১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। সেদিন জাতি লাভ করে এক অমূল্য সম্পদ- স্বাধীনতা। যে আশা-প্রত্যাশা নিয়ে দেশের মানুষ দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে এসেছে, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মত্যাগ স্বীকার করেছে, সেটি হাতে পেয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বিচার করলে মনে হবে; জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জনে দেশের স্বাধীনতা ছিল সাফল্যের প্রথম ধাপ এবং আরেকটি নতুন সংগ্রামের সূচনা মাত্র। তবে স্বাধীনতা দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। মানুষ আশা করেছিল, স্বাধীনতা দেশে রাজনৈতিক স্বাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সাফল্য আনবে। বাস্তবে জনগণের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অনেক স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। অনেক আশা বারবার নিরাশায় পর্যবসিত হয়েছে। যারা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে জনগণকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তারাই আবার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন ও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার প্রথম থেকে জনগণ কখনো গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। অতএব আমাদের অকপটে স্বীকার করা উচিত যে একটি উন্নত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তির লক্ষ্য থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। দারিদ্র্যের হার ছিল ৫০ শতাংশ অর্থাৎ সাড়ে তিন কোটি ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটি। দারিদ্র্যের হার এখন ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ চার কোটির ওপর। অতএব দারিদ্র্যের হার কমলেও সংখ্যা বেড়েছে। এখনো জনসংখ্যার শতকরা ৫০ অর্থাৎ প্রায় চার কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। জাতি গঠনে ইচ্ছুক ও উৎপাদনমুখী কাজে অংশগ্রহণে সক্ষম লক্ষ কোটি মানুষ হয় বেকার, অর্ধ-বেকার কিংবা অনুৎপাদনশীলতা। অর্থাৎ জনসম্পদের পরিবর্তে এখন তারা সরকারের কাছে করুণার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে কম দামে কিন্তু খারাপ মানের চাল-লবণ ইত্যাদি কেনার জন্য টিসিবির ট্রাকের পিছনে আজকাল লম্বা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্ত করে যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করা হতো তাহলে তারা চাল-লবণ কেনার জন্য এত সময় নষ্ট না করে তারা নিজেরাই দেশের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করতে সক্ষমতা লাভ করত। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী বলে বেড়াচ্ছে যে আর কিছু দিন পর দেশে কাজের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।
শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার বারবার বিভিন্ন কর্মপন্থা ও কার্যক্রম ঘোষণা করেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আজো লাখো শিশুশ্রমিক তাদের জীবন ও জীবিকার তাগিদে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। দারিদ্র্যের কারণে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তাদের হয়নি। অথচ শিক্ষা জনগণের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। বাল্যবিবাহ বন্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও এখনো ৪৪ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। সমাজে শিশু নির্যাতনের হারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এসব কারণে সমাজে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ সবের সাথে পাল্লা দিয়ে নিরপরাধ মানুষের ওপর পুলিশের নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথেচ্ছ ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আজ আস্থা হারিয়েছে। মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলা, দিনের পর দিন আদালতে হাজিরা দেয়া, মিথ্যা চার্জশিট, বিচারের কাজে অযথা কালক্ষেপণ, মামলার পেছনে বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় এবং মিথ্যা মামলা করলে কারো শাস্তি না হওয়ার কারণে বিচারব্যবস্থা, বিচারক ও বিচারের রায়ের প্রতি জনগণের অনাস্থা ও সন্দেহ বেড়ে গেছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আজ এক ভয়াবহপর্যায়ে উপনীত। পরিবেশ দূষণ, সামাজিক অবক্ষয়, শহরে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় উদাসীনতা, দুর্নীতি, সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনা ইত্যাদি সব প্রতিনিয়ত প্রতিটি মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগতভাবে নিম্নাভিমুখী। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আহার, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার পূরণ হচ্ছে না। ভূমিহীনদের সংখ্যা, শহুরে বস্তি, বেকারত্ব, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, বেআইনি আটকাদেশ, মিথ্যা মামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক নির্যাতন, মানবীয় মর্যাদার অবমাননা ইত্যাদি লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে।
দুর্নীতি এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অর্থবল ও পেশিশক্তি মানবিক মূল্যবোধকে পরাস্ত করে সমাজের নৈতিক শক্তিকে খর্ব করে দিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাথাপিছু সামাজিক মূলধন ন্যূনতম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিজেদের সমস্যা মেটানোর আন্তরিক চেষ্টার বদলে দেশের সব অসঙ্গতির জন্য ঔপনিবেশিক, নব্য ঔপনিবেশিক এবং যারা এখন বিরোধী দলে তাদের সময়কালের শাসনকে দোষ দেয়া গতানুগতিক ও নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত করেছে।
স্বাধীনতার পর মানুষ আশা করেছিল যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সততা ও জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার এক নতুন যুগের সূচনা হবে। কিন্তু তা হয়নি। পক্ষান্তরে, সময় যতই অতিক্রান্ত হয়েছে, ততোই বাংলাদেশ আজ এক চরম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের দুর্নীতির খবর অজানা নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের যে স্থান নির্ধারণ করেছে তা নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা যে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, সে ব্যাপারে সবাই একমত।
এসবের মানে এই নয় যে দেশে কোনো উন্নয়ন হয়নি। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বেড়েছে, আমদানি ও রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এক বছর থেকে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী বা ঋণাত্মক। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বেড়েছে, তবে গত তিন বছর থেকে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমে গেছে। রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, প্রমত্তা যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণসহ দেশে বহু সেতু ও শত শত কালভার্ট নির্মিত হয়েছে, নতুন বিমানবন্দর তৈরি হয়েছে, নতুন নতুন রেললাইন স্থাপিত হচ্ছে, গ্রামীণ এলাকায় টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবার পরিধি বেড়েছে, বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ইতিমধ্যে বহু ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল স্থাপিত হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপণন, বিতরণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হওয়াতে দেশে খাদ্যাভাব কিংবা দুর্ভিক্ষ আর নেই। চাষাবাদ ও সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপ্তি ঘটেছে, বহু রোগ প্রায় নির্মূল হয়েছে, নবজাতক ও শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, মাথাপিছু খাদ্যেও ক্যালরির পরিমাণ বেড়েছে। জিডিপির পরিমাণ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। পৌরসভার সংখ্যা বেড়েছে, সর্বক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে- এ রকম আরো অনেক সাফল্যের তালিকা দেয়া সম্ভব। এসব সাফল্য নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয় ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
অনেক কিছুই আমরা অর্জন করেছি। এতদসত্ত্বেও এতসব উন্নয়ন মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। রাজনীতিবিদদের আন্তরিকতা ও ঐকমত্য থাকলে গত পঞ্চাশ বছরে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে আরো অনেক কিছু আমরা অর্জন করতে পারতাম। কেবল মিথ্যা কথা নয়, বরং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে মানুষ এখন ত্যক্ত-বিরক্ত। কঠিন বাস্তবতা হলো, যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার বেশির ভাগই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থা অনেক জায়গায় অপ্রতুল, এগুলো পরিচালনায় যে শক্তি (ঊহবৎমু) প্রয়োজন সেটার জোগান দিতে আমাদের সামর্থ্য নেই। তাতে করে ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শিক্ষাব্যবস্থার মান কমে গেছে, নকলের হার বেড়েছে এবং দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাস্তানদের আধিপত্য সীমা অতিক্রম করেছে। আমরা এখনো বিদেশী প্রযুক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী কারিগরনির্ভর। ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি। দক্ষতার অভাবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রায় বিলম্বিত হচ্ছে। এসবের সাথে দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। দুর্নীতি, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ পরিচালনার ফলে উৎপাদিত পণ্যের মান বাড়ছে না। সর্বত্র সেবার মানের অবনতি ঘটছে। অথচ সব কিছুর দাম বাড়ছে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও স্টিমারের সংখ্যা অপ্রতুল না হলেও ব্যবস্থাপনা নিম্নমানের। তাই দুর্ঘটনা ও জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অসংখ্য লোক দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছে। বস্তি ও দূষণে নগরজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সরকারি অফিসগুলোতে দুর্নীতি ও অদক্ষতা এখন সাধারণ চিত্র ও নিয়মে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি হয়ে উঠেছে নোংরা, মারমুখী, সঙ্ঘাতপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকের পরিবর্তে হয়ে গেছে শত্রুতাপূর্ণ।
এমনি ভয়াবহ অবস্থায় এ দেশের মানুষ নিজেদের সাথে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার তুলনা করছে। স্বাধীনতাপূর্ব কালে এসব দেশ কোনো অবস্থাতেই আমাদের চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না। পঞ্চাশ বছর আগে চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের অবস্থা বহু দিকে ভালো ছিল। বহু দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা আমাদের দেশ থেকে খারাপ ছিল। কিন্তু আজ তাদের মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রার মান আমাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। তাদের সাথে নিজেদের তুলনা করে বাংলাদেশের জনগণ এখন ধীরে ধীরে অনুধাবন করতে পারছে যে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের এই বিশ্বায়নের যুগে দারিদ্র্যবিমোচন, সম্পদ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক পুঁজির বিকাশ, টেকসই ও স্থায়ী উন্নয়নের এই মরণপণ লড়াইয়ে কোনোভাবেই কালো টাকা, সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির মাধ্যমে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। অতএব দেশের উন্নয়নে এখন প্রয়োজন হলো; সঠিক রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সমাজ, গঠনমূলক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, সামাজিক শৃঙ্খলা। একই সাথে সুদূরপ্রসারী, কল্যাণকর ও উদ্ভাবনামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেগুলোর জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন।
নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে যেসব সাধারণ সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানাবিধ সমস্যার কারণে অনেক পরিকল্পনাই তখনকার সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ ছাড়াও কয়েকটি প্রধান কারণ যা এ দেশের উন্নয়ন তৎপরতাকে ব্যাহত করেছে, তা হলো : (ক) জনসংখ্যা বৃদ্ধি, (খ) স্বাধীনতার মাত্র কিছুকাল পরই একদলীয় স্বৈরশাসন কায়েম, (গ) স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, (ঘ) শিক্ষার স্বল্প হার ও জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষার অভাব, (ঙ) বেসরকারি খাতবিরোধী আমলাশ্রেণী ও (চ) সঙ্ঘাতময় ও প্রায় মারদাঙ্গা রাজনীতি। দুঃখের বিষয় হলো স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পরপরই আওয়ামী লীগ দেশের পরিস্থিতিকে সঙ্ঘাতময় করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে বিষয়টিকে রাজনীতিকরণ করে সমাজকে বিভাজিত করে ফেলে। পুরনো ইতিহাস বাদ দিয়ে আমি সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিচ্ছি দেশের চলমান রাজনীতিকে। ধ্বংসাত্মক ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি এখন দেশের অসহায়, নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা এবং ঐক্যের ক্ষেত্রে এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি একটি দেশকে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রধান নিয়ামক শক্তি। রাজনীতিবিদরা হচ্ছেন দেশের প্রধান পরিচালক। তাদের জীবন, শিক্ষা, দর্শন, দক্ষতা, সাধুতা, জনগণের কল্যাণে আত্মত্যাগ, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা তাদেরকে সাধারণ জনগণ থেকে স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য দান করে।
অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক অধিকার পায়। জনগণের মধ্যে থেকেই তারা হয়ে ওঠেন জনগণের অভিভাবক। তাই সব দেশেই জনগণের কাছে রাজনীতিবিদদের একটি প্রাধান্য থাকে ও সম্মান পায়। দক্ষতা, নৈপুণ্য ও নেতৃত্বের গুণে জনগণের সম্মতি নিয়ে একমাত্র তারাই বৈধ উপায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারেন এবং জনকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেন। জনগণের দৃষ্টিতে রাজনীতিবিদরা দেশহিতৈষী, জনদরদি ও উৎসর্গীকৃত মহৎপ্রাণ ব্যক্তি। নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য জনগণ তাদের মুখ পানে চেয়ে থাকে। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণের সব ধরনের অধিকার হরণ করে জোরপূর্বক বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে আছে। যত দিন যাচ্ছে তত এই অবৈধ শাসকগোষ্ঠী জনগণের ওপর মিথ্যা মামলা-হামলার মাধ্যমে অত্যাচার-নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্য দিকে ঐতিহ্যগতভাবে অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদদের যেমন খাদ্য, বাসস্থান তথা জীবনযাপনের সংস্থান করতে হয় নিজস্ব কোনো পেশা বা নিজস্ব কোনো আয়ের সূত্র থেকে। ব্রিটিশ শাসন আমলে অর্থাৎ বিশ শতকের গোড়া থেকে এ অঞ্চলে স্থানীয়দের সরকারি বিভিন্ন ব্যবস্থায় অংশীদার করা শুরু হয়। জনগণকে স্থানীয় সরকার পরিচালনা থেকে শুরু করে ক্রমেই আইনসভা, এমনকি সরকার পরিচালনায় স্থান করে দেয়া হয়। তখন থেকেই সমাজের নেতৃত্বদানের জন্য রাজনীতি আবশ্যক হয়ে দেখা দেয়। তখন অবশ্য সুবিধাবাদের চেয়ে আদর্শবাদ, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত স্বার্থ রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে। অন্য কোনো পেশায় থেকে রাজনীতি করা কষ্টকর ছিল বলে রাজনীতিতে যুক্ত হতেন উকিল, মোক্তার, চিকিৎসক, অধ্যাপক, ভূস্বামী, এমনকি ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তারা মূলত নিজেদের পয়সায় রাজনীতি করতেন, দলীয় কাজকর্মের ব্যয়ভার বহন করতেন, সমর্থকদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। রাজনীতির মাধ্যমে আর্থিকভাবে ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্নটি তেমনভাবে বড় হয়ে দেখা দেয়নি।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ওই শ্রেণীর পাশাপাশি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনও যুক্ত হতে শুরু করে। এমনকি সঙ্গতিহীন ও আদর্শহীন ব্যক্তিরাও রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়। সরকারি ব্যবস্থায় আদর্শহীনতা ও রাজনীতিতে নিত্যনতুন উপাদান যুক্ত হওয়ায় একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। সরকারি ব্যবস্থা থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। তবে তখনো প্রত্যক্ষ সুবিধার চেয়ে পরোক্ষ সুবিধার দিকেই সবার নজর ছিল। একটি চক্ষুলজ্জার বা রাখঢাকের ব্যাপার ছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর এ প্রেক্ষাপট রাতারাতি বদলে যায়। এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারি ব্যবস্থা থেকে আর্থিকসহ যাবতীয় অন্যায় সুযোগ নিতে অধিকাংশ রাজনীতিবিদের কোনো কুণ্ঠা দেখা যায় না। কোনো রাখঢাকেরও প্রয়োজন বোধ করে না। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিবিদদের ব্যাপক অবদানের কারণে। তারা বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জনমত সৃষ্টি করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, স্বাধীনতার জন্য মানুষকে জীবনদানের জন্য প্রেরণা দিয়েছেন। অথচ মাত্র সামান্য সময়ের ব্যবধানে সেই রাজনীতিবিদরাই তাদের প্রতি জনগণের আগের সেই শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছেন। রাজনীতিবিদদের এখন সাধারণ মানুষ তোয়াক্কা করে না, শ্রদ্ধা তো করেই না। তা ছাড়া এখন রাজনীতিবিদ মানেই হলো একধরনের মাস্তান, অথবা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী অথবা দলবাজ এবং ঘুষখোর সাবেক আমলা। বর্তমান রাজনীতিবিদদের মাঝে আগের পুরনো বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে সাধারণ মানুষ মনে করে রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করেন নিজের জন্য, ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য, ক্ষমতায় আসীন হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিকভাবে কোটিপতি হওয়ার জন্য। ক্ষমতায় থেকে (মন্ত্রী-এমপি) এমনকি ক্ষমতায় না থেকেও (ক্ষমতাসীন দলের নেতা)। এদের অনেকেই অসম্ভব ধনী হয়ে যান, রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান, অথচ অভাগা দারিদ্র্যপীড়িত জনগণ- যাদের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতিকরা উঁচু আসনে বসেন, তারা যেমন পিছিয়ে ছিল তেমনি পেছনে পড়ে থাকে।
রাজনীতিকদের প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে দারিদ্র্যপীড়িত জনগণের দুঃখ-দুর্দশার দিকটি দেখা ও তা লাঘবের চেষ্টায় ব্রতী হওয়া; অথচ সেসব তাদের কাজকর্মে আজ আর তেমনভাবে প্রতিফলিত হয় না। তারা মানুষের চোখের সামনেই রাজনৈতিক কর্মী থেকে পেশাদার রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত হন। আদর্শ নয়, বরং ক্ষমতা ও ক্ষমতাকে ঘিরে সুযোগ-সুবিধা যেকোনো উপায়ে অর্জন করাই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি সংসদে আইন পাস করার ক্ষমতা থাকায় ও সংসদ সদস্যদের সমষ্টিগতভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত সরকারের অন্য কোনো বিভাগ ঠেকাতে অক্ষম বিধায়, এমপিরা নিজেদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করেন তাতে যে কারো চোখ কপালে ওঠার কথা। আর এসবই চলছে নির্বিঘ্নে, অবাধে। অতীতের রাজনীতির ভূষণ ছিল বিনয়, আর আজকের রাজনীতি হয়েছে উদ্ধত ও দুর্বিনীত। সংসদে বিতর্কের প্রথমাংশ ও শেষাংশ মিলিয়ে বৃহদাংশ হলো চাটুকারিতা ও তোষামোদ, আর বাকি অংশ আক্রমণাত্মক, উত্তপ্ত ও তিক্ততায় পরিপূর্ণ। সংসদ সদস্যরা অবলীলায় প্রতিপক্ষকে দুর্নীতি, বেআইনি কার্যকলাপ, অসদুপায় অবলম্বন ও অযোগ্যতার দোষে দোষী বলে সম্বোধন করতে কোনো দ্বিধা করে না। যত কথা বলে তার বেশির ভাগ মনগড়া, ভিত্তিহীন এমনকি মিথ্যা। এ ধরনের কার্যকলাপ পৃথিবীর কোনো দেশের সংসদে পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতি তাই জনগণকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনায় ব্যর্থ। তাদের মধ্যে আশার আলো জাগাতে ব্যর্থ। অদূরভবিষ্যতে তাদের সুদিনের আগাম খবর দিতে ব্যর্থ হলেও জনজীবনে মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা, গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার হরণ ও রাতের ঘুম হারাম করতে বর্তমান রাজনীতি যথেষ্টই সফল। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রে ও সমাজে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখতে জনগণকে সর্বক্ষণ বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে রেখেছেন। একই সাথে রাজনীতিবিদ, মাস্তান, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধীচক্র ও ব্যবসায়ী নামধারী কিছু ব্যক্তি, যারা প্রকৃত অর্থে চোরাচালানকারী, অর্থপাচারকারী, লুটেরা ও দুষ্কৃতিকারীদের মধ্যে এমন এক অদ্ভুত যোগসাজশ গড়ে উঠেছে, যা পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি দেশে দেখা যায়, যেমন হাইতি ও জ্যামাইকা। এই গোষ্ঠীর সদস্যরা দিন দিন শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এসব রাজনীতিবিদ নামধারী ব্যক্তিরা কখনো প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্যে, তাদের গোষ্ঠী ও তাদের ছত্রছায়ায় লালিত দুর্বৃত্তদের দিয়ে একের পর এক অপরাধ করে যায় অবলীলায়। এই গোষ্ঠী নিরীহ মানুষদের গুম বা খুন করুক, অথবা ঋণ নেয়ার নামে ব্যাংক লুট করুক, এরা থাকে আইনের ঊর্ধ্বে। আজকাল আবার রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা, যেগুলো জনগণের টাকায়, জনকল্যাণে প্রতিষ্ঠিত, ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও এই গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছেন।
তাই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের লালিত দুর্বৃত্তদের দেখেও না দেখার ভান করে। এ সম্পর্কে জনশ্রুতি হলো; ‘এসব দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসীরা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অসাধু লোকজনের সাথে দিনে আড্ডা মারে, রাতে একত্রে পানাহার করে, অথচ তাদের খাতায় লেখা থাকে এরা পলাতক অথবা ফুলের মতো পবিত্র কিংবা ধোয়া তুলসীপাতা।’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে অথবা একে অন্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সব পক্ষের মধ্যেই দেখা যায় প্রচণ্ড অনীহা। তাদের যোগসূত্র ও বন্ধন দেশের জনগণের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এই গোষ্ঠী অর্থনীতিকে দেউলিয়া করতে, দেশকে বিপথে পরিচালিত করতে, বিদেশে গিয়ে নিজ দেশের সম্মানহানি করতে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেও কোনো দ্বিধা করে না। এরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক দিকে আত্মতৃপ্তি লাভ করে, অন্য দিকে সমাজকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এসব রাজনীতিবিদদের দৃশ্যত তেমন কোনো আয় নেই। অথচ তারা নিত্যনতুন দামি দামি গাড়ি চড়ে বেড়ান। তারা থাকেন প্রাসাদোপম বাড়িতে। ঘনঘন বিদেশে বেড়াতে যান। প্রতিদিন বুলি আওড়ান যে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশ্বমানের অথচ সামান্য নুন থেকে চুন খুসলেই তারা ডাক্তার দেখাতে বিদেশে পাড়ি দেন। তাদের ছেলেমেয়েরা দেশের সবচেয়ে দামি স্কুল-কলেজে অথবা বিদেশে পড়াশোনা করে। এদের বেশির ভাগই আয়কর দেন না অথবা দিতে হয় না, দিলেও নামকাওয়াস্তে দেন। এদের টেলিফোন, পানি বা বিদ্যুতের বিল বাকি থাকে বছরের পর বছর। বাংলাদেশের দুর্বৃত্তায়িত সমাজে আইনের হাত এখন একেবারেই খাটো। তাই এদের কেউ কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার ক্ষমতা রাখে না। এমন সুযোগ কাকে না উদ্বুদ্ধ করে! তাই আমাদের দেশে এখন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার খুঁটি ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জনগণের মৌলিক ও ভোটের অধিকার হরণ করে, অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে জনগণের ওপর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে অবিরতভাবে। অবৈধ সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, জেল-জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে তারা তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বর্তমানে আন্দোলন-সংগ্রামে লিপ্ত। আশা করি অচিরেই জনগণ তাদের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারে সক্ষম হবে।
লাগামহীন বক্তৃতা, মিথ্যা বুলি, উপদেশের ফুলঝুরি, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, গায়েবি মালমা, দলীয়করণ, খুন-গুম, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও প্রতারণার মাধ্যমে যদি কোনো একটা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হতো, তা হলে এত দিনে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত হতো। বাস্তবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে চর্চা চলছে তা আমাদের অতীত ইতিহাসের নিগড়ে বন্দী। চিন্তা-চেতনা, কর্মসূচি ও দর্শনের দিক থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা এই রাজনৈতিক দল এখনো ষাটের কিংবা বড়জোর সত্তরের দশকে পড়ে আছে। দৃশ্যপটে মনে হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যেন পেছনের আয়নায় তাকিয়ে সামনের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। বারবার ধাক্কা খাচ্ছেন, হোঁচট খাচ্ছেন, খাদে পড়ছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে ও সামনের দিকে তাকাতে তারা কিছুতেই রাজি নন।
ক্ষমতাসীন দলে নেতাদের অবস্থা দেখে মনে হয় তারা সমাজের প্রকৃত সমস্যা নির্মূলে উৎসাহী নন। তারা সুচতুরভাবে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে প্রতিপক্ষের ব্যর্থতাকে পর্বতসমতুল্য করে তুলে ধরেন, আর প্রতিদিনই জনগণের উন্নয়নের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন এবং মিথ্যা পরিসংখ্যান প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্তের জালে আটক রেখে নিজ উদ্দেশ্যচরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকেন। তারা বলেন একটা, বিশ্বাস করেন আরেকটা, যা ইঙ্গিত করেন, বাস্তবে করেন তার উল্টোটা। এরা সালিস মানেন কিন্তু তালগাছের স্বত্ব ছাড়েন না। যেমন ধরুন ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে কথাবার্তা বলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশ্বাসের ভিত্তিতে নির্বাচনে যোগ দেয়। নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনা করলেই উপরোক্ত ধারণার সত্যতা পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে বলেন নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ সরকার প্রয়োজন। আবার ক্ষমতায় গেলে বলেন এটি সাংবিধানিক নয়। এই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী অডিটর জেনারেল থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে নিজের করায়ত্তে নিয়ে নিয়েছেন। বর্তমান সরকার এসব পদে এমন সব দলীয় লোকদের বসিয়েছেন যাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই। এরা লোকপ্রশাসন, পুলিশ ও কাস্টমসের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থার কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দলের কর্মীর মতো ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করেন না। এরা রাষ্ট্র, সরকার ও দলীয় স্বার্থের পার্থক্য রক্ষা করতে অক্ষম, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে একত্রে গুলিয়ে ফেলেছেন। রাষ্ট্র ও জনগণের দৈনন্দিন দেখভাল করার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বিচার বিভাগও জনগণের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে কার্যত নির্লিপ্ত। পুলিশের সামনেই ছিনতাইকারী সন্দেহে তরতাজা মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। অনেক যুবককে মানুষের চোখের সামনে পায়ের ও হাতের রগ কেটে চিরতরে পঙ্গু করে ফেলা হচ্ছে। কাউকে কাউকে চোখ উপড়ে অন্ধ করে ফেলা হচ্ছে। অসহায় নারী ধর্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে হত্যা, যা এ সমাজে ছিল অকল্পনীয়, এখন মামুলি ব্যাপার। হাটবাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা এমনকি নিজেদের বাড়িতে থাকার জন্যেও আজকাল চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ হওয়া উচিত সব রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু। তবে কতটা বিশ্বাস নিয়ে এ কথা উচ্চারিত হয় সে সম্পর্কে জনমনে দ্বিধা আছে। কেননা এ ব্যাপারে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি সরকারে থাকলে হয় এক রকম, সরকারে না থাকলে আরেক রকম। সংসদকে কার্যকর করার সত্যিকার আন্তরিক প্রয়াস চোখে পড়ে না। সেখানে বিজয়ী পক্ষ বিজিত পক্ষকে তুচ্ছজ্ঞান করে ও বিজিত পক্ষ বিজয়ী পক্ষকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে। সংসদীয় বিতর্কে প্রজ্ঞার আভাস মেলে না। আইন প্রণয়ন সংসদ সদস্যদের অন্যতম কাজ হলেও সেটিই সবচেয়ে অবহেলিত। এ নিয়ে চুলচেরা বিচার করার সময় পান না সংসদ সদস্যরা। সাধারণ মানুষ চায় সাদামাটা ও যৌক্তিক আইনকানুন। সংসদীয় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। যেসব আইন প্রণীত হয়, সেগুলি সাধারণ মানুষের কাজে তো লাগেই না, বরং তাদের দুঃখ-দুর্দশা বাড়ায়। অবশ্য গত তিন সংসদের জন্য উপরি উক্ত উক্তি প্রযোজ্য না। কেননা অন্তত বিগত দুই সংসদ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। এসব নির্বাচনকে কোনোভাবেই বৈধ বলা যাবে না। অতএব সদস্যদেরও বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না।
সরকারের সবাই দেশপ্রেমিক, সরকারের বাইরে যারা তারা দেশদ্রোহী- এই কুৎসিত মানসিকতা আমাদের চিরস্থায়ীভাবে বেঁধে রেখেছে। সংসদে বক্তব্যের মানে হলো; প্রতিপক্ষের প্রতি কটূক্তি, আক্রমণ, নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির, নেতানেত্রী বন্দনা, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা এবং এরপর যদি সময় থাকে তবে নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য আরজি পেশ- এটিই সংসদীয় বক্তৃতার একটি প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ আছে যে ক্ষমতা ও তথাকথিত জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য নিজেকে ও দলীয় লোকদের লাভবান করতে এমপিরা সংসদীয় কাজের চেয়ে এলাকার তথাকথিত উন্নয়ন কাজে সম্পর্কিত হতে চান বেশি করে। স্থানীয় সরকার বা সরকারি কর্মকর্তার বদলে তারাই উন্নয়ন কাজ তদারকি করেন, সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজ নিজ এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্দেশ দান করেন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দেশ পালনে বাধ্য করেন। এভাবেই তারা নিজ নিজ এলাকায় সমান্তরাল সরকার কায়েম করেন। দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধীদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনেন, প্রতিপক্ষ নিরপরাধী হলেও থানায় ভরতে বলেন। এক্ষেত্রে এদের বিচারের মানদণ্ড হচ্ছে নিজ দলের দুর্বৃত্ত হলে দলীয় কর্মী, অন্য দলের হলে জামিন অযোগ্য সাঙ্ঘাতিক অপরাধী। নিজেদের এই কর্তৃত্বে যাতে আর কেউ ভাগ না বসায় সে জন্য তারা স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বাধা দেন। অথচ গণতন্ত্রকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য শক্তিশালী স্থানীয় সরকার পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত। দেশ ও জনগণের হিতের বিপরীতে গেলেও এরা সব কিছু জেনেশুনে কেবল নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দিতে চান না। প্রশাসনিক সব স্তরে গণতন্ত্রের চর্চায় তারা পর্বত প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়ান।
সঙ্কীর্ণ রাজনীতির আবর্তে পড়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের রাস্তা আজ পথভ্রষ্ট। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারে কারো মন নেই। বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, ব্যাংক, হাসপাতাল, সব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে ভরপুর ও সম্পদ গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জনগণকে সেবা প্রদান করা ভুলে গিয়ে তাদের প্রভুতে পরিণত হয়েছে। জনগণ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। অভিযোগ করে সুরাহা হচ্ছে না। ন্যায্য প্রাপ্য সেবার জন্যও জনগণকে ঘুষ, উপঢৌকন দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, সুযোগ নেই প্রশাসনিক কাজে কোনোভাবে অংশীদারিত্বের।
আমরা সবাই জানি যে ‘সেই সরকারই উত্তম যা দৃশ্যমান নয়’। বাংলাদেশে বর্তমান সরকার এক দিকে জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ বা সেবা দিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করছে, তবে জনজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে, পদে পদে আদেশ-নির্দেশ দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের উৎসাহের শেষ নেই। উৎসাহের অভাব নেই ভিন্ন মত পোষণকারীদের শায়েস্তা করতে। অথবা ৫৪ ধারার অপপ্রয়োগ, বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে নিরীহ অথবা বিপক্ষজনকে নাজেহাল করা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হালচাল দেখে মনে হয় দেশকে বিরোধী দলমুক্ত করাই বর্তমান অনির্বাচিত ও অবৈধ ক্ষমতাসীন সরকারের একমাত্র আদর্শ।
আত্মবিনাশী রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে দেশের ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজও। এদেরই শক্তি, উদ্যম ও ত্যাগে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, অথচ এরাই এখন দিশা হারিয়ে আত্মহননে মাতোয়ারা। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি, অদক্ষতা, অপচয় ও পরিকল্পনাহীনতা ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজকে ঠিকভাবে জনসম্পদে তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশা করা গিয়েছিল, দেশের রাজনীতিবিদরা এদের আধুনিক যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করবেন। রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন, ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি- সর্বত্রই প্রয়োজন দক্ষ কাজের মানুষের, কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সেই দক্ষ মানুষ বেরিয়ে আসছে না। সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা তাদের আধুনিক বিশ্বের সমকক্ষ হতে দিচ্ছে না। এমনকি শিক্ষাঙ্গনেও আজকাল অনুপযুক্ত হলেও দলীয় ক্যাডারদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তার শিক্ষকতার চেয়ে রাজনীতি করতে বেশি উৎসাহী।
তাই হতদরিদ্র ছাত্রদের সামনে নেই কোনো উচ্চ আদর্শ। আশা নেই উন্নত জীবনের। ছাত্ররাজনীতির পেছনে কেবলই স্বার্থান্বেষীদের কুটিল হাত। ছাত্রসমাজ তাই বিভ্রান্ত। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, খুন-জখম- হেন কোনো অপকর্ম নেই যা আজ ছাত্ররাজনীতির নামে সারা দেশে মড়কের মতো বিস্তার লাভ করেনি।
তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে যুবসমাজের একাংশ। যুবসমাজের এ অংশটি গোড়া থেকেই অবহেলিত। তারা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো না কোনো পর্যায়ে অকালে ঝরে পড়েছে। এমন কোনো শিক্ষা ও দক্ষতা এরা অর্জন করেনি যা দিয়ে কঠোর বাস্তবতাকে মোকাবেলা করে জীবিকা অর্জন করবে। এদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মদদে অন্ধকার জগৎকেই বেছে নিয়েছে। নেতানেত্রীদের দ্রুত ধনী হতে দেখে ও তাদের জীবনযাপন থেকে দীক্ষা নিয়ে এরা দ্রুত ধনী ও ক্ষমতাবান হওয়ার প্রতিযোগিতায় সারা দেশকে নরকে পরিণত করেছে। তাই দেশের সম্পদ ও শক্তি না হয়ে ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজের এই অংশটি এখন বৃহত্তর ও শান্তিপ্রিয় জনগণের তথা সমাজের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। এদের অধঃপাতে দেয়ার দায় কেউ বহন করছে না, এদের উদ্ধার করার জন্যও কেউ এগিয়ে আসছে না।
এ সময়ে আমাদের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন পরমতসহিষ্ণুতা। মতান্তর যে মনান্তর নয় সেটি বিশেষভাবে উপলব্ধি করা। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন করে ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে আঁকড়ে রাখা যায় বটে, কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সেটি কখনো কায়েমি হয় না। ক্ষমতাসীন দলের অসহিষ্ণুতা, ভবিষ্যতে ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণতার বীজই বপন করে। পরস্পরের বিরুদ্ধে শ্রদ্ধাহীনতা ও অসহনশীলতা গণতন্ত্রের বাতাবরণ সৃষ্টি করে না, বরং সমাজের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। আমাদের সমাজের প্রকৃত সমস্যা কী, কিভাবে সবাই মিলে সে সমস্যার সমাধান করব। সেই কাজে কার কী ভূমিকা হবে, কাকে কতটুকু ভূমিকা পালন করতে হবে, এসব ব্যাপারে আজকাল আর কেউ কিছু বলে না। অথচ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, দৃষ্টান্ত ও অনুপ্রেরণা হয়ে মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধু নির্দেশ দিয়ে ও ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে সুফল কখনো পাওয়া যায় না। এতে সাময়িকভাবে কোথাও কোথাও সাফল্য এলেও, সেই সাফল্য ধরে রাখা যায় না। এই একই কারণে অনেক সাফল্য সত্ত্বেও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট ব্যবস্থা ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। প্রবীণদের প্রজ্ঞা ও তরুণদের কর্মোদ্দীপনাকে আমরা কিভাবে মেলাবো? সব উন্নয়নে জনগণকে সম্পর্কিত করে আমরা কিভাবে একুশ শতকে নিজেদের যোগ্যতর জাতি হিসেবে গড়ে তুলব? আমরা কি কেবল অতীতের কথা বলে, অতীতকে স্মরণ করে দিন কাটাব? সাবেক নেতানেত্রীদের গুণগান করে বর্তমানের গুরুদায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে আমরা আর কতকাল অতিবাহিত করব?
ভারতীয় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ড. বি আর আম্বেদকর১-এর একটি উক্তি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য :
‘কোনো দেশ গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না বা সাংবিধানিক সরকার টিকতে পারে না, যদি সেখানে সাধারণ জনগণের মধ্যে অযৌক্তিক বীরবন্দনা অব্যাহত থাকে। একজন মহাপুরুষ বা মহীয়সী নারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দূষণীয় কিছু নয়, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যেকোনো পুরুষ তার আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারো প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে পারে না, যেমন একজন নারী পারে না তার সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে এবং কোনো জাতি পারে না তার স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে।’
দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে জীবিত নেতা-নেত্রীদের পূজা করতে দেশবাসী, বিশেষ করে তরুণদের যতটা উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের আগামী দিনে সত্যিকার নেতৃত্ব নেয়ার গুরুদায়িত্বের কথা সেভাবে আদৌ মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে না। ইতিহাসের কিংবদন্তির প্রবাদ পুরুষের স্মৃতি রোমন্থনে কোনো রোমান্টিক ভাববিলাস নয়; ইতিহাসের অভিজ্ঞতার আলোকে সঠিক গন্তব্যের কাণ্ডারি গড়ার কাজটি ইতিহাসেরই ইতিবাচক সুস্থ ধারাবাহিকতা সবল রাখতে অপরিহার্য।
আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি স্বাধীনতা অর্জনের পর পঞ্চাশ বছরেরও বেশি অতিবাহিত হয়েছে। রাষ্ট্র কাঠামোয় জনগণ নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। সংবিধানে সে কথা লিপিবদ্ধও করিয়েছিল। জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতা আজ কোথাও দৃশ্যমান নয়। যা দৃশ্যমান, সেটা হলো; জনগণের ওপর রাষ্ট্র তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর, জনগণকে তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় কোনো মতেই যেতে দিতে চায় না। জনগণ প্রজা অথবা দাসে পরিণত হয়ে নেতা-নেত্রীদের বক্তৃতাই শুনে চলেছে কেবল। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সত্যিকার অর্থে তার অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কার্যকলাপে তার মতামত হচ্ছে উপেক্ষিত, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো পর্যায়েই তাদের পরামর্শ দেয়ার সুযোগ নেই। তারা শাসিত হচ্ছে, নির্দেশিত হচ্ছে। ক্ষমতাধরদের চোখরাঙানির ভয়ে তারা ভীত, নিশ্চল, নির্বাক, নিষ্ক্রিয়। তারা তাদের অভিপ্রায় প্রকাশ করতে ভয় পায়। অর্থবলে বলীয়ান, ক্ষমতাদর্পী ক্যাডার-বেষ্টিত বেশির ভাগ নেতানেত্রীর কাছে তারা অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, হয়ে পড়েছে অসহায়।
তবু আমি আশাবাদীদের একজন। আমি মনে করি, সামাজিক বিপ্লবের এই যুগে মানুষের ব্যক্তি ও সমষ্টিগত শক্তি কোনো না কোনোভাবে তার পথ করে নেবে, যেমন অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয়গিরির লাভা মুক্তি পায় আর তার উত্তাপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। তবে কোনো দৈব ঘটনার জন্য অপেক্ষা না করে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধার ও ভাগ পরিবর্তন কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার বিশ্বাস যে বাংলাদেশের এই মানুষই নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, শ্রম দিয়ে এবং দক্ষ সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে অদূরভবিষ্যতে অবশ্যই মাথা তুলে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের চাষি সব প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও যেভাবে ফসল উৎপাদন করে, বাংলাদেশের গ্রামের হতদরিদ্র নারী যে নিষ্ঠা ও দক্ষতার মাধ্যমে কাঁথায় তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটায় সে তুলনা আর কোথায় বা আছে? আজ এই লেখা চার্লস হামেলের একটা উক্তি দিয়ে শেষ করব। তিনি বলেছেন যে, অতীতকে ফেরত পাওয়া যায় না। তবে অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। ভবিষ্যৎ এখনো আমাদের সামনে এসে হাজির হয়নি। তবুও আমাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে হবে। সে জন্য সময় হলো ‘এখন’। আমাদের হাতে আছে শুধু ‘আজ’।
