রাষ্ট্র ও সরকার দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সালতামামি ও সুরতহাল পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনায় এ বিষয়টি সর্বাগ্রে উঠে আসে যে যখনই এবং যেখানে রাষ্ট্র ও সরকার যথা সচেতনতায়, যত্নে ও যৌক্তিকতায় নিজ নিজ অবস্থানে অধিষ্ঠান সম্ভব হয়েছে তখন সেখানে সে দেশে সার্বিক উন্নয়ন (মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা ও সামাজিক সংহতি, সার্বভৌমত্ব এমন কি আঞ্চলিক অখণ্ডতা) টেকসই হতে পেরেছে। প্রকারান্তরে যখনই যেখানে সরকার সীমালঙ্ঘন করে রাষ্ট্র্রকে টপকাতে, অধিগ্রহণ, বশ্যতা স্বীকার করাতে সক্ষম বা বাধ্য করেছে তখনই সে সব দেশে, সমাজে, অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে।

সংবিধানের অধীনে বিশেষ ব্যবস্থায় চারটি বিশেষ উপকরণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই উপাদানগুলো হচ্ছে- নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, নির্দিষ্ট জনসংখ্যা ও জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার। এর মধ্যে সরকার হচ্ছে সবচেয়ে স্পর্র্শকাতর নিয়ামক এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপকরণ। বাকি তিনটি রাষ্ট্র্রের এখতিয়ার ও স্থায়ী উপাদান। সরকার হচ্ছে একটি দেশের জনগণ ও সম্পদের পাহারাদার, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যবস্থাপক মাত্র। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র্র পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়া সরকারের নিজস্ব কোনো সম্পদ বা শক্তি অর্জন বা সৃষ্টি বা দায়িত্ব থাকে না। সাধারণভাবে যাকে সবাই সরকারি সম্পদ বলে মনে করে তা আসলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, যার জিম্মাদার হচ্ছে সরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় সরকারের ওপর। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় (প্রিএম্বল) প্রথমেই উল্লিখিত ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’, সেই জনগণ যদি কোনো সরকারকে উপযুক্ত মনে না করে তাহলে সেই সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। তবে রাষ্ট্র থাকে অপরিবর্তনীয়। রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন নেই। কথায় আছে হাকিম নড়বে কিন্তু হুকুম নড়বে না।

সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণাধীনে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ামক শিরোমনি এমন কিছু মহাপ্রতিষ্ঠান থাকে যা দায়মুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত যেমন- প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা সুশীল সেবক (পাবলিক সার্ভেন্ট) নিয়োগ সুপারিশের জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা পাবলিক সার্ভিস কমিশন, রাষ্ট্রের সমুদয় হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিধায়ক কম্পোট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, নির্বাচন অনুষ্ঠান আধিকারিক নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের প্রধান বিচারপতি ইত্যাদি এগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন। কর্মচারী নিয়োগে, রাষ্ট্র্রের সম্পদের ব্যবহারের হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষণে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার নির্বাচনে এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রয়োগে বিচার ব্যবস্থাপনায় প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের একমাত্র এখতিয়ারে কোনোভাবেই সরকার হস্তক্ষেপ, প্রভাব খাটানো, অনুরাগ বা রাগের বশবর্তী হয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ, বিভাজন সৃষ্টি করতে পারবে না। এ সব প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো সরকার কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে না; বরং সরকারের ওপর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব প্রাধান্য থাকাটাই সাংবিধানিক বিধান। যদি সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে তারা তাদের দায়িত্ব পালন প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং এভাবে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে তাতে রাষ্ট্রের চাইতে সরকারেরই ক্ষতি বেশি। এ চার প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরো কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলোর ওপর সরকারের প্রভাব বিস্তারের কোনো অবকাশ নেই। যেমন- দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জনসেবাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী। সমাজে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় এসব সংস্থাকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আবশ্যিকতা অনস্বীকার্য। এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের পক্ষে সঠিক ভূমিকা পালনের পরিবর্তে তারা তাদের, এসব সংস্থা যদি সরকারের আজ্ঞাবাহক হয়ে পড়ে তখন তাদের পক্ষে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না, ফলে সমাজে নীতি-নৈতিকতা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয় না এবং এর জন্য আলটিমেটলি সরকারই আত্মঘাতী ইমেজ সঙ্কটে পড়ে।

যেকোনো যৌথ সংসারে কিংবা কায়কারবারে সবার আয় উন্নতির সমান সুযোগ নিশিচত না হলে, ন্যায়নীতিনির্ভর কর্তব্যপালনে দৃঢ়চিত্ত প্রত্যয় না থাকলে, সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সমান সুযোগ না থাকলে, অনেককেই পেছনে ফেলা হবে। যেকোনো উন্নয়ন উদ্দেশ্য অর্জন তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোয় ঐকান্তিক প্রয়াসে সবার সমর্পিত চিত্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা যেমন জরুরি, জাতীয় উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টাতেও সমন্বিত উদ্যোগের আবশ্যকতাও একইভাবে অনস্বীকার্য। জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে থাকা চাই প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগ্রহণের অবদান। অপচয়-অপব্যয় রোধ, লাগসই প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বনের দ্বারা সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সবার মধ্যে অভ্যাস, আগ্রহ ও একাগ্রতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার। নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও উপলব্ধির জাগৃতিতে অনিবার্য হয়ে উঠে যে নিষ্ঠা ও আকাক্সক্ষা, তা অর্জনের জন্য সাধনার প্রয়োজন, প্রয়োজন ত্যাগ স্বীকারের। দায়দায়িত্ব পালন ছাড়া স্বাধীনতার সুফল ভোগের দাবিদার হওয়া বাতুলতা মাত্র। ‘ফেল কড়ি মাখ তেল’ কথাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য এ জন্য যে, উৎপাদনে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করেই ফসলের ন্যায্য অধিকারপ্রত্যাশী হওয়া স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কর্ম ও ধর্ম নয়।

এটি মানতেই হবে, শোষণ বঞ্চনা আর বণ্টন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রামের প্রকৃত অর্জন বা বিজয় বিবেচনার জন্য বিগত পাঁচ দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’-এর অধিকার রক্ষার প্রত্যয় ও প্রতীতি জাগ্রত রাখার ও থাকার কোনো বিকল্প নেই। স্থান কাল পাত্রের পর্যায় ও অবস্থানভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার প্রেরণা হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে গোটা দেশবাসীকে ভাববন্ধনে আবদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। সমাজে ও সময়ে কারো কারো অধিক ধনী হওয়া আর অনেকের পিছিয়ে পড়ায় বৈষম্য সৃষ্টির ও বৃদ্ধির পরিবেশে সবাইকে অন্তর্ভুক্তকরণের পরিবর্তে বিচ্যুতকরণেরই নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।

সবার ওপর মানুষ সত্য তার উপরে নাই। মানুষই বড় কথা। করোনায় এই মানুষ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ এই মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্য কর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতিসাধিত হয়। মানবসম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা, সমাজ মুখথুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়তা হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ কিংবা মারণাস্ত্রে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমত সহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকে। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি ও ভালোমন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে সম্পদ প্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই- চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলআনা- টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেয়া আছে কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ বিগত ৫০ বছরে পরিলক্ষিত হয়েছে তার মধ্যে এই সম্পদ অবৈধ অর্জন, অধিকার বর্জন ও আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এসব শব্দ প্রায়শ ব্যবহৃত হয় গণতন্ত্রের নান্দিপাঠে, নির্বাচনী ইশতেহারে, কোনো কোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে বেশি বেশি উচ্চারিত হয় আঁতেল আমলা আর ব্যবহারজীবীদের মুখে। সুশাসনের অভাবহেতু উদ্বেগ-উচ্চারণেই গড়ে ওঠে হরেক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সংস্থা এবং এমনকি একে কেন্দ্র করে বড় বড় প্রকল্পে ব্যবহারজীবীরা আয়-রোজগারও করছেন। কিন্তু আসলে সর্বত্র সুশাসন কি হালে পানি পেয়েছে? এমনকি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পরিস্থিতি উন্নতির কোন পর্যায়ে তা নিয়েও নিয়ত চলে মহাজন বাক্য ছোড়াছুড়ি। সেটা খতিয়ে দেখাও সুশাসনের স্বার্থেই জরুরি। খোদ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরই স্বমূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন এ জন্য যে, সুশাসন সামষ্টিক উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাই পরিচালনার (good governace) অন্যতম অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা চাইলে চিন্তাভাবনায়, নীতি পরিকল্পনায় ও কর্মে সবাইকে স্বচ্ছ এবং সর্বত্র জবাবদিহিতার পরিবেশ নিশ্চিত হতে হবে। গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল সব গণপ্রজাতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রেরণা। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের জন্য জনগণের দ্বারাই জনগণের সরকার নির্বাচিত হবে এমনটি নিয়ম। রাষ্ট্রে যেকোনো ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ সাধনার সফলতার ওপর নির্ভর করবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শক্তিশালী অবস্থান ও বিকাশ।

আরেকটি বিষয়- রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সৌভাগ্য তথা স্বাধীনতার সুফল সবার মধ্যে সুষম বণ্টন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত সুশাসন এবং জবাবদিহিতার সুযোগ ব্যতীত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে উঠে না। গণতান্ত্রিক মূলবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য অজুত ত্যাগ স্বীকারের প্রকৃত প্রতিফল অর্জন সম্ভব হয় না সুশাসন সুনিশ্চিত না হলে। সম্পদ অর্জনের নৈতিক ভিত্তি বা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে বণ্টন ব্যবস্থাপনাও সুষ্ঠু হয় না। বাংলাদেশে ধনীর সংখ্যা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান এ আশঙ্কা ও উদ্বেগের হেতুতে পরিণত হয়েছে। সমাজে বণ্টনে বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে সুশাসন প্রেরণা ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্যও জরুরি। যেমন- আজকাল এক দেশ বা অর্থনীতির প্রচুর অর্থ বিদেশে কিংবা অন্য অর্থনীতিতে দেদার পাচার হয়ে থাকে। বিনা বিনিয়োগে বা বিনাপরিশ্রমে প্রকৃত পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যতিরেকে অর্থ অর্জিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সেই অর্থ পাচার হবেই। দুর্নীতিজাত কালো টাকাকে সাদা করার কার্যক্রম প্রতিবিধানমূলক না হয়ে যদি প্রযত্নে ও প্রশ্রয়মূলক হয় তাহলে হিতেবিপরীত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। অর্থ বৈধ পন্থায় উপার্জিত না হলে সেই অর্থের মালিকানার প্রতি দায়-দায়িত্ববোধও গড়ে উঠে না। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালীকরণেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক পরিবেশের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, সমাজে একপক্ষ বা কতিপয় কেউ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে থাকলে, আর অধিকাংশ অন্যজন কারো কাছে কোনো জবাবদিহির মধ্যে না থাকলে অর্থাৎ একই যাত্রায় ভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হলে পারস্পরিক অভিযোগের নাট্যশালায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না, জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে না। সমতা বিধানের জন্য, সবার প্রতি সমান আচরণের (যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী) জন্যও স্বচ্ছতা তথা আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন।

সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিতাবিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের (cause) অন্যতম প্রতিফল (effect) হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বের এই অধঃগতির প্রেক্ষাপটই প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে সমাজে সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেমন- যেকোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ। যেমন- স্বেচ্ছাচারিতায়, বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষায়তনে শিক্ষক, সুশীল সেবক, হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মিবাহিনী নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার সবই প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায়। অর্থ বিনিময় ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে যোগ্যতা এবং মেধার ভিত্তিতে ভালো ও যোগ্য সুশীল সেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক আইন রক্ষক নিয়োজিত হতে পারে না। সুশীল সেবক, চিকিৎসক অমেধাবী ও অযোগ্য শিক্ষক এবং আইন রক্ষকের কাছ থেকে গুণগতমানসম্পন্ন প্রশাসনিক সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা তালিম বা অনুসরণীয় আদর্শ লাভ সম্ভব হয় না। অবৈধ লেনদেনে নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য সেবক, চিকিৎসক কিংবা শিক্ষকের কাছে কার্যকর সেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে সমস্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগবাণিজ্য চলে সেখানে মেধাবী ও উপযুক্ত প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। তাদের বিপরীতে নিয়োগ পায় অদক্ষ-অযোগ্য লোক। এটি একটি দিক। আরেকটি দিক- কেউ বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে এবং অবৈধভাবে অর্থ দিয়ে নিয়োগ পেলে সে প্রথমে চাইবে গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে সেবা চিকিৎসা ও শিক্ষার পরিবেশকে বিপন্ন করে ওই অর্থ তুলতে। সে ক্ষেত্রে সে প্রয়োজন হলে যেকোনোভাবে (কর্তব্য দায়িত্বহীন হয়ে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করা থেকে শুরু করে নানা ফাঁকি ও পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করে) ইচ্ছা করে নীতি-নৈতিকতা ভুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উঠিয়ে নেবে। তখন সে তার চাকরি বা দায়িত্বশীলতার দিকে নজর দেবে না। কোনো পদপ্রার্থী কর্তৃক কোনো সংস্থা ও সংগঠনে স্রেফ প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সময় কিংবা কোনো সংস্থায় নিয়োগ পাওয়ার সময় যে অর্থ ব্যয় করে তা নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক মন্দ বিনিয়োগ। এতে সমাজ দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমত, একজন ভালো যোগ্য প্রার্থীর স্থলে একজন দুর্নীতিবাজ অদক্ষের অবস্থান সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দ্বিতীয়ত, সে চিকিৎসা কিংবা লেখাপড়ার পরিবেশ বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে করে এমনভাবে কুলষিত করতে পারে, তাতে যুগ যুগ ধরে দুষ্ট ক্ষতেরই সৃষ্টি হয়।

স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হলো- যার যা কাজ তাকে সেভাবে করতে দেয়া বা ক্ষমতা দেয়া। যেমন- স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকার পরিচালনা আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার ভার স্থানীয় সরকারের হতে দেয়া হলে সে সরকার হবে প্রকৃতপ্রস্তাবে তার নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে জবাবদিহিতামূলক স্থানীয় পর্যায়ের সরকার। স্থানীয় সরকারই সেখানকার ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করবে। স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য সেখান থেকে তারা যে কর নেবে তা থেকেই সেখানে সেবামূলক কাজ নিশ্চিত করবে, যে প্রতিশ্র“তি তারা দেবে তা তারাই পূরণ করবে। তাহলেই সেটি অর্থবহ ও কার্যকর হবে। স্থানীয় সরকারকে পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ থাকতে হবে। তবেই স্থানীয় সরকার শব্দটির যথার্থতা ফুটে উঠবে। জাপানে যেমন দেখা যায় একেকটি প্রিফেকচার বা প্রদেশ বা রাজ্য নিজ নিজ আয়-ব্যয় উন্নয়নের জন্য সার্বিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সেখানে এক স্থানীয় সরকার অপর স্থানীয় সরকারের চাইতে সরকার পরিচালনায় কতটা পারদর্শী তার প্রতিযোগিতা চলে।

ব্যষ্টি ও সামষ্টির জীবনে ন্যায়নীতিনির্ভরতার প্রত্যয়, শুদ্ধাচার বা সদাচার চর্চার তাৎপর্যময় আবশ্যকতার কথা তাবৎ ঐশীগ্রন্থে, ধর্ম প্রবর্তক-প্রচারকের বাণীতে, সক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯) প্লেটো, (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩৭-৩৪৭), এরিস্টোটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) এমনকি কৌটিল্যের (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭৫-২৮৩) অর্থশাস্ত্রেও ছিল । সেই সদাচার শুদ্ধাচারের চর্চা অবলম্বন অনুসরণ যুগে যুগে নানান প্রেক্ষাপটে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটেছে। সদাচার সুশাসন লোপ পেলে ব্যক্তি সমাজ সংসার নিপতিত হয়েছে নানান অরাজক পরিস্থিতিতে। মানবসমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সূচনা- বিকাশ-বিবর্তনও ঘটেছে শুদ্ধাচারের প্রতি আকিঞ্চন আকাক্সক্ষা ও দায়বদ্ধতা থেকে। শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে, সহযোগিতা-সহমর্মিতার স্বার্থে, ন্যায়নীতিনির্ভরতার স্বার্থে ও তাগিদে সুশাসনকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। ন্যায়নীতিনির্ভরতার মূল্যবোধ যে সমাজে যত বেশি বিকশিত, পরিপালিত, অনুসৃত হয়েছে সে সমাজ তত সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পেরেছে। বিপরীত অবস্থায় বিপন্ন বিপর্যস্ত হয়েছে বহু সমাজ ও সম্প্রদায়।
এই মুহূর্তে সর্ববিধ বিবেচনায় নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিরোধ ও ক্ষেত্রবিশেষে উভয় পক্ষের বেপরোয়া আচরণ, বিদেশে বিপুল অর্থপাচারের মতো অর্থনীতির সমূহ সর্বনাশ সাধন, সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রতিকার না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো দিন দিনই সাধারণ মানুষকে যাতে আরো উদ্বিগ্ন করে না তোলে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকলাপ জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনার প্রতিকার পেতে একজন সাংবিধানিক ন্যায়পালের অবশ্যকতা উঠে আসছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করছেন, ন্যায়পাল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনবে জবাবদিহিতার মধ্যে, একজন ন্যায়পাল থাকলে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে না অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিরও। চানক্য পণ্ডিতের মতো অনেকে এটিও বলছেন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রশাসনকে করতে পারে শক্তিশালী। কেননা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতি আস্থা হারাতে পারে সাধারণ মানুষ- রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এই আস্থাহীনতাই জন্ম দেয় সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক সহিংসতার।

মানুষ বিশ্বাসের বিশে্ব বাস করে। পরস্পরের প্রতি আস্থায় বিশ্বাসের ভিত রচিত হয়। আস্থার সঙ্কট তৈরি হলে পরাধীনতার প্রতিভু হয়ে দাঁড়ায় সহমত সহাবস্থানের। ঔপনিবেশিক শাসন প্রশাসন যন্ত্রের যাবতীয় অন্যায় অনিয়ম ও শোষণ বঞ্চনা রহিত সুশাসন সদাচারী সমাজ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা থেকেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ নিযুতের রক্তত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। সেই নিরিখে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ন্যায়পাল নিঃসন্দেহে অনিবার্য বিষয়। বাংলাদেশের সংবিধানের অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি হলো- ন্যায়পালের বিধান। প্রশাসনের অনিয়ম অব্যবস্থা দূর করতে সংবিধানে ন্যায়পালের বিষয়টি সংস্থাপিত হয়। ন্যায়পালের সহযোগিতায় সরকার শুদ্ধাচারের অনুশীলন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে উঠতে অব্যবস্থা, অনিয়ম এবং দুর্নীতি দূর করার জন্য জাতীয়পর্যায়ে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। এটি তখনই সৃষ্টি হতে পারে যখন এই প্রয়াসে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ শামিল হবে।
পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে ন্যায়পাল নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের নিগড় বা গলাধঃকরণ থেকে রাষ্ট্রকে তথা গণতন্ত্রকে শুধু রক্ষাই নয়, শক্তিশালী করা হয়েছে। ন্যায়পাল শব্দটি, পদ ও প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত; অর্থাৎ প্রশাসনিক দুর্নীতি তদন্তের জন্য সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (যেমন- বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়) কর্তৃক প্রবর্তিত যেকোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়। ন্যায়পালের কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে বেসামরিক প্রশাসন ও আদালতের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান। তাকে বেআইনি কার্যকলাপ, কর্তব্যে অবহেলা ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে হয়। বিশেষভাবে প্রতারণামূলক অপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কার্যকলাপের প্রতি ন্যায়পালকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। যেকোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সংবিধানের বিধি বা দেশের আইন লঙ্ঘন কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন ভঙ্গ করলে ন্যায়পাল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণভাবে ন্যায়পাল পদের মূল উদ্দেশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের সমতা ও সততা বিধান এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রশাসনের যেকোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন। সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, সেরূপ ক্ষমতা বা দায়িত্ব পালন করিবেন।’ এটি থেকে বোঝা যায়, ন্যায়পালের মূল কাজ হলো- নাগরিক অধিকারকে প্রশাসনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে রক্ষা করা। এ ছাড়া সবপর্যায়ের অধিকারিক কর্মকর্তারা দেশের আইন ও সংবিধান সঠিকভাবে মেনে চলছেন কি না এবং তাদের কাজে নাগরিক অধিকার বিনষ্ট হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে লক্ষ রাখা।
গত দশকে ভারতে আন্না হাজারের লোকপালের জন্য অনশন আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বময় আলোচিত প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে। সরকার সংসদে একটি লোকপাল বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়। বিলটি তৈরি হয়েছিল এবং সংসদে অনুমোদিত হয়েছিল ব্রিটেনের Parliamentary Commissioner for the Administration-এর আদলে। এ বিলের মাধ্যমে জনলোকপাল তার ইচ্ছেমতো কারো দুর্নীতি নিয়ে শুধু অনুসন্ধান নয় বিচারিক ক্ষমতাও পাবে। তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার থাকবে। ন্যূনতম ১০ বছর ও ঊর্র্ধ্ব যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারবে। বিনামূল্যে জনগণ জনলোকপালের কাছে অভিযোগ দিতে পারবে। বিচার হবে দ্রুত।

প্রসঙ্গত, যে বাংলাদেশে ২০০৫ সালে ‘কর ন্যায়পাল আইন’ গৃহীত হয়। কর ন্যায়পাল বিল পাসের প্রস্তাব করে সংসদে সে সময় বলা হয়েছিল কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ কর নিয়ে বিদ্যমান ভীতি থেকে রেহাই পাবে। মানুষ আরো কর দিতে উৎসাহিত হবে। কর আদায়ে হয়রানি রোধেও কর ন্যায়পাল ভূমিকা রাখতে পারবে বলে ওই সময় পাস হওয়া আইনটিতে বলা হয়। মাত্র ছয় বছর পর সংসদে কর ন্যায়পাল (রহিতকরণ) বিল, ২০১১ পাসের মধ্য দিয়ে কর ন্যায়পাল পদ ও তার যাবতীয় কাজ রহিত করা হয়। বর্তমানে সরকার কর আদায়ে মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেয়ায় এ ধরনের ব্যয়সাধ্য প্রতিষ্ঠানের আর কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষকে বোঝানো গেছে, প্রত্যেককেই কর দেয়া উচিত। গত দু’বছরে দুই লাখ করদাতা বেড়েছে। তাই কর ন্যায়পাল বাতিল করা দরকার। সে সময় এটিও বলা হয়েছিল- কর, ভ্যাট ও শুল্ক-সম্পর্কিত আইনের সাথে ন্যায়পাল আইনটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় মন্ত্রিসভা সেটি রহিতকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। সে মর্মে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশসহ বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। পাজি পুঁথিতে দেখা যায়, কর ন্যায়পাল কার্যালয়ে ২০০৬ সালে ১০টি ২০০৭ সালে ১১৯টি ২০০৮ সালে ২৪১টি ও ২০০৯ সালে ৩৫৫টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এসব অভিযোগ কর ভয়ভীতি দূরীকরণের বিষয়ভুক্ত ছিল না। এগুলো ছিল কর রাজস্ব আহরণে আইন এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে মতবিরোধ এবং সে সূত্রে উৎসারিত হয়রানির প্রতিকার প্রার্থনামূলক। প্রয়োজনের তাগিদেই কর ন্যায়পাল পদ তৈরি হয়েছিল আবার প্রয়োজন নেই মনে করেই বাল্য বয়সে এটি বিলুপ্ত করা হয়। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের হিসাব-নিকাশটি যুক্তিযুক্ততার নিরিখে দেখতে গেলে প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠবে যে, দেশে কর রাজস্ব প্রদান ও আইনের সংস্কৃতিকে বলবান ও বেগবান করতে সদাচারি ও সুশাসিত পরিবেশ প্রেক্ষাপট নির্মাণের বিকল্প নেই।