হামাসের সাম্প্র্রতিক ‘অপারেশন আল-আকসা তুফান’ পৃথিবীতে ঝড় তুলেছে। তারা অবশ্যই ইসরাইলি প্রতিক্রিয়া হিসেব কষেই এই অভিযান পরিচালনা করেছে। একটি ‘ননস্টেট একটর’ হয়েও ‘হামাস’ বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাসী রাষ্ট্র এবং তাদের অন্ধ সহায়তাকারী বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো পশ্চিমা বিশে^র হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়েছে। মাত্র এক থেকে দেড় হাজার হামাস যোদ্ধা এই অভিযানটি পরিচালনা করেছে। হামাস জানে প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল হিংস্র হায়েনার চেয়েও বেশি নৃশংস হবে আর মার্কিনিরা সেই নৃশংসতায় পূর্ণ সমর্থন জোগাবে, হামাস জানে ইসরাইলি সশস্ত্রবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তাদের দুই শতাধিক নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ও বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর যুদ্ধ সতর্ক পদ্ধতি রয়েছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ আমেরিকা ইসরাইলকে সমর্থন জানাবে। তারপরও হামাস কেন এই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় গেল? উত্তর একেবারেই সহজ! একটি বিড়ালকে যদি কিছু লোক ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে মারতে থাকে তখন বিড়াল তার যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়েই প্রতিআক্রমণ করবে! আজ থেকে ৭৫ বছর আগে যুক্তরাজ্যের প্রতারণা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের জোর করে তাদের চৌদ্দপুরুষের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করে দখলে নিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেছিল। এরপর থেকে বিগত ৭৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের হত্যা, গুম, জেল, বিমান আক্রমণ ইত্যাদির মাধ্যমে ‘নাকবা’ বা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ফিলিস্তিনের মাটির কোনায় পশ্চিমতীর এবং গাজায় আবদ্ধ করে রেখেছে। আর প্রায় প্রতি বছর রমজান এলেই ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত মসজিদে আল-আকসাকে বুটের তলায় অপবিত্র করেছে। ছেলের সামনে বাবাকে-মাকে টেনে-হিঁচড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি সৈনিকরা, প্রতিনিয়তই ফিলিস্তিনি বাবারা নির্বাক হয়ে ইসরাইলি সৈন্যদের হাতে নিহত সন্তানের লাশ দাফন করছে। এই ভাবে মার্কিনিদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ইসরাইলিরা যুগ যুগ ধরে কোণঠাসা করে রেখে পুরো ফিলিস্তিন জাতিকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে। এরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে আজকের হামাস। ইসরাইলের সম্ভাব্য নৃশংস ও অমানবিক প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখেই তারা এই হামলা চালিয়েছে। কাজেই এই অভিযানকে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী আক্রমণ বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। কারণ, ফিলিস্তিনিরা গত ৭৫ বছর ধরে প্রতিদিনই যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে ইসরাইলি সশস্ত্রবাহিনীর সাথে। হামাসের এই আক্রমণ তাদের চলমান যুদ্ধেরই অংশ। পশ্চিমারা এটিকে যতই সন্ত্রাসী হামলা বলুক না কেন। ইসরাইলি বিমান যখন নিরীহ ফিলিস্তিনি বসতিগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ করে, ইসরাইলি সশস্ত্র সৈন্যরা যখন ফিলিস্তিনি বালক-বালিকাদের ইট নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় গুলি করে পাখির মতো নারী ও শিশুদের হত্যা করে তখন সেটাকে মার্কিনিরা বলে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার! অথচ ইসরাইল সরকার এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গত ছয় যুগ ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ওপর।

কাজেই অত্যন্ত হিসেবি ঝুঁকি নিয়ে ‘অপারেশন আল-আকসা তুফান’ সম্পন্ন করে ‘হামাস’ তাদের উদ্দেশ্য সফল করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রথমত তারা ছয় যুগেরও অধিক সময় ধরে পুঞ্জীভূত হতে থাকা ক্ষোভের নিরসন ঘটিয়েছে। হামাসের ‘Cause’ বা ‘কারণের’ প্রতি তারা বিশে^র বিবেককে আকৃষ্ট করতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত মার্কিনিদের মাধ্যমে চলমান সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তথাকথিত ‘আব্রাহাম একর্ডের’ মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্কোন্নয়নে অবশ্যই ছেদ পড়বে। সংযুক্ত আরব-আমিরাত এবং বাহরাইন অবশ্যই তাদের জনগণের চাপের মধ্যে পড়বে ‘আব্রাহাম একর্ড’ নিয়ে। এছাড়া সদ্য সমাপ্ত জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত অহমিকাভরে ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনকে ছাড়াই নতুন মানচিত্রের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইসরাইলের এই অহংবোধ, নি-িদ্র নিরাপত্তার বড়াই এবং মধ্যপ্রাচ্যের অজেয় শক্তিমত্তার ‘মিথ’ সবই ‘হামাস’ যোদ্ধারা মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই ভূলুণ্ঠিত করে দিয়েছে। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসরাইলিরা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কখনোই নিরাপদে-নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে না। কারণ ফিলিস্তিনিরা বাড়িঘর ছাড়া অসহায় হয়ে পড়লেও তারা তাদের বাপ-দাদার ভিটার দাবি কখনো ছাড়বে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই দাবি ধরে রাখবে এবং তা ফিরে পাওয়ার জন্য আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যেতে থাকবে। হামাসের আর এক সফলতা হলো চীন ও রাশিয়া এই সঙ্ঘাতকে উপলক্ষ করে নতুন করে স্বাধীন ফিলিস্তিনের যৌক্তিকতা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে।

এই আক্রমণে ‘হামাস’ দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের ওপর স্ট্র্যাটেজিক এবং ট্যাকটিক্যাল বিজয় লাভ করেছে। জানা যায়, গত দুই বছর ধরে ‘হামাস’ অপারেটিভরা মোট ছয়টি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ক্যাম্প ইসরাইল সীমান্তের একেবারে নিকটবর্তী ছিল। এমনকি সীমান্তের আধা মাইলেরও কম দূরত্বে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের অবস্থান পাওয়া যায়। আবার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ‘ইরেজ ক্রসিং’ এর কাছেই আরো একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সন্ধান মিলে যেখানে ইসরাইলি বাহিনীর কঠোর নজরদারি রয়েছে। তারা আশপাশের কৃষি জমিগুলোতেও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এমনকি ‘হামাস’ যোদ্ধারা প্যারাগ্লাইডার উড্ডয়ন, অবতরণ এবং গুলি ছোড়ার প্রশিক্ষণও নিয়েছিল। ‘হামাস’ দীর্ঘদিন ধরে এতসব প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে ইসরাইল গোয়েন্দাদের চোখে ধুলি দিয়ে। আর অভিযানের সময় তারা সার্বিকভাবে ট্যাকটিকাল বা রণকৌশলগত বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তারা এক হাজার যোদ্ধাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ‘ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট’ ভোরের আলো ফোটার আগেই মাত্র ২০ মিনিটে তিন হাজার রকেট নিক্ষেপ করে ইসরাইলি বাহিনীকে ‘হকচকিত’ বা Surprised করে ফেলে। এর আড়ালে ‘ছত্রীসেনা ইউনিট’ প্যারাগ্লাইডার দিয়ে সীমান্ত বেড়ার ওপর দিয়ে ওড়ে গিয়ে ইসরাইলের ভূমিতে নামে এবং ‘পদাতিক বাহিনীকে’ সীমান্ত পারাপারের সুযোগ করে দেয়। এই ‘ছত্রীসেনা ইউনিটে’র নাম দেয়া হয় ‘এয়ারফোর্স ফ্যালকন স্কোয়াড্রন’। এমনকি কোনো কোনো প্যারাগ্লাইডারে দু’জন যোদ্ধাও অবতরণ করে। এরপর ‘এলিট ইউনিটের’ ৪০০ জন যোদ্ধা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সুরক্ষিত সীমান্ত বেড়া ভেঙে ইসরাইলে প্রবেশ করে। প্রথমে ছোট করিডোর সৃষ্টি করে মোটরসাইকেলে এবং পরে বুলডোজার দিয়ে বেড়া ভেঙে গাড়িবহর নিয়ে আক্রমণ রচনা করে। তারা ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক সদর দফতর ও সেনা ঘাঁটিগুলো দখল করে নেয়। হামাসের ‘ড্রোন ইউনিট’ সীমান্তে নজরদারি বা Surveillance জারি রাখে। আর এই আক্রমণের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতির পুরো সময়ই তাদের ‘গোয়েন্দা ইউনিট’ নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করে।

তবে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস’ ছন্দ ফিরে পায় এবং পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে ৭৫ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাওয়া এই বর্বর সন্ত্রাসী সশস্ত্রবাহিনী নৃশংসতা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজাকে ‘জনমানবহীন দ্বীপে’ পরিণত করার শপথ নেন। হামাস অধ্যুষিত গাজা উপত্যকায় তারা সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে। খাদ্য, পানীয়, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ¦ালানি ইত্যাদি সব কিছুকেই বন্ধ করে দেয়। গাজার ২৩ লাখ বনি আদম এখন মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। মাত্র একসপ্তাহে ছয় হাজার বার বিমান হামলার পাশাপাশি প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করেছে। উত্তর গাজা থেকে ১১ লাখ ফিলিস্তিনিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাড়িঘর ছাড়ার এক অবাস্তব নির্দেশ দিয়েছে এবং সীমান্তে ৩ লাখ স্থলবাহিনী মোতায়েন করেছে গাজায় ভূমি হামলা পরিচালনার উদ্দেশ্যে। এভাবে গাজা ভূখণ্ডে এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ইসরাইল যদি গাজায় এই সর্বাত্মক অবরোধ লম্বা সময় ধরে জারি রাখো এবং গ্রাউন্ড অপারেশন পরিচালনা করে তবে গাজায় ২৩ লাখ মানুষের ভাগ্যে কী ঘটবে তা চিন্তা করলেও গা শিউরে উঠে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ইসরাইল গ্রাউন্ড অপারেশন পরিচালনা করতে কিছুটা হলেও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে। তারা বিশাল বাহিনী দিয়ে গাজা ঘেরাও করে হামাসের হাতে বন্দি জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। তবে গাজায় স্থল আক্রমণে উভয় দিকেই তাদের বিপদ রয়েছে। এই হামলায় গাজায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলে সারা বিশে^র রোষানলে পড়তে পারে ইসরাইল। অন্যদিকে গাজা ঘনবসতিপূর্ণ শহর হওয়ায় সেখানে হামাসের সাথে যুদ্ধ হতে পারে ভয়াবহ। হামাস জালের মতো টানেল খুঁড়ে প্রতি ইঞ্চি ভূমি ইসরাইলি সৈন্যদের জন্য মৃত্যুপুরি বানিয়ে রেখেছে। ২০০৬ সালে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে হিজবুল্লাহর কাছে এমন টানেল রণকৌশলের কাছে পরাস্ত হয়েছিল। কাজেই তারা এখনো সময় ক্ষেপণ করছে বলে মনে হচ্ছে। তবে হামাসের হাতে বন্দী ইসরাইলের মুক্তির বিষয়ে তারা দর কষাকষির চেষ্টা করছে। কিন্তু গাজা অবরোধ অবসানের বিনিময়ে ‘বন্দী’ মুক্তি দিলে হামাসের অন্যতম উদ্দেশ্য সফল হবে না। কারণ, ইসরাইলের কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তির দর কষাকষির জন্যই তারা প্রায় দেড়শ ইসরাইলি সেনা ও নাগরিকদের বন্দী করেছিল। আর হামাস এটাও বুঝতে পারছে যে, গাজায় তিন লাখ সৈন্যের স্থল আক্রমণ হলে সেখানে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটবে যা আসলে ইসরাইলের বিরুদ্ধেই যাবে। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘ ইসরাইলিদের যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে কথা বলেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন গাজায় ‘স্থল আক্রমণ’ অগ্রহণযোগ্য হবে। চীনও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মাধ্যমেই সঙ্ঘাতের মীমাংসা রয়েছে বলে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে। সৌদি আরব ও জর্দান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছে বলে মনে হচ্ছে। ইরান তো হুমকি দিয়েই রেখেছে ইসরাইলকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সরকারগুলো অন্ধভাবে ইসরাইলকে সমর্থন দিলেও তারা দেশের ভেতর থেকে যথেষ্ট চাপ অনুভব করছে। এদিকে সামনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন থাকায় প্রেসিডেন্ট জোবাইডেন দ্বিধার মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন বলে মনে হয়। এমনিতেই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই চাপের মধ্যে আছেন। ইসরাইলকে মার্কিনিদের একটি অংশ সমর্থন করলেও তারা গাজায় মানবিক বিপর্যয় ঘটলে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অনুমোদনকে নাও মেনে নিতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক এই সংঘাতে ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো মধ্যপ্রাচ্যের ‘ননস্টেট একটর’ গোষ্ঠীগুলো। ইসরাইল সীমান্তের উত্তরপ্রান্তে লেবাননের ‘হিজবুল্লাহ’ হামাসের সমর্থনে যেকোনো সময় মারাত্মক হামলা চালাতে পারে। হিজবুল্লাহও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা ২০০৬ সালে ইসরাইলের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেমে ইসরাইলকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল। হিজবুল্লাহর মনোবল, রণকৌশল, স্ট্র্যাটেজি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট ইসরাইলের আতঙ্কের কারণ। এদিকে যেকোনো সময় ইয়েমেনের ‘হুতিরা’ও জ্বলে উঠতে পারে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। এই সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে ‘আলকায়েদা’ এবং ‘আইএস’ পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে নামতে পারে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। আর সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়লে ইউক্রেনের জন্য সরবরাহকৃত পশ্চিমা স্মার্ট অস্ত্রগুলো কালোবাজারির মাধ্যমে ঢুকে পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যা শুধু এ অঞ্চলের ‘ননস্টেট একটর’ গোষ্ঠীগুলোকেই শক্তিশালী করে তুলবে ইসরাইলকে ধ্বংস করার কাজে। এদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা গোষ্ঠীকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আটকে ফেলার মতো কৌশল করে ইউক্রেন যুদ্ধে ফায়দা নেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে রাশিয়া। আর চীনও তাইওয়ানে Free-run পাওয়ার কৌশল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতে আমেরিকাকে ব্যস্ত করে তোলার উদ্দেশ্যে মুসলিম দেশগুলো এবং ‘ননস্টেট একটর’গুলোকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন সিদ্ধক্ষণে আরো নতুন কোন চরমপন্থী গোষ্ঠীর উদ্ভব হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের থিয়েটারে। সব মিলিয়ে ইসরাইলের দ্বারা ‘গাজা’ উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় ঘটলে পুরো পৃথিবী এক ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতার বন্দরে পৌঁছে যেতে পারে। বিশে্ব এক দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘর্ষের সূত্রাপাতের উৎস হয়ে উঠতে পারে গাজার ‘মানবিক বিপর্যয়’। ইতোমধ্যেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির অঙ্গনে চীনকে সম্প্রতি অগ্রগামী দেখা যাচ্ছে। চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরানের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলে যাচ্ছে। তুরস্ক বিশ^ দরবারে উদীয়মান শক্তি। জর্দান, ইরাক, সিরিয়া সবাই ফিলিস্তিনিদের সমর্থক। বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ‘আব্রাহাম একর্ড’ নামের মধুচন্দ্রিমা ইসরাইলের সাথে কতদিন থাকবে বলা মুশকিল। আর মধ্যপ্রাচ্যে মিসর একাকী কতদিন মার্কিন আউটপোস্ট হয়ে থাকতে পারবে তাও নির্ভর করবে মিসরের জনগণ প্রেসিডেন্ট সিসিকে কতটুকু চাপে ফেলতে পারে তার ওপর। তবে এ কথা বলা যায় যে, বারুদের ওপর রয়েছে ‘গাজা’। ইসরাইল এখানে গ্রাউন্ড এটাক বা স্থল অভিযান করে চরম ‘মানবিক বিপর্যয়’ ঘটালে সারা বিশে্বর আপামর জনগণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্বলে উঠতে পারে যা ইসরাইল জাতিরাষ্ট্রকে এবং প্রতিটি ইহুদি নর-নারীকে বিশ^ব্যাপী অনিরাপদ করে তুলতে পারে।