মানুষের বিচিত্র জিজ্ঞাসার মধ্যে হযরত ইব্রাহিম প্রথম পুরুষ যিনি অস্তিত্বের মূল সত্যকে আবিষ্কার করেছিলেন। তার হাত ধরে যুক্তির সাহায্যে ইসলামী বিশ্বাস বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারই অনুসন্ধানমূলক অস্তিত্ব আবিষ্কারে বিশ্ব নর-নারীর মধ্যে সত্যের যথার্থ উন্মেষ ঘটেছে। হযরত ইব্রাহিমের আগে অতীতেও সত্যের অনুসন্ধান যে ছিল না, তা নয়। অবশ্যই ছিল। তবে তার সময়কার সত্যতার আবিষ্কারের মর্ম ভিন্ন। কারণ সে সময়ে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রবল জিজ্ঞাসা ছিল সর্বত্র। সুতরাং এর মধ্যে এলো মহা চ্যালেঞ্জস্বরূপ ত্যাগের ‘কোরবানি’।
কোরবানি শব্দের অর্থ কী? পৃথিবীর অন্য কনো ভাষায় এর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবি ভাষায় এ শব্দের অর্থ হচ্ছে-মহান আল্লাহর কাছে নিজের অস্তিত্বকে সমর্পণ করা। মানুষ হিসেবে যে অস্তিত্ব রয়েছে সেটা কি নিজের? -না, সেটা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ একটি দান। অতএব কর্ম সম্পাদনার প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহর নির্দেশ মান্য করতে হবে। মানুষ হিসেবে আমরা যা করি, যদি আল্লাহর কথা চিন্তা করে করি, তাহলে আমাদের কর্ম যথার্থ হবে।
পবিত্র কুরআন শরিফে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘এ পৃথিবীতে তোমার জীবন লাভের কারণে তুমি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হও এবং আল্লাহর কাছে নিজেকে উৎসর্গ কর।’ এ উৎসর্গের মধ্য দিয়েই মানুষ তার জীবনকে যথার্থ করে তোলে। কিন্তু প্রশ্ন এখানেই যে মানুষের আবার উৎসর্গ করার কি আছে! প্রত্যেক মানুষেরই তো একটি মাত্র জীবন। যে জীবন আল্লাহর দান। অতএব জীবন লাভের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকব মহান আল্লাহর কাছে। এভাবেই কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে ইব্রাহিমের কোরবানি বিশ্ব মুসলমানদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
প্রকৃতই, মহান আল্লাহর কাছে কোরবানি খুবই প্রিয় উৎসর্গ। হাদিসে আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে কোরবানি দেয়া হয়, সে কোরবানিকৃত জন্তুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা গৃহীত হয় এবং প্রতিদানে কোরবানি কর্তার ইচ্ছাকে মঞ্জুর করা হয়। কাজেই এর মহিমা অপার অথচ অপরিসীম। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়-
যে আপন পুত্রে আল্লারে দেয়/শহীদ হওয়ার তরে
কা’বাতে সে যায় নারে ভাই/নিজেই কাবা গড়ে।
ইব্রাহিমের ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত এ ঈদ। অতত্রব যারা ফাঁকিবাজ, টাকার জোর দেখিয়ে কোরবানি দেয় তাদের আল্লাহ ঘৃণা করেন। এ ঘৃণাকে শ্লেষ ব্যক্ত করে নজরুল বলেছেন-
ওরে ফেরেববাজ/আপনারে আজ দিসনে লাজ
গরু ঘুষ দিয়ে চাস সওয়াব?
পার হয়ে যাস পুলসিরাত/কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব?
কোরবানি, হজ, জাকাত- এ তিনিটি কর্ম সাধনই ঈদুল আজহার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে শ্রেণী ভেদে এসব কর্ম সাধনেও পার্থক্য রয়েছে। যেগুলো মুসলমানদের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর নির্ভর করে। তাই বলে এই নয় যে, এ তিনটি বৈশিষ্ট্য পালনে কোনো ছাড় রয়েছে, বিশেষ কোনো দলের। যারা প্রকৃত বিশ্বাসী তাদের জন্য মহান আল্লাহ অনেক পথ প্রশস্ত রেখেছেন। যেগুলো সাধনে ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। সুতরাং হজরত ইব্রাহিম ও বিবি হাজেরার ছেলে ইসমাইলকে করবানি দেয়ায় যে ত্যাগ, সে অন্তর্নিহিত ত্যাগই হচ্ছে এ ঈদের প্রথম অথচ প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিদ্রোহী কবি নজরুল এ বর্ণনা দিয়ে বলেছেন-
কোরবানিরই রঙ্গে রঙ্গিন পর লেবাস পিরহানে
তোর মাখরে ত্যাগের গুলবাস।
হিংসা-ভুলে প্রেমে মেতে/ঈদগাহেরই পথে যেতে
দে মোবারক দীনের বাদশাহে।
খোদারে দে প্রাণের প্রিয়/কন এ ঈদের মাজেরা
যেমন পুত্র বিলিয়ে দিলেন/খোদার নামে হাজেরা।
ওয়ে কৃপণ দিসনে ফাঁকি আল্লাহে।
এদিকে যার সামর্থ্য আছে, অথচ পবিত্র এ ঈদের বৈশিষ্ট্য পালনে কৃপণতা করে তাদের বলা হয়েছে, তারা যেন এ ঈদ পালন থেকে দূরে থাকে। হাদিসে আছে-‘যার সামর্থ্য আছে তা সত্ত্বেও যে কোরবানি করে না সে যেন আমাদের নামাজে আসে না। এর মানে এটাই পরিষ্কার যে ভালো কাপড় পরিধান করে ঈদের নামাজে শামিল হলেই কোরবানি ঈদের নামাজ হয় না। ত্যাগ না করে টাকা গচ্ছিত রাখতে আখেরে কোনো কাজে আসে না। কাজী নজরুল এ কার্পণ্যতাকে ইঙ্গিত করে রচনা করেছেন।-
নামাজ রোজায় শুধু ভড়ং
ইয়া উয়া পরে সেজে সে সং
ত্যাগ নেই তোর এক জড়
ত্যাগের নামেতে জড়সড়
তোর-নামাজের কি আছে দাম?
ইসলামে ত্যাগের মর্ম অপরিসীম। মহান আল্লাহ ঈদুল ফিতরের দিনে ‘ফিতরা’ ঈদুল আজহার দিনে ‘জাকাত’ ও ‘কোরবানি’ প্রদানের বিধান দিয়েছেন। এতে গরিবরাও ঈদের খুশিতে শামিল হতে পারেন। শুধুই ঈদ নয়, জীবন যাপনে সামর্থ্যবানরা যেন আর্থিক অসচ্ছলও অভুক্তদের সুনজরে দেখেন তার জন্য যাকাত প্রদানের বিধান দিয়েছেন। গরিব-দুঃখীদের রীতিমতো খোঁজখবর নেয়াও সামর্থ্যবানদের আবশ্যিক কর্তব্য। যা ত্যাগের উৎকৃষ্ট উদাহরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ স্থাপন করেছেন। উৎকৃষ্ট অথচ উৎকর্ষতায় ভরপুর এ উদাহরণই হচ্ছে আজকের এ ঈদ। কাজী নজরুলের ভাষায়-
আজ কর উঠে জোর/ খুন দে জান শির, বৎস কন
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ/শক্তির উদ্বোধন।
দুধারি ধার শেরে খোদায়/রক্তে-পুত-বদন
খুনে আর রুধবো মন/ওরে শক্তি হস্তে মুক্তি
শক্তি রক্তে সুপ্ত কন।
