এক পাহাড়ের পাদদেশে বাস করত দু’টি বিশালদেহী সিংহ। একজনের নাম রিংকু, আরেকজনের নাম টিংকু। নামে মনে হতে পারে তারা একই মায়ের গর্ভজাত সন্তান, আপন দু’ভাই। বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল অন্তরঙ্গ দুই বন্ধু।
রিংকু ও টিংকুর পরিবার যে বনে বসবাস করত; সেটি ছিল নদীঘেঁষা। নদীর দু’ধারে বিশাল অরণ্য। সে গহিন অরণ্যেই ছিল তাদের বাসস্থান। তারা দু’জন ছোট থেকেই খুব ভালো বন্ধু। প্রতিদিন দুপুরে তারা দু’জন নদীর পানিতে মহা আনন্দে গোসল করত। খেলত। পানির কোলে গা ভাসিয়ে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিয়ে থাকত। চোখ রক্তজবার মতো লাল না হওয়ার আগ পর্যন্ত পানি থেকে কিছুতেই উঠত না।
একদিনকার ঘটনা। সময়টি ছিল গ্রীষ্মকাল। সূর্য সেদিন রেগে ফেটে পড়েছিল। আকাশ থেকে যেন অগ্নিবৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। রিংকু টিংকু দু’জন মিলে নদীতে গা ভাসিয়ে দিয়ে গোসল শুরু করল। ওঠার নামই নিচ্ছে না আজ। অনেক সময় পরে রিংকু বলছে, টিংকু আজ এখানেই গোসলের ইতি টানছি, চল বাড়িতে যাই। বাবা-মা অপেক্ষা করছেন। টিংকু সহমত প্রকাশ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবে- এমন সময় শিয়াল পণ্ডিত এসে খবর দিলো যে, তোমরা বাড়িতে যেও না। খারাপ খবর আছে। আপাতত আমার সাথে আসো। শিয়াল পণ্ডিত তাদেরই শিক্ষক ছিল। সে তাদের দু’জনকে সকাল-বিকাল দু’বেলা পড়াত।

তারা দু’জন কথা না বাড়িয়ে শিক্ষকের সাথে হাঁটা শুরু করল। একপর্যায়ে তারা পাহাড়ের এক পাদদেশে আশ্রয় নিলো। রিংকু এবার আগ বেড়ে জিজ্ঞেস করল, স্যার কী হয়েছে, আমরা কি জানতে পারি? শিয়াল পণ্ডিত ছলছল চোখে, হতাশ কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘তোমার বাবা-মায়েদের মানুষরা ধরে নিয়ে গেছে।’ এই বলে পণ্ডিত মশাই হাও মাও করে কেঁদে ফেলল। এরপর থেকে রিংকু টিংকু এই পাহাড়ের পাদদেশেই বসবাস শুরু করল। আস্তে আস্তে তারা অনেক বড় হয়ে গেল।
এক সাথে থাকতে থাকতে তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীর হলো। একজন আরেকজনকে ছাড়া কোথাও যেত না। খেত না। শিকারও করত না। টিংকু একদিন সকালে বলছে রিংকু চল না আজ আমরা দৌড়ে প্রতিযোগিতা করি। রিংকু হেসে উঠে বলল, সত্যি সত্যিই বন্ধু? টিংকু মাথা নাড়িয়ে বলল, হ্যাঁ সত্যি। প্রতিযোগিতার জন্য তারা একটি ফাঁকা মাঠ বেছে নিলো, যার আশেপাশে বনজঙ্গল।
শুরু হলো দৌড় প্রতিযোগিতা। রিংকু টিংকুর থেকে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী, তাই সে দৌড়ে অনেক সামনে চলে গেল। এদিকে ঘটনা ঘটে গেল আরেকটা। বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক ঝাঁক হিংস্র প্রাণী। যাদের নাম হায়েনা। এরা দলবদ্ধ হয়ে শিকার করে। একটি দলে ৮০-২০০টি পর্যন্ত হায়েনা থাকে। এরা দলবদ্ধ হওয়ার কারণে এদের চেয়েও বড় প্রাণীদের তোয়াক্কা করে না।
টিংকু বড় বিপদে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এদিকে রিংকু দৌড়ে অনেকদূর চলে গেছে। হায়েনার দল টিংকুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু টিংকু মনে মনে ভয় পেলেও বাইরে সে সাহসিকতার সাথে লড়ে যাচ্ছে। বুঝতেই দিচ্ছে না, সে ভীত। থেকে থেকে বিকট আওয়াজে ডাক মারছে। হায়েনাদের তাড়িয়ে একদিকে হাঁকিয়ে দিচ্ছে। রিংকু পিছে ফিরে দেখে টিংকু অনেক পিছে। আবার সে হায়েনাদের হিংস্রজালে আবদ্ধ। এ দেখে তেজ গতিতে দৌড়ে এসে বন্ধুকে হিংস্র হায়েনাদের থেকে রক্ষা করেছে।
তবে লড়াইয়ের সময় হায়েনাদের আঁচড়ে রিংকুর পিঠের বেশ খানিকটা চামড়া উঠে গেছে। তাই দেখে টিংকু বলছে, বন্ধু আমার জন্য আজ তুমি আহত হলে। এ কথা বলে তার মাথা অবনত করল। রিংকু বলল, বিপদেই বন্ধুর আসল পরিচয়। আর তুমি তো আমার কলিজার বন্ধু। তোমাকে বিপদে রেখে আমি তো আনন্দ করতে পারি না। আমি তোমার জন্য জীবনও দিতে পারি। এ বলে তারা আস্তে আস্তে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে রওনা হলো।