বিশ্ব আজ মহাসঙ্কটে। চার দিকে যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের নানা দৃশ্য। মানবতা যেন আজ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, ভূলুণ্ঠিত। গত দু’বছর গেল বিশ্বের আরেক রকম সঙ্কট কোভিড-১৯-এ। এই মরণঘাতী কোভিডে মারা গেছে বিশ্বের লক্ষাধিক মানুষ। এরপর শুরু হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুধু তাদের দু’দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বিশ্ব মানবতাসহ বিশ্ব মানবসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোও। বাকি দেশগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন জানাচ্ছে নানাভাবে। এর মধ্যে খবরের কাগজে এসেছে এ পর্যন্ত নারী-শিশুসহ নিহত আট শতাধিক। আমরা খুবই ব্যথিত, কিন্তু করার কিছুই নেই। জাতিসঙ্ঘ গঠন করা হয়েছিল এসব দেখভাল করার জন্য, কিন্তু তারাও আজ নীরব, দেখেও যেন না দেখার মতো রয়েছে। আমাদের প্রশ্ন তাহলে এ জাতিসঙ্ঘ কেন?
বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব সহিংসতা, সঙ্ঘাত, যুদ্ধ একমাত্র নিজের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য এবং সাম্রাজ্য বিস্তারসহ ক্ষমতা ও সিংহাসন ধরে রাখার জন্য। বিশ্বমানবতা কিংবা জনকল্যাণ এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। বিশ্বের কথা কী বলব, বাংলাদেশের চিত্রও একই অবস্থা। এখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও সহিংসতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল এগুলো করার জন্য নয়। আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায় একাকার হয়ে যুদ্ধ করেছিলাম এগুলো করা বা দেখার জন্য নয়। আমরা চেয়েছিলাম একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিরাপদে বসবাস করব; বরং আমাদের প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করব। কিন্তু কই। আমাদের মধ্য রয়ে গেছে এখনো অনেক বৈষম্য। অনেক দূরত্ব। স্বাধীন দেশ, নানাভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল এবং ঐক্য সংহতি ও দেশ গঠনে আরো সুদৃঢ় হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানেও দেখি নানা অনৈক্য, নানা ঘাত-প্রতিঘাত। আমার প্রশ্ন কিন্তু কেন? এ দেশ তো কারো একার নয়। এ দেশ সবার। তা যদি হয় তাহলে সব জনগণের সমান অধিকার ও সমান সুযোগ-সুবিধা থাকবে না কেন, নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের কথা বাদই দিলাম কিন্তু দু’টি প্রধান দল এদের সমান সুযোগ-সুবিধা থাকবে না কেন? এ দিকে, সামনে ঘনিয়ে এসেছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মহাক্রান্তিকাল। এর মধ্যে অনেক সঙ্ঘাত ও নিপীড়ন, বিরোধী দলের ওপর। বাইরের দেশ ও রাষ্ট্রগুলোও বলছে, সঙ্ঘাত ও সহিংসতা কমানোর জন্য এবং অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেয়ার জন্য। কিন্তু সরকার কোনো মতেই নমনীয় হতে চাচ্ছে না।
দেশের জনগণ চাচ্ছে এবার একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। সবাই ভোটে অংশগ্রহণ করুক। সম্প্রতি ঢাকায় আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাসিন্ট্যান্ট সেক্রেটারি আফরিন আখতারও একই কথা বলেছেন। রাজনীতিতে কোনো ঔদ্ধ্যত্ব আচরণ কারো কাম্য নয়। আমরা চাই এর সুন্দর সমাধান। বেশ কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বিএনপির দাবি মেনেও নির্বাচন করা সম্ভব।’ সাবেক ভিসি হিসেবে তার মন্তব্যটি অমূলক ছিল না, কারণ তিনি বর্তমান সরকারের একজন বিশ্বস্ত সমর্থক এবং দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীও বটে। তিনি দেশের এ মহাসঙ্কট ও ক্রান্তিকালে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেই মন্তব্যটি করেছিলেন।
অনেকেই বলেছেন, সমঝোতা ও সংলাপের মাধ্যমে এর একটি পথ বের করা যায়। আসলে ত্যাগ এবং উদারতায় বিশ্বের সব সঙ্কট সমাধান করা যায়। কিন্তু আমরা তো প্রতি মুহূর্তে এর বিপরীতে। কিভাবে সম্ভব ঘরে-বাইরের সঙ্কট সমাধান?
এ দিকে নির্বাচন কমিশনার মো: আনিছুর রহমানও রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার আগেই সমঝোতার আশা করছি আমি।
এ দিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মোটেই ভালো নেই বললে চলে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের দুরবস্থা, নানা দুর্নীতি, অপরাধ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সঙ্কট- সাধারণ জনগণের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। রোহিঙ্গা সঙ্কটের তীব্রতাও দিন দিন বাড়ছে। দেশের এ দুর্বলতায় ও অসহায়ত্বে বিদেশী শক্তিও আমাদের মাথার ওপর ভর করে বসে আছে। মনে হচ্ছে, এ দেশ তাদের। আমরা তাদের অধীনে। স্বাধীন দেশের কী ভাগ্যের পরিহাস। আমাদের মানচিত্র এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। একমাত্র আমাদের দুর্বলতা ও প্রভুভক্তির কারণেই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এ সুযোগগুলো নিচ্ছে।
আমরা এই প্রভুভক্তি থেকে বের হতে চাই। আমাদের সঙ্কট আমরাই সমাধান করব। এ জন্যই প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা। চলুন, বৌদ্ধ মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে আমরা বলি- ‘বৈরিতা দিয়ে বৈরিতাকে প্রশমিত করা যায় না, অহিংসা দিয়েই বৈরিতাকে প্রশমিত করা যায়। ইহাই জগতের নীতি।’
বিশ্বে মানবতার জয় হোক। যুদ্ধ সহিংসতা বন্ধ হোক এবং বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক। বিশ্বমানবতার মূল বাণী- ত্যাগই শান্তি, চার দিকে ঘোষিত হোক।
