আসাদ চৌধুরী
সাবেকী
পানিতে ও জলে আধা মরি, আধা বাঁচি
খরা - বন্যায় তবুও তো টিকে আছি।
নির্যাতনের নীরব ভাষায়
মনুষ্যত্ব মরে দুর্দশায়
অলস জিহবা, দৃষ্টিতে বসে মাছি।
জমি তো জানে না কতো ধানে কতো চাল
হিসেব জানে না, শেখেনি কূটচাল,
নদী চেনা নাই খরা ও প্লাবন
মাটে পড়ে নাই আষাঢ় শ্রাবণ
মূর্খ ধরণী শেখে মানুষের চাল।
মানুষের হাতে মানুষ জিম্মি থাকে
প্রতিশোধ আর হিংসার কারুকাজ।
নিরাপদ দূরে শত্রুর কলহাসি,
(এই পৃথিবীকে মনে- প্রাণে ভালোবাসি)।
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
বন্ধ চোখের অন্ধকারে দেখি
তোমার ছোঁয়ায় এ-কোন্ জাদু
তোমার ছোঁয়ায় সুখ
অধরাকে ভেবেই আমার কাঁপলো সারা বুক।
সুখ জেগেছে সুখ জেগেছে
সুখ জেগেছে মনে
কা'র ইশারায় ফুল ফুটেছে
আমার মনের বনে।
মনের বনের পাতার ফাঁকে একী!
বন্ধ চোখের অন্ধকারে দেখি
একটি কুসুম রয় জেগে রয় রোজ
শেষবেলাতে এসে পেলাম খোঁজ।
তার প্রেমেতে উদাস বাঁশি বাজে
পারঘাটাতে দাঁড়িয়ে আছি সাঁজে।
পার করে নাও পার করে নাও আজ
সব ছেড়েছি, ফুরিয়ে গেছে কাজ।
মাহমুদ কামাল
জেগে উঠি মাথা উঁচু করে
ঐ গাছের ছায়ার নিচে বসেছিল যে পথিক
সেই সুযোগসন্ধানী হন্তারক হয়ে
খেয়ে ফেলে জীবনদর্শন
একেকটি বৃক্ষ এভাবেই অনায়াসে উপরে ফেলে
ঘাতক কুঠার।
ছায়াকে উপেক্ষা করে
মায়া ও মমতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে
বেঁচে থাকবার যে প্রাপ্যতা ছিল
তাকে মান্যতা না দিয়ে, নির্দ্বিধায়
উপরে ফেলে ঘাতক কুঠার
আমাদের বৃক্ষগুলো এভাবেই পরাজিত হয়
আমরাও পরাজিত হতে হতে
ফের জেগে উঠি মাথা উঁচু করে
নাসির মাহমুদ
অগ্নিপাথর
মাথার ভেতর একটি পাথর ঘুরছে শুধু ঘুরছে
হৃদয় ভাঙার নিদ্রা ভাঙার ধ্বনি বেজায় তুলছে
ক্ষোভের হাতে অপমানও মিলিয়েছে হাত
তাদের রঙে রঙিন পাথর জ্বলছে দিবারাত
মাটির বুকে বুক মিলিয়ে কিংবা শাওয়ার নিয়ে
কাজ হলো কই! জ্বলছে পাথর মাথায় আগুন ঘিয়ে
আবাবিলের মুখে বুঝি এই পাথরই ছিল
জাহান্নামের আগুনে কতকাল পুড়েছিল
কে জানে তার রহস্যভেদ গোপন কার্যকারণ
পাথরও কি প্রাণীর মতো করে মৃত্যুবরণ!
আজব পাথর হঠাৎ দেখি বলছে কথা কানে-
ঠাণ্ডা মাথা অগ্নি হয়ে আমায় ডেকে আনে।
জায়নামাজেই নাকে মুখে গলে পড়ি আমি
গহীন রাতের অন্ধকারে নামেন অন্তরযামী
তখন যদি অশ্রু দিয়ে ভেজাও কপোল হাত
লাভার মতো গলে গলে হবো কুপোকাত।
তেমনি করে মাথার গোরে অশ্রু ঢালি তাই
অগ্নিপাথর হাত নাড়িয়ে বলল, ‘আমি যাই’!
স. ম. শামসুল আলম
আটকে আছি মহাশূন্য-ডালে
বৃন্তচ্যুত মনুষ্যফুল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির
ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ায়
আটকে আছি মহাশূন্য-ডালে
আমাকে উদ্ধার করে সাধ্য নেই ঝড়, বৃষ্টি,
খরা কিংবা তুষারপাতের
শুকাতে শুকাতে আমি কালের কংকাল
শুধু সুরভি ব্যতীত আর কিছু অবশিষ্ট নেই
আকাশ আমাকে সমগ্র পেতে চায়
মাটিও আমাকে চায় সযত্নে জড়িয়ে রাখতে
কোনো দিকে যেতে পারি না
যদিও দু’দিকেই ভালোবাসা-টান
সকলেই জানে আমার মৃত্যু নেই
কোনো গন্ধ কখনো মরে না
সুগন্ধ হলে তো কথাই নেই
বাতাসে-বাতাসে, বাড়িতে-বাড়িতে,
হৃদয়ে-হৃদয়ে পৌঁছে যায় গন্ধ-চিহ্ন
জানি না কবে মহাশূন্য-ডালের
আঁকশি থেকে মুক্ত হবো
অন্য কোনো ভালোবাসায় চলে যাব
নির্বিঘ্নে ছুটে চলা রাতের মতো
কোনো ভালোবাসা-টান
উপেক্ষা করা দুঃসাধ্য আমার
বাছিত ইবনে হাবীব
শূন্যতা সঙ্গীত
শূন্যতাকে ডাকিনি কখনো কাছে
টের পাই তবু বহু শূন্যতা আছে
পূর্ণতাকে ওরকম ছোঁয়ে
হয়নি কখনো দেখা
অপূর্ণতাই হয়তো আমার
চিরায়ত বিধি লেখা।
মনে নেয়ার চেয়ে মেনে নেয়া জানি
বহুগুণে বেশি ভালো
তাইতো আমার বোধের আকাশ
কখনো আঁকেনি কালো।
দুঃখগুলো ঢাকতে শিখেছি
বেদনার বাণী নীরবে লিখেছি
খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি
লাফালাফি বড় মাছে
শূন্যতাকে পকেটে ভরিনি
হতাশাকে কখনো স্মরিণি
টের পাই তবু আছে
ঘন ঘন অসুখের ডাক
যখনই ভিড়ছে কাছে।
শূন্যতাকে কখনো ডাকিনি কাছে
টের পাই তবু বহু শূন্যতা আছে।
ওমর বিশ্বাস
শিকড়
শিকড়গুলো মাটির ভেতর বেঁধেছে বাসা
যেতে যেতে গহিনের তলদেশ ফুঁড়ে গিয়ে
অন্তহীন কৃতজ্ঞতায় আকাশ ছুঁয়ে দেখে
এ যাত্রা জীবন মূলে ধীর স্থির নয়তো প্রভূত উচ্ছ্বাসে
অমূল্য হয় শ্রাবণের আকাশ।
আকাশ এগোয় সময়ের মুঠো ধরে
পদচিহ্নের পশ্চাতে ঘুম ভাঙা পৃথিবী নিঃশ্বাস ফেলে
মাটির অঙ্কুরে থাকে ভ্রাম্যমাণ সূর্যের প্রদীপ্ত স্নেহ-
সকলে আমরা যাত্রী- আদমের লেবাসের অন্তরালে
আমাদের শরীর ও মায়াময় জেগে থাকা
জীবনের সঙ্কল্পগুলো বিশালাকার এক জিজ্ঞাসার চিহ্ন নিয়ে
দাঁড়ানো বার্তাবাহক।
শিকড়ের রস যত বাতাসের নাভী ধরে টেনে আনে
নদীর জোয়ার হয় লিপিবদ্ধ ফসলের হাত
শুধুই বিলিয়ে দান- প্রাণের বিশ্বাস বেঁচে রয় তাতে
ভাগ্য ধরে টেনে টেনে সেই পথ ছুটে চলে আগের তালেই।
সুঁই দিয়ে সেলাই করা চামড়ার ভাঁজ খুলে উঁকি দেয়
একগাল আকাশ - রক্ত-গোস্ত মেঘের শরীর। আর
বেলা কাটে শিখড় ছুঁয়ে দেখার আশায়।
মাঝে মাঝে পৃথিবীর শরীর ভাঙচুর হয়
দান অবদান শেষে সমান্তরাল চোখের চিত্র নিয়ে
জেগে থাকে একান্ত বিশ্বস্ত বুক।
