সামর্থ্য থাকলে ‘ভবন’টি কিনে যত্নের সাথে সংরক্ষণ করে রেখে দিতাম। ভাঙতে দিতাম না কখনো। জীবনের সবচেয়ে স্মৃতিকর দিনগুলো আজো মুখর হয়ে আছে দালানটির প্রতিটি বালুকণায়, প্রতিটি দেয়ালে।
আয়ত চারটি রুম নিয়ে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ ভবনটির উত্তর মাথার কক্ষে আমরা দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ নিয়েছি। সে কক্ষের উত্তর পাশের দেয়ালের গায়ে ছিল বাউলের হাতে একতারা। পশ্চিমে জয়নুলের আঁকা মর্মস্পর্শী করুণ একটি চিত্র। পূর্ব পাশে ছিল আমিষ জাতীয় খাদ্যের তালিকা এবং একটি নোংরা পরিবেশসহ আরো অনেকগুলো ছবি।
মাঝের কক্ষে দশটা থেকে বারোটা নাগাদ প্রথম শ্রেণীর পাঠ চুকে, তৃতীয় শ্রেণীর ঘণ্টা চলতো। সেখানে ছিল বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের টুপি শোভিত একটি আভিজাত্য ছবি। জাতীয় মাছ ইলিশ এবং জাতীয় পাখি দোয়েলের উপস্থিতিতে দারুণ সেজে থাকতো পশ্চিমের দেয়াল।
দক্ষিণ পাশে বিভিন্ন প্রাণী ও বস্তুর অন্তত শতাধিক বর্ণিল চিত্র ছিল। আমরা চারুকলা পরীক্ষার দিন সাদা কাগজে কেরোসিন ঢেলে ছবিগুলোর মধ্যে পেতে ধরতাম এবং স্পষ্ট দেখতে পাওয়া ছবিটির ওপর কলম টেনে পূর্ণ অবয়ব তুলে নিতাম নিপুণভাবে। পরে তাতে রঙ, রস, গন্ধ মেখে অপরূপ করে সাজাতাম। আমি বেশি আঁকতাম নৌকা আর রসুনের ছবি।
খরগোশ এবং কচ্ছপের শিক্ষণীয় দৌড় প্রতিযোগিতার ধারাবাহিক অনেকগুলো দৃশ্য ছিল দক্ষিণের দেয়ালের একেবারে ওপরে। কয়েকটি ময়ূর দাঁড়িয়ে কচ্ছপকে বিজয় মাল্যে ভূষিত করছে।
এরপর ছিল অফিস কক্ষ। সেখানে টাঙানো ছিল বাংলার দুই মহান পুরুষ ‘মেজর জিয়া’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর’ হাস্যোজ্জ্বল সাদা-কালো দুটো ছবি।
দক্ষিণ মাথায় ছিল পঞ্চম শ্রেণীর কক্ষ। সেখানের ষড়ঋতুর দৃশ্যগুলো আমাকে বেশি প্রলুব্ধ করত। খেজুর গাছ কেটে হাঁড়ি ঝুলানোর দৃশ্য, শরতের কাশফুলের মনোরম ছবি ।
বাউলের সাথে? কখনো কী হবে না দেখা, দূরাগত বাতাসে দুলতে থাকা সেই, সাদা রঙের কাশফুলের সাথে?