কোরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বিশেষ ইবাদাত। নেক আমলগুলোর মধ্যে কোরবানি একটি অন্যতম আমল। মানবজাতির ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানির ঘটনা হজরত আদম আ:-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানি। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদে এসেছে ‘আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনান। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করবই। অপরজন বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করে থাকেন।’ (সূরা মায়িদা আয়াত-২৭)

আদম আ:-এর পরে সব যুগে কোরবানির বিধান চালু ছিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সব শরিয়াতেই কোরবানির বিধান ছিল। এ মর্মে কুরআন মাজিদে এরশাদ হয়েছে : ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে’। (সূরা হজ, আয়াত-৩৪)
শরিয়তে মুহাম্মাদিয়া প্রচলিত কোরবানি যা প্রতি বছর বিশ্ব মুসলিমরা জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে করে থাকে। সেটি হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর অপূর্ব প্রেমের আত্মত্যাগের ঘটনাবহুল স্মৃতিচারণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ঘটনার বর্ণনা কুরআন মাজিদে এসেছে ‘এরপর সে (ইসমাঈল) যখন তাঁর পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো তখন ইব্রাহিম বলল : হে পুত্র! আমি স্বপ্ন দেখি যে, তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বলো? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন তারা উভয়ে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম তাঁর পুত্রকে কাত করে শায়িত করল তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম হে ইব্রাহিম! তুমি স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাঁকে ম্ক্তু করলাম এক মহান কোরবানির বিনিময়ে। আমি এটি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছি।’ (সূরা আছ ছফ্ফাত, আয়াত-১০২ থেকে ১০৯)

কুরআন মাজিদের সবচেয়ে ছোট সূরা আল কাউছারে আল্লাহ ইরশাদ করেন ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন’। মহানবী সা: নিজে কোরবানি করেছেন এবং অন্যকে কোরবানি করতে উৎসাহিত করেছেন। কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না দিলে তিনি সে ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’। (ইবনে মাজাহ)
অপর একটি হাদিসে হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, মহানবী সা: ইরশাদ করেন, ‘ঈদের দিনে আদম সন্তানের সর্বোৎকৃষ্ট আমল হলো কোরবানি করা। কিয়ামতের দিন কোরবানির পশুর শিং, ক্ষুর, লোম, হাড় ইত্যাদি আমলনামায় ওজন করা হবে। কোরবানির জবেহকৃত পশুর রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ার আগে আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্লচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ) মহানবী সা: বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি লোমে একটি করে নেকি রয়েছে।’ (তিরমিজি)

যার কাছে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি বা ফ্ল্যাট, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, পরিধেয় জামা-কাপড়, যেকোনো বাহন ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া সাড়ে সাত ভরি সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা থাকবে অথবা সে পরিমাণ নগদ অর্থ বা টাকা থাকবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। উল্লেখ্য যে, কোরবানির নিসাব পরিমাণ সম্পদ জাকাতের মতো এক বছরকাল মালিকের হাতে মজুদ থাকা অপরিহার্য নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের জন্যে কোরবানি ওয়াজিব। কোনো ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তবে কেবল তার নিজের পক্ষ থেকে কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব। স্ত্রী বা ছেলে-মেয়ের জন্য তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। তবে স্ত্রী ও সন্তানাদি যদি আলাদা ও নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তাহলে তাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। যদি কোনো ব্যক্তির পাঁচজন ছেলে থাকে আর সবাই এক পরিবারভুক্ত হয় তাহলে শুধু পিতার ওপরই কোরবানি করা ওয়াজিব হবে। আর ছেলেদের কেউ পৃথকভাবে মালিক হয় তাহলে ছেলেদের ওপরও কোরবানি করা ওয়াজিব হবে। মেয়েদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। তথা কোনো মহিলা নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তির ওপর শুধু একটি কোরবানি করাই ওয়াজিব। একাধিক কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। সে যত সম্পদের মালিকই হোক না কেন। যেমন যার ওপরে হজ ফরজ, জীবনে একবার একটি হজ করাই ফরজ, বারবার নয়। কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে একাধিক পশু কোরবানি করে এতে সে অনেক সওয়াব লাভ করতে পারে। হাদিসের বর্ণনায় আছে রাসূলুল্লাহ সা: একশত কোরবানি করেছেন। সুতরাং ধনী ব্যক্তি একাধিক কোরবানি করতে পারেন। ওয়াজিব আদায় শুধু একটি পশু কোরবানি করার মাধ্যমেই আদায় হয়ে যায়। ঋণ করে কোরবানি করা ভালো নয়, অন্যের থেকে ধার করে নিয়ে কোরবানি করার কোনো প্রয়োজন নেই। এরপরও যদি সে কোরবানি করে তাহলে সওয়াব পাবে। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়িজ। এমনকি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সা:-এর পক্ষ থেকে কোরবানি করাও বিশেষ সওয়াবের কাজ। হজরত মুহাম্মাদ সা: হজরত আলী রা:কে তাঁর পক্ষ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সা:-এর পক্ষ থেকেও কোরবানি দিতেন। সূত্র সুনানে আবু দাউদ।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট দ্বারা কোরবানি করা ওয়াজিব। এগুলো ছাড়া অন্য কোনো পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়িজ নয়। শর্ত হলো পশুগুলো গৃহপালিত হতে হবে। বন্য হলে কোরবানি জায়িজ হবে না। উপরি উক্ত পশুর নর-নারী উভয় প্রকার দিয়েই কোরবানি করা জায়েজ। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, কোরবানির জন্য বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে। ছাগলের বয়স এক বছর থেকে এক দিন কম হলেও এর দ্বারা কোরবানি করা জায়িজ হবে না। তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি এক বছরের কিছু কমও হয় কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, তা দেখতে এক বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। তবে অবশ্যই এ ক্ষেত্রে ভেড়া ও দুম্বার বয়স ছয় মাস বয়সের হতে হবে।

গরু ও মহিষের বয়স অন্তত দুই বছর পূর্ণ হতে হবে আর উটের বয়স পাঁচ বছর হতে হবে। এক দিন কম হলেও কোরবানি দেয়া জায়েজ হবে না। ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা একজনই কোরবানি দিতে পারে, একাধিক শরিক হতে পারবে না। কয়েকজন মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহিহ হবে না। উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক বা অংশীদার হতে পারে। জোড় বা বেজোড় যেকোনো অংশ হতে পারে। তবে সাতের বেশি শরিক হলে বা কারো অংশ এক সপ্তামাংশ থেকে কম হলে কারো কোরবানিই সহিহ হবে না। ব্যক্তির উপার্জন যদি হারাম হয় অথবা সে আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়া বা লোক দেখানো নিয়তে কোরবানি করে এমন ব্যক্তিকে অংশীদার বানালে কারো কোরবানিই সহিহ হবে না। যদি ছাগলের দাম গরুর সাত ভাগের এক ভাগের সমান বা বেশি হয় তাহলে ছাগল কোরবানি দেয়াই উত্তম। এ ক্ষেত্রে খাসি কোরবানি করা আরো উত্তম। কোনো পশু দেখতে কম বয়স্ক মনে হয়; কিন্তু আসলে তার বয়স পূর্ণ হয়েছে এই ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি সহিহ হবে। আবার কোনো পশু দেখতে পূর্ণ বয়স্ক মনে হয় অথচ বয়স পূর্ণ হয়নি তবে এই ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা ঠিক হবে না। অন্ধ, কানা, খোঁড়া, শিং মূলসহ উপড়ে গেছে, যে পশু অত্যন্ত রুগ্ণ এবং যে পশু জবেহ করার স্থানে হেঁটে যাওয়ার শক্তি রাখে না, যে পশুর লেজ, কান ইত্যাদি তিন ভাগের এক ভাগ হতে বেশি কাটা সে পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়। যে পশুর সম্পূর্ণ দাঁত নেই, জন্মগতভাবে মোটেই কান নেই, যে পশুর নাক কাটা, যে পশুর মুখ এমনভাবে কাটা যার দ্বারা সে ঘাস ইত্যাদি খেতে পারে না আবার যে পশুর এক স্তন বা উভয় স্তন থেকে দুধ না আসে তাহলে তার দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ নেই। হিজড়াজাতীয় বকরির দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নেই। গর্ভবতী পশুর দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। তবে এটি করা মাকরুহ। পশুটি গর্ভবতী বলে জানা ছিল না। কিন্তু জবেহ করার পর পেট থেকে বাচ্চা বের হয়ে গেলে যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটিও জবাই করতে হবে।

কোরবানির দিন ও সময়কাল হলো জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ পর্যন্ত তবে প্রথম দিন কোরবানি করা উত্তম। ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পর কোরবানি করা জায়েজ নেই। কোরবানির পশু জবাই কোরবানিদাতার নিজে করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করতে পারবে। জবাই স্থানে কোরবানিদাতা উপস্থিত থাকা ভালো। ঈদের সালাতের আগে কোরবানি করা জায়িজ নেই। জবাইয়ের সময় পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে দিতে হবে। অতঃপর ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করা ওয়াজিব। জবাইকারী ও জবাইয়ের কাজে সহযোগিতাকারী উভয়ের জন্য ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা জরুরি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের জন্য ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা জরুরি নয়।
কোরবানির গোশত ও চামড়ার বিধান হলো কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজে খাওয়া, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক ভাগ ফকির মিসকিনদের দেয়া মুস্তাহাব। শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে গোশত ভাগ করা জায়েজ নয় ও জবাইকারী কসাই বা কারো সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া জায়িজ নেই। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসেবে গোশত বা তরকারি দেয়া যাবে। কোরবানির চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারবে। আর চামড়া বিক্রি করে তার সম্পূর্ণ মূল্য সাদকা করা জরুরি। চামড়া দ্বীনি মাদরাসায় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে গরিব, ইয়াতিম, মেধাবী দুস্থ শিক্ষার্থী লেখাপড়া চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দান করা অশেষ সওয়াবের কাজ। এসব মাদরাসায় আলাদা গোরাবা তহবিলে এ অর্থ জমা হয় ও যথাযথভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে।

কোরবানির গোশত অমুসলিমকে দেয়াও জায়েজ। কোরবানির গোশত কোরবানিদাতার জন্য বিক্রি করা মাকরুহে তাহরিমি বা হারামের কাছাকাছি। কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সময় জমা করে রাখাও জায়িজ আছে। কোরবানি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তাই কোরবানিদাতার উচিত দোষমুক্ত ও মোটাতাজা পশু দ্বারা কোরবানি করা। কোরবানি হলো আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত অঙ্গীকার। প্রকৃতপক্ষে কোরবানিদাতা পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে সে যেন তার নিজের মধ্যে যে কু-প্রবৃত্তি আছে সেটির গলায় ছুরি চালায়। আল্লাহর হুকুম পালনই যেন কোরবানিদাতার কাছে মুখ্য। কোরবানির মাধ্যমে মুসলিম জাতি আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কুরআন ও হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত যে, কোরবানির বিধান নতুন কোনো বিধান নয়। তাই ইসলামী শরিয়তে কোরবানি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সওয়াবের কাজ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কোরবানির মাধ্যমে পরিপূর্ণ সওয়াব দান করুন।