নদীমাতৃক দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাঠ ঘাট নদী নালা খাল বিল পুকুর ডোবা, এ সবকিছুকে মানুষের কাছে রূপসী করে তুলে যে ফুলটি তা হলো শাপলা। শিশুকালেই এ ফুলের সাথে আমাদের পরিচয় হয় সব ফুলের আগে, কারণ বাংলাদেশের টাকা,পয়সা, বিভিন্ন দলিলপত্রে শাপলাফুলের জলছাপ থাকে। খাল বিল পুকুর ডোবায় শিশুরা এ ফুল দেখে দেখে বড় হয়। গ্রামীণ পটভূমির এক অনন্য সৌন্দর্যকে বহন করা ফুল এটি। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এই ফুল যেমন দেখা যায় চাষের জমিতে, তেমনই হয় বন্য এলাকায়। কাটা ধান ক্ষেতের জমে থাকা অল্প পানিতেও এই ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। বর্ষাকালে প্রচুর জন্মে এ ফুল। যেখানে একটু পানি জমে থাকে সেখানেই জন্মে এ ফুল। বর্ষায় প্রকৃতি ও বিভিন্ন জলাশয়কে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে শাপলার জুড়ি নেই। সপুষ্পক উদ্ভিদ পরিবারের এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ এটি। এ পরিবারভুক্ত সকল উদ্ভিদই শাপলা নামে পরিচিত। তবে শুধু সাদা শাপলা ফুলই বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এই ফুল সাধারণত ভারত উপমহাদেশে বেশি দেখা যায়। শাপলাফুল প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে এই ফুল পুকুর ও বাগান সাজাতে খুব জনপ্রিয়। সাদা শাপলা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশের পুকুর ও হ্রদে দেখা যায়। এই ফুল পাপুয়া নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায়ও দেখা যায়। বিশ্বে এই উদ্ভিদের অনেক প্রজাতি পাওয়া যায়। জায়গা ভেদে এদের বিভিন্ন নামও আছে। যেমন বাংলায় বলা হয় শাপলা। ইংরেজিতে শাপলাকে বলা হয় “ডধঃবৎ খরষু”, ডযরঃব ডধঃবৎ খরষু, ডযরঃব খড়ঃঁং. অন্যান্য ভাষায় : থারো আংগৌবা, ভেলাম্বাল, কুমুদ, নিরাম্বল, কান্নাইদিলি, নাল। বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক বা নীলকমল, লাল শাপলা ফুলকে রক্তকমল বলা হয়। এমনকি চট্টগ্রামে অঁলাফুল বলা হয়। শাপলা ফুল ভোর বেলা ফোটে এবং দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে পাপড়ি বুজে যায়। ভোরের সূর্যের আলোর হাসির সাথে গ্রাম বাংলার এ জলাশয়গুলোও হেসে ওঠে যেন পরম মমতায়, পবিত্র ও শুভ্রতায়। এ উদ্ভিদ সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। শাপলার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা ডাঁটি বা পুষ্পদণ্ড পানির নিচে মূলের সাথে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সাথে এবং পাতা পানির ওপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম নেয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয় কিন্তু নিচের দিকে কালো রঙ। ভাসমান পাতাগুলোর চার দিক খাঁজকাটা থাকে। পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি প্রায় ০.৯ থেকে ১.৮ মি.। শাপলা ফুল নানা রঙের দেখা যায় যেমন : গোলাপি, সাদা, নীল, বেগুনি ইত্যাদি। এই ফুলে চার থেকে পাঁচটি বৃতি থাকে ও ১৩ থেকে ১৫টি পাপড়ি থাকে। ফুলগুলো দেখতে তারার মতো মনে হয়। কাপের সমান বৃতিগুলো ১১-১৪ সেমি. হয়ে থাকে। প্রায় বছরের সব সময় শাপলা ফুটতে দেখা যায় তবে বর্ষা ও শরৎ এই উদ্ভিদ জন্মানোর শ্রেষ্ঠ সময়।
এই ফুল শ্রীলঙ্কারও জাতীয় ফুল। শ্রীলঙ্কায় এই ফুল ঘরষ গব্জহবষ নীল মানেল নামে পরিচিত। শ্রীলঙ্কার ভাষায় নীল থেকে এই ফুলকে ইংরেজিতে অনেক সময় ইষঁব ষড়ঃঁং বলা হয়। শাপলাফুলের পরিবার বা গোত্র হলো ঘুসঢ়যধবধ। এটি একটি গ্রিক শব্দের অনুবাদ। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটলের এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এই উদ্ভিদ প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব পুরনো। তিনি আরো বলেছেন, প্রাচীন গ্রিকে জল দেবীদের এই ফুল উৎসর্গ করে উপাসনা করার রীতি ছিল। মানুষ এই ফুল খেত, আঁকত ও শ্রদ্ধা করত। কথিত আছে ভারতে হিন্দুদের সর্পদেবী মনসা পূজায় শাপলা ফুল দেয়া হয়। আমাদের দেশে শিশু-কিশোররা এই শাপলা তুলে এনে মালা গাঁথে। গলার মালা, হাতের চুড়ি, কোমরের বিছা, মাথার টিকলি, টোপর বানায়। পুতুলের ঘর সাজায়।। শাপলার ডাঁটা এবং ফুল শিশুদের এক ধরনের খেলার সামগ্রী। কৈশোরের সেই দুরন্তপনার সাথে শাপলা ওতপ্রোতভাবে জড়িত গ্রামে বড় হওয়া প্রতিটি মানুষের কাছে। শাপলা প্রাচীন যুগ থেকেই বিভিন্ন জাতীর প্রার্থনা বা বাগান সাজানোর পাশাপাশি খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও শাপলার ডাঁটা, শালুক, ফুল সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সে প্রাচীনকাল থেকে। অনেকের কাছে এ সবজি অনেক প্রিয়। ইলিশ মাছের সাথে ডাঁটার ঝোল, চিংড়িযোগে ভাজি বেশ ভালো হয় খেতে। শাপলার গোড়ায় আলুর মতো কন্দ থাকে যা শালুক নামে পরিচিত, এই শালুকও সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। অনেকেই এই শালুক কাঁচাও খায়। অতীতে এমন হয়েছে সারা দিন যারা মাঠে কাজ করতেন তাদের ক্ষুধা পেলে এই শালুক তুলে খেয়ে তাদের ক্ষুধা নিবারণ করে আবার কাজে যোগ দিতেন। শাপলা ফুলের ভাজি বা ভর্তা খাওয়া যায়। শাপলার ফল, যা ‘ঢ্যাপ’ নামে পরিচিত। এটি দেখতে গোলাকার। কচি ঢ্যাপের বীজ লাল এবং আঠাল থাকে। পাকলে বীজ কালো হয়ে যায়। এই ঢ্যাপ শিশুরা বিভিন্ন জলাশয় থেকে তুলে এনে খায়। পাকা ঢ্যাপের বীজ শুকিয়ে মা চাচিরা খৈ ভাজে। যা ‘ঢ্যাপের খৈ’ নামে বেশ পরিচিত। এই খৈ আর গুড় দিয়ে মোয়াও অনেকে বানিয়ে রাখে। দীর্ঘদিন রেখে খাওয়া যায় সেটা।
নীল শাপলা ফুল ও লাল শাপলা ফুল ঘর সাজাতে ব্যবহৃত হয়। এটি বাগানের জলাধারে লাগানো বা অ্যাকুরিয়ামে রাখার জন্য খুব জনপ্রিয় একটি উদ্ভিদ।
ভারতে আম্বাল নামের আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতে শাপলাকে ওষুধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ওষুধ অপরিপাকজনিত রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক গবেষকরা দাবি করছেন এটি ডায়াবেটিসের জন্য কার্যকরী। এ ছাড়াও অতিরিক্ত পিপাসা নিবারক ও প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াতে এটি ব্যবহৃত হয়। এই উদ্ভিদ পানি থেকে তুলে রোদে শুকিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ জলাশয় ভরাট হওয়ার কারণে আগের মতো এখন আর সব জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় না আমাদের এই জাতীয় ফুল শাপলা। তবে কিছু ছাদচাষি শাপলা ছাদে চাষ করছেন সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য।