একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোরবানি আজ এক গোশত খাওয়ার বিরাট অনুষ্ঠান। আদিতে নবী হজরত ইব্রাহিম আ:-এর উপর যখন কোরবানির আদেশ হয়। তখন কিন্তু গোশত খাওয়ার বাসনা ছিল না। এর আগে আদম আ: থেকে কোরবানি হতো তার গোশত জ্বালিয়ে দিয়ে তার বিধান কার্যকর করা হতো। আমাদের বিশ^নবীর উম্মতের এটা বিরাট নিয়ামত গোশত খাওয়ার সুযোগ আমাদের জন্য অবারিত। কালের বিবর্তনে কারো কারো কাছে এখন কোরবানি গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কোরবানি এখন পারিবারিক ঐতিহ্য, ফ্যাশন ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে রূপ নিয়েছে।

ছোটকালে আমরা ঈদুল ফিতর বলতে এমন একটা ঈদ বুঝতাম যাতে সেমাই-পায়েস খাওয়া এবং নতুন জামা কাপড় পাওয়া যায়। আর ঈদুল আজহা বলতে কোরবানি ও তার গোশত খাওয়া বুঝতাম। তখন মনে হতো সারা বছর যদি ঈদ হতো তাহলে কতই না ভালো হতো। এখন দেখি ঈদ বলতে ব্যবসায়ীরা ব্যবসার বস্তা বাঁধতে শুরু করে। যেকোনো ঈদ আসলেই সব জিনিসপত্রের দাম হাঁকিয়ে দেয়। দেশের গরিব লোকজন দুই ঈদে একটু আনন্দ উপভোগ করতে চায়; কিন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বুনিয়াদে তা ম্লান হয়ে যায়।

কোরবানিতে আজ আসলে পারিবারিক ঐতিহ্য ও সদস্যদের খুশি করা অগ্রহণ্য হচ্ছে। মনে হয় আমরা তালুকদার বা চৌধুরী পরিবারের সদস্য আমাদের ঐতিহ্য আমাদের ধরে রাখতে হবে। তাই মোটা তাজা হৃষ্টপুষ্ট গরু চাই, নইলে মান-ইজ্জতের হানি হবে। কখনো ক্রেতা ছেলে-পোলাদের নিয়ে বাজারে যায়, তারা যেটাকে পছন্দ করে সেটাই ক্রয় করা হয়। টাকার তো সমস্যা নেই। তা’ছাড়া রাজনীতিবিদরা কোরবানি এলে তাদের দলীয় লোকজন ও ভোটাররা কিসে খুশি সেটাই বিবেচনা করে। ফলে সামনে যেহেতু নির্বাচন আসছে তাই এবার কোরবানিতে গরুর চাহিদা একটু বেশি হবে অন্য বছরের তুলনায়।

পরিবার ও রাজনৈতিক কর্মীরা যেমন গোশত খাওয়ার ধান্ধা করে তেমনি ব্যবসায়ীসহ বিরাট একটা ঘোষিত অঘোষিত সিন্ডিকেট এখানে সক্রিয়। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ব্যবসা কষে নেয়। কোরবানির পশু যারা লালন-পালন করে তারা খাবারের সাথে এমন কিছু ওষুধ খাওয়ায় যাতে সহজে পশুগুলো মোটাতাজা হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা জমে। ওই ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়ায় মানবদেহের ক্ষতি এটা তাদের মাথায় থাকে না। ব্যবসা চাই। এরপর দালালরা যখন পশুগুলো ক্রয় করে তারা এখানে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে ব্যবসা করে। পথে বিভিন্ন সড়ক ও নৌ বাহন পরিচালনা করে বিরাট ব্যবসার আশা ভরসা নিয়ে কাজ করে তারা। পশুগুলো বাজারে বা শহরে আনার সময় পথে ঘাটে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যগণ বিভিন্ন ভাবে সক্রিয় থেকে বিপুল অর্থ কামিয়ে নেয়। বাজারে আসলে দালাল ও ইজারাদার বিভিন্ন ভাবে গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। তার আগে ইজারা পাওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা গুলিতে নানা দেন দরবারের অভিযোগ পাওয়া যায়। হাটের ইজারা পেতে হয়তো লাগবে মামা অথবা ধামা।

এরপর আসে ক্রয়ের পর গরুর ভ্রাম্যমাণ রাখাল তারা ভদ্রলোক পেলে পশু ক্রয়ের সময় অঘোষিত দালালি বখরাসহ বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার পারিশ্রমিক কষে থাকে। এখানে কোনো কোনো শৌখিন ক্রেতা হাট থেকে ছোট পিক-আপ বা ট্রাকে করে পশু পরিবহনে এই সেক্টর বিরাট ব্যবসার সুযোগ লুফে নেয়। তারপর আসে পশুর খাবার। দুই-এক দিন পশু লালন-পালন করতে যে খাবার লাগে তার জন্য বিরাট পশু খাদ্যের পসরা বসে এলাকায়। এছাড়াও দা-বঁটি তৈরিকারীরা ছোট-মোটো এক ব্যবসায়ী রাজ্য গড়ে তোলে। পশু কোরবানি করতে কাঠের বিরাট এক গুঁড়ি বা কুনদার ব্যবসা জমে সাথে হোগলা ও পলিথিন তো আছেই। কসাই আর বাদ যাবে কেন। কসাইরা হাজার প্রতি দুই শ’ টাকা থেকে যার কাছ থেকে যা নিয়ে পারে। এরপর আসেন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা এলাকার সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলোর কর্মচারী যারা বর্জ্য পরিবহন করে মাল না দিলে বর্জ্যে হাত দেয় না। সেটা আবার গোপনে কর্তৃপক্ষ জানলে তাদের সমস্যা, কাউকে বলা যাবে না। তবে মাল দিতে হবে। এরপর ধরেন পশু জবাইকারী মৌলভী বা হুজুর যারা ইসলামী কায়দায় হাদিয়া আদায় করে। পশুপ্রতি দুই শ’ পাঁচশ’ যার কাছ থেকে যা নিয়ে পারে। এভাবে সকল স্তরে শুধু ব্যবসা আর ব্যবসা। মনে হয় কোরবানি ব্যবসার একটি বিরাট মৌসুম। নবী ইব্রাহিম আ: যে মানসিকতা নিয়ে তার ছেলেকে আল্লাহর রাহে কোরবানি করেছিলেন তার অস্বিত্ব আজ হারাতে চলেছে। এই খাতগুলো সেবার সাথে এমনিতেই অর্থ আসে মাঝখানে যদি সেবার মানসিকতা আসে তবে ব্যবসা তো ফাও। এখানে মজার ব্যাপার হলো আমাদের দেশে ক্রেতাকে বাঁকে ফেলে মুনাফা করছে কোনো বিধর্মী নয় খোদ মুসলমানরা।

এর সাথে আসে কোরবানির গোশতের গ্রহীতা তারা বিপুল পরিমাণ গোশত পাওয়ার পর অতিরিক্ত গোশত বাজারে বিক্রয় করে। তবে এরা গরিব বলেই নিজেরা খায় এবং অর্থ কষ্টে কিছুটা বিক্রি করে। এই গোশতগুলো সাধারণত হোটেলগুলোতে বিক্রয় হয় তবে তা নাম মাত্র মূল্যে। সেখানেও হোটেল মালিকদের বিরাট ব্যবসায়ের খাত হয়ে যায়। গরিবরা না খেয়ে বা কম খেয়ে তাদের কাছে নিরুপায় হয়ে গোশত বিক্রি করতে যায় এই সুযোগটা হোটেল ব্যবসায়ীরা কঠিনভাবে কাজে লাগায়। শেষে আছে চামড়ার ব্যবসায়ী তারা সব সময় পানির দামে চামড়া কিনতে চায়। মূলত এই চামড়াগুলো অধিকাংশই মাদরাসা-এতিমখানার। সুযোগতম চামড়া সিন্ডিকেটগণ পানির দামে চামড়া কিনে মাদরাসা-এতিমখানাগুলোর বিরাট ক্ষতি করে। এখানে মানুষের মানসিকতার একটা বিরাট নেতিবাচক প্রবণতা কাজ করে। সমাজ ও আলেমদের এখানে বিরাট ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, শুধু আইন ও সরকার দিয়ে কাজ হবে না। এর পেছনে বিরাট রাজনৈতিক শক্তিও কাজ করছে।

আল্লাহর কত বড় মেহেরবানি আমাদের সন্তানদের পরিবর্তে আজ আমরা পশু কোরবানি দিয়ে রুখসত পাচ্ছি। নইলে সন্তান কোরবানির বিধান থাকলে কী হতো সহজেই অনুমেয়। সন্তানের পরিবর্তে পশু কোরবানির মাধ্যমে আর্থিক কোরবানি চালু হয়েছে। ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ফ্রিজের বদৌলতে কোরবানির গোশত বছর শেষ হলেও গোশত শেষ হচ্ছে না। অথচ বাড়ির পাশের গরিব লোকজন কোরবানিতে সামান্য কিছু পেয়েছে। আর ধনীরা সারা বছর ওই গোশত ভোগ করছে। আপসোস এটা যেন কোরবানি নয় সারা বছর গোশত খাওয়ার মহড়া।