প্লিজ। আমি ধৈর্য রাখতে পারিনি। মোহনের নম্বর, ফেসবুক আইডি ও মেসেঞ্জার সব ব্লক করে দিয়েছি। তাই সে অপরিচিত নম্বর থেকে কল দিয়েছে। আমি না বুঝে কল রিসিভ করে শুনতে পেলাম মহারানী, তুমি মহারানী হয়েই থাকো।
‘মহারানী’ শব্দটির ভেতরে যে, এত যন্ত্রণা, এত কষ্ট, এত ঘৃণা, এত অপমান লুকিয়ে আছে- সেটা এই প্রথম অনুভব করলাম।
