ঈদুল আজহাকে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বক্রি ঈদ’ এবং ব্যবহারিক অর্থে ‘কোরবানির ঈদ’ও বলা হয়। বক্রি ঈদ বলার কারণ এই ঈদে খাসি কোরবানি করা হয় আবার ‘বাকারা’ বা গরু কোরবানির ঈদ হিসেবেও ভাবা হয়। আরবি পরিভাষায় এই ঈদকে বলা হয় ‘ঈদুল আজহা’ বা আত্মত্যাগ বা উৎসর্গের উৎসব। সুতরাং ঈদুল আজহার তাৎপর্যগত বৈশিষ্ট্য বিচারে এই উৎসব পালনে গরু বা পালিত পশু খোদার সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ বা কোরবানি করা। আর এই কোরবানির আগে পবিত্র হজ পালনের প্রসঙ্গটিও স্বতঃসিদ্ধভাবে এ উৎসবের সাথে এসে সংযুক্ত হয়। ঈদুল আজহার এই উৎসব হজ পালন ও পশু কোরবানিসূত্রে সমাজ ও অর্থনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যবাহী প্রভাব ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে ।
ঈদ উৎসবে উৎসর্গের সকল আয়োজন আপ্যায়নের মর্মবাণীই হলো সামাজিক সমতা-সখ্য বৃদ্ধি এবং সম্পদ, সুযোগ ও সৌভাগ্যকে বণ্টন ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা, ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে যা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। আত্মশুদ্ধির জন্য উৎসর্গ বা সংহার প্রকৃতপ্রস্তাবে খোদাভীতি ও তার সন্তষ্টি অর্জনের উপায় হিসেবে জীবে প্রেম বা দয়া ও সেবার প্রেরণা।

ঈদুল আজহা উদযাপনে পশু উৎসর্গের মধ্যে রয়েছে বিশেষ আর্থসামাজিক তাৎপর্য। হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.)কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্ত উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিবেচনায়, ‘আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের মত পূত বোধন/ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।’

সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানবচরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশের মুসলমানগণ সমবেত হন এক মহাসম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলের অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায় একই রীতি রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চাইতে বড় ধরনের কোনো সাম্য মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথায়ও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রঙ ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বচনীয় সখ্য সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হয়।

ঈদুল আজহা উদযাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় যা গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় শনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
হজ পালন উপলক্ষে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুলসংখ্যক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীদের মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। হাজীদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই নির্বাহ হয় এর সাথে এই হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশী টাকা ও বিদেশী মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ থাকত, ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা সূত্রে ব্যয় বাড়ে। গোটা সৌদি আরবের অর্থনীতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই হজ মৌসুমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যবসা বাণিজ্যকে ঘিরে বা অবলম্বন করে আবর্তিত হয়ে আসছিল। কিন্তু এবার করোনাকালে শুধু সৌদি নাগরিকদের অত্যন্ত সীমিত আকারে হজ পালনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোনো প্রভাবক কার্যক্রম পরিচালিত হবে না।
ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গত ২০১৯ সালে ঈদুল আজহার অর্থনীতি ছিল পিআরআইয়ের তথ্যমতে, ৪৫ হাজার কোটি টাকা; সেবার ১ দশমিক ০৫ কোটি গবাদিপশু জবাই হয়েছিল, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মতে, গবাদিপশু বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার; বাকি ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা ছিল পরিবহন, পর্যটন, এবং বিভিন্ন পণ্যাদি বিক্রি থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব মতে, এবার ২০২০ সারে কোরবানির জন্য তৈরি প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ।

কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমার ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, চাঁদিয়া, বাঁশ খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও কসাইয়ের খরচ এমন কি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।
কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সাথে ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৮০০ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১০০-১২০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে। চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হতো কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রফতানির মুনাফা অর্জন হতো তাদের। এবার এ খাতে সে সুযোগ বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রফতানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয় যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি না হয় ।

এটা ঠিক অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যেকোনো উৎসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে উঠে নানান কর্মকাণ্ডে, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। এই আবহকে স্বতঃস্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়ায় কঠোরভাবে দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে এই কর্মকাণ্ড এই মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকের এই তারল্য তারতম্য, পরিবহন খাতের এই ব্যয়প্রবাহ একে স্বাভাবিক গতিতে ধরে রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা পুষ্টিকর প্রতিভাত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

কোরবানির পশুর মাংস আমিষজাতীয় খাদ্যের উপাদান এবং এই মাংসের বিলি বণ্টন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক তাৎপর্য-ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে বছরের একটি সময়ে সকলে আমিষ প্রধান এই খাদ্যের সন্ধান/সরবরাহ লাভ করে থাকে। মাংস রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলা বাবদ প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে এ সময়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সকল লেনদেনে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য বাড়ত, তারল্য সঙ্কটে পড়ে যেত আর্থিক খাত, কলমানি মার্কেট থেকে চড়া সুদে ধার কর্জে নামত ব্যাংকগুলো। চামড়া ঋণ থেকে শুরু করে ঈদের বোনাস বাবদ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যেত। এ সময়ে অবধারিতভাবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পায়। ঈদ উপলক্ষে পরিবহনব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। শহরের মানুষ আপনজনের সাথে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছুটে। একমাস আগে থেকে ট্রেন বাস লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায়- এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর ইনফর্মাল টাউট দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়- এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২০০০ কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়েছিল । এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।