পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই বিচারকদের নিকট জনমানুষ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। আর এ কারণেই বিচার বিভাগকে বলা হয় জনমানুষের শেষ ভরসাস্থল। জনমানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা বিরাজমান যে, সব মহল হতে তারা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হলেও বিচার বিভাগ তাদের নিরাশ করবে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে এ ধারণাটি অটুট থাকলেও আমাদের দেশে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক বিচারকদের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্ত অনুকূলে প্রদানের কিছু কিছু ঘটনা বিচারকদের নিজ মুখ হতে শুনার পর বিচারকদের স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আমাদের সংবিধানে উচ্চাদালত ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের বিষয়ে বলা হয়েছে- বিচার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন থাকবেন। আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে শুধুমাত্র প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রে ‘বিচারপতি’ পদবিটি উল্লেখ রয়েছে। উচ্চাদালতের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের পদবি ‘বিচারক’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদবি জেলা বিচারক, অতিরিক্ত জেলা বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট প্রভৃতি নামে উল্লেখ রয়েছে।

বিচারপতির ইংরেজি হলো Justice. Justice অর্থ ন্যায়বিচার। Justice এর বিপরীত শব্দ Injustice. Injustice শব্দটির বাংলা অর্থ হলো অবিচার। বিচার কার্যে নিয়োজিত একজন ব্যক্তি যার পদবির সাথে Justice নামটি যুক্ত তিনি কখনো ন্যায়বিচার হতে বিচ্যুত হয়ে অন্যায়ের পক্ষাবলম্বনে অবিচার করবেন এটা সাধারণ জনমানুষের ভাবনার বাইরে।
উচ্চাদালতের বিচারকদের সব ধরনের প্রলোভনের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য ’৭২-এর সংবিধানে অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বারিত ছিল। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চাদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের লাভজনক বিচারিক ও আধাবিচারিক পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য করা হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ হতে অবসর পরবর্তী আপিল বিভাগে ওকালতির জন্য যোগ্য করা হয়। উচ্চাদালত কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলেও উক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের প্রদেয় সুবিধা অক্ষুণ্ণ রেখে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণীত হয়।

’৭২-এর সংবিধানে উচ্চাদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স ছিল ৬২ বছর। সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অবসরের বয়স ৬২ বছর হতে ৬৫ বছরে উন্নীত করা হয় এবং অতঃপর সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি মাথায় রেখে বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৫ হতে ৬৭ বছরে উন্নীত করা হয়। পরে সপ্তম এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলেও উচ্চাদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রদত্ত সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখা হয়।
অবসরে যাওয়া একজন প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’ যার বাংলা অর্থ ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন নামক একটি বই লেখেন। তার এ বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ, আপিল বিভাগ এবং প্রধান বিচারপতি পদে কর্মরত থাকাকালীন বিভিন্ন ঘটনাবলির বর্ণনা দেন। তার বর্ণিত মতে, ঘটনাগুলো অবলোকনে দেখা যায় তিনি একদা ক্ষমতাসীন দলের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু তার কিছু বিচারিক সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের জন্য তাদের দৃষ্টিতে হানিকর বিবেচিত হলে তারা তার প্রতি রুষ্ট হন এবং একপর্যায়ে তাকে প্রথমত দেশ ত্যাগ এবং অতঃপর পদত্যাগে বাধ্য করেন।

যুদ্ধাপরাধ মামলার দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন বিষয়ে তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেন, সাবেক আইনমন্ত্রী ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন বিষয়ে সম্মত করাতে ব্যর্থ হলে তারা তার শরণাপন্ন হন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বলার পর তিনি ১৫-২০ মিনিট ধরে তার অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, শুধু নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে এর বেশি কিছু করতে তিনি প্রস্তুত নন। এর স্বপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি ছিল বহু বছর আগের ঘটনা অনেক সাক্ষী বেঁচে নেই। সুতরাং এ নিয়ে বেশি দূর আগানো যাবে না। এর প্রতি উত্তরে তিনি বলেন, কিভাবে সাক্ষী তৈরি করতে হয় এবং করা যায় সেটা তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়েছেন এবং এ প্রসঙ্গে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলা বিচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এ মামলাটিতে নিম্ন আদালতের বিচারে অনেক ত্রুটি ছিল। আপিলে চূড়ান্ত শুনানিতে তিনি সেগুলো অতিক্রম করে দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার চেয়ে এ বিচার সহজ। কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন কে লিখল, কারা লিখল কোনো বিষয় নয়। পুরনো পত্রপত্রিকা ও বই-পুস্তক তৈরি করে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা যাবে। তিনি লেখেন, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত তার কথায় অনুপ্রাণিত হন এবং দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিচারকে এগিয়ে নিতে সম্মত হন।

যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিল শুনানিতে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে উক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতির মুখ্য ভূমিকা পালনের বিষয়ে এ দেশের জনমানুষ সম্যক অবহিত। স্বভাবতই প্রশ্নের উদয় হয় বিচারকের আসনে বসে উচ্চাদালতের একজন বিচারক সরকার প্রধান তথা নির্বাহী প্রধানের সাথে বিচারিক বিষয় সংশ্লেষে যেভাবে কথা বলেছেন এভাবে কি তিনি কথা বলতে পারেন? পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ হলে এর উত্তর না; কিন্তু উক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতির প্রধানমন্ত্রীর ওপর প্রভাবের কারণে হ্যাঁ উত্তর আদায় করতে যে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। এতে দেখা যায় তিনি একদিকে ট্রাইব্যুনাল গঠনে ভূমিকা রেখে বিচার আয়োজনের ব্যবস্থা করেছেন আবার বিচারকের আসনে বসে চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নিজ উক্তি থেকে যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারের আয়োজন ও বিচারের যে খণ্ডচিত্রের প্রকাশ ঘটেছে তাতে ন্যায়বিচারের নামে কী হয়েছে তা এ দেশের জনমানুষ অনুধাবনে সক্ষম।

সাবেক এ প্রধান বিচারপতির কথিত মতে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায় ঘোষণার পূর্বে একদিন সকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব তার মোবাইলে ফোন করে জানান সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে তার সাথে আলোচনা করতে চান। তিনি বঙ্গভবনে পৌঁছলে তাকে অতিথি কক্ষে না বসিয়ে তার জন্য অবমাননাকর সামরিক সচিবের কক্ষে বসতে দেয়া হয় এবং উক্ত কক্ষে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় কাটানোর পর রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশের ডাক আসে। রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করে তিনি হতবাক ও বিস্মিত হন। তিনি সেখানে দেখতে পান রাষ্ট্রপতি ছাড়াও কক্ষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল অবস্থান করছেন। সেদিন রাষ্ট্রপতির কক্ষে তিনি ৩ ঘণ্টার বেশি অবস্থান করেন এবং এ সময় ষোড়শ সংশোধনীর মামলাটির আপিলের চূড়ান্ত রায় যেন সরকারের পক্ষে হয় সে বিষয়ে তাকে চাপ দেয়া হয়।

সরকারপ্রধানের ইচ্ছানুসারে রায় না দেয়ার কারণে ডিজিএফআইর মাধ্যমে সাবেক প্রধান বিচারপতিকে যে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয় তা তিনি তার বইয়ে স্ববিস্তারে উল্লেখ করেছেন। তার বইয়ে উল্লেখ রয়েছে ফজলুল করিমকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে এবং আব্দুল ওয়াহাব মিঞাকে আপিল বিভাগে নিয়োগে তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন এবং তার ভূমিকার কারণেই এ দু’টি নিয়োগ সফল হয়েছিল। সাবেক এ প্রধান বিচারপতির স্বগোক্তি প্রমাণ করে তিনি কোনো একসময় সরকারপ্রধানসহ সরকারের উচ্চমহলের সবার একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং এদের সবার ওপর তার বিপুল প্রভাব ছিল। তার প্রতি আস্থা এবং তার প্রভাবে চিড় ধরার পেছনে তিনি মূলত অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি বিষয়ে সরকারের ইচ্ছার বিপরীতে তার দৃঢ় অবস্থান এবং ষোড়শ সংশোধনী মামলার আপিল রায়ে সরকারের আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান- এ দু’টিকে প্রধান উপপাদ্য হিসেবে দেখিয়েছেন। সরকারের একজন একান্ত আস্থাভাজন ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি অকস্মাৎ কী কারণে সরকারের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিলেন এ বিষয়টি রহস্যাবৃত্ত।

জেলা জজ পর্যায়ের বিশেষ আদালতে কর্মরত অপর একজন বিচারক যিনি সম্প্রতি একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত ভাইস-চেয়ারম্যানকে সরকারের ইচ্ছার বিপরীতে অর্থ পাচার মামলায় খালাস দেয়ায় নিপীড়নের ভয়ে তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন আইন সচিব, হাইকোর্ট বিভাগের জনৈক কর্মরত বিচারক এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাতিলের রায় প্রদানে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ ব্যাপক বিতর্কিত অপর সাবেক প্রধান বিচারপতি তাকে ডেকে নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত ভাইস-চেয়ারম্যানকে মামলায় কারা ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার জন্য প্রচণ্ডভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি দাবি করেন উক্ত মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত ভাইস-চেয়ারম্যানকে কারা ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার মতো প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য না থাকায় তিনি বিচারক হিসেবে ন্যায়ের সপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে তার বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। কিন্তু সে বিচারিক সিদ্ধান্তই আজ তার জীবনে চরম দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে এসেছে।
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং অধস্তন আদালতের একজন শীর্ষ পদের বিচারকের আত্মকথনে দেশের জনমানুষের ভাবনায় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মামলায় দলীয় সরকারের আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থানে তারা নিজেরাই যে বিচার বঞ্চিত হয়ে দেশান্তরী এটি স্থান পেয়েছেন। এমন ভাবনা শুধু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেই অন্তরায় নয় বরং আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের পথে বড় ধরনের বাধা।