বর্তমান বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় না রেখে চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে কোনো দেশ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য অন্য দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। আর অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয় পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে। পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ভূরাজনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে যেকোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আকার, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণের সমন্বয়ে মুসলিম দেশগুলোর উল্লেøখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং বৈচিত্র্যময়, কারণ এটি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। ভূগোল, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অবস্থার মতো বিষয়গুলো প্রতিটি দেশে স্বতন্ত্র ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতায় অবদান রাখে। মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যা উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যার সমস্ত দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তা বহুমুখী ও বিভিন্ন কারণে প্রভাবিত। এটি স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, মুসলিম বিশ্বজুড়ে একক, সমজাতীয় ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নেই, পরিবর্তে, স্বতন্ত্র আঞ্চলিক গতিশীলতা ও সমস্যা রয়েছে। এখানে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার কিছু প্রধান দিক রয়েছে :
ভূ-রাজনীতি
ভূ-রাজনীতি ভূগোলের একটি অংশ। এটি রাজনীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, চবধপব ধহফ ঈড়হভষরপঃ ঝঃঁফরবং, ড়িৎষফ ধভভধরৎ'ং, মষড়নধষ ংরঃঁধঃরড়হ-এর সাথে সম্পৃক্ত যেগুলো এবড়ঢ়ড়ষরঃরপং, মবড়- বপড়হড়সরপং, মবড়-বহারৎড়হসবহঃধষ ধংঢ়বপঃ ধহফ মবড়- ংঃঁফরবং সব কিছুর সমন্বিত একটি আলোচ্য বিষয়। স্যার হ্যালফোর্ড জন ম্যাকিন্ডার (১৮৬১-১৯৪৭) ছিলেন একজন ইংরেজ ভূগোলবিদ, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ, যাকে ভূ-রাজনীতির জনক বলা হয়। তবে ভূ-রাজনীতি (এবড় চড়ষরঃরপং) শব্দটি মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সুইডিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রুডলফ কেজেলেন দ্বারা উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৮-৩৯) মধ্যবর্তী সময়ে এর ব্যবহার পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার হয়। সমসাময়িক আলোচনায়, ভূ-রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি অতিরিক্ত প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ভূ-রাজনীতি হলো ভূগোলের প্রভাব নিয়ে অধ্যয়ন, যার মধ্যে একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, তার অবস্থান এবং তার সম্পদ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব অন্তর্ভুক্ত। এতে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তির আচরণ এবং কৌশলগুলোকে কিভাবে আকার দেয় তার বিশ্লেষণ জড়িত। ভূ-রাজনীতি কোনো অঞ্চলের বা দেশের বা কোনো নগরের বা বন্দরের অবস্থানগত কারণে যে গুরুত্ব লাভ করে তা কোনো দেশকে বা অঞ্চলকে শক্তি দান করে অথবা দুর্বল করে এবং সংশ্লিষ্ট সম্পর্কিত দেশ, রাষ্ট্র, সাম্রাজ্য অথবা সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর স্বার্থকে প্রভাবিত করে। এরকম বিষয়ের ক্ষণিককালীন নিরিখে যে পর্যালোচনাটি, সেটিই হচ্ছে ভূ-রাজনীতি।
মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি
বিশ্বের যে সব দেশে বা অঞ্চলে বেশির ভাগ জনসংখ্যা মুসলমান, যেসব দেশে মুসলিমরা সেসব দেশকে একত্রে মুসলিম বিশ্ব বলে। এক কথায় বলা যায়, ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে যে দর্শন সৃষ্টি হয়েছে এবং যেই দর্শনের আলোকে তাদের জীবন পরিচালিত এরকম এলাকা, অঞ্চল ও রাষ্ট্রগুলো যেখানে যেখানে পরিব্যাপ্ত সেসব অঞ্চলকে মুসিলম বিশ্ব বলা হয়। মুসলিম বিশ্ব বেশ কয়েকটি অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত, প্রতিটি অঞ্চল তার অনন্য ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সাথে। এ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা।
দক্ষিণ এশিয়া
এই অঞ্চলটি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম জনসংখ্যার দেশগুলোর অবস্থান। বাংলাদেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ দেশ আর ভারত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ না হলেও ভারতে প্রায় ২৫ কোটি মুসলমানের বসবাস।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো আসিয়ান ও সার্ক অর্থনৈতিক জোটের মাঝামাঝি। এই দু’টি ব্লক তথা সার্ক এবং আসিয়ানকে সংযুক্ত করেছে বাংলাদেশ (আমরা সার্ক এবং আসিয়ানের মাঝামাঝি অবস্থানে)। তার ফলে আমরা ঞযব ইধু ড়ভ ইবহমধষ ও ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থিত। এ জন্য আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই চমৎকার। এর ফলে নৌ ও স্থল যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশ একটি উৎকৃষ্ট জায়গা। শুধু তা-ই নয়, আমাদের উত্তরে হিমালয় পর্বত পেরুলেই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের অন্যতম নতুন পরাশক্তি চীনের অবস্থান। এভাবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। আর ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের অপেক্ষায়। সুতরাং ভারতের স্বার্থও এখানে রয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া তথা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-রাজনীতি ও অসীম সম্ভাবনাময় অর্থনীতির ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের এ অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারত প্রভৃতি শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র বিজয়, চীনের রোড অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ বা সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা সাত রাজ্যের প্রবেশমুখ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জলবায়ু বা ক্লাইমেট চেঞ্জ ইস্যুতে শক্ত অবস্থানের কারণে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে বাংলাদেশ চলে এসেছে। বৈশ্বিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ভারত ও চীনকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আবার চীন রোড অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে বাংলাদেশকে যুক্ত করার কারণে এই অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা; ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে সাত রাজ্যে সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী স্বাধীনতার জন্য লড়ে যাচ্ছে যেমন- নাগাল্যান্ডের ফেডারেশন ফ্রন্ট আর্মি, আসামে উলফা তাই ভারতের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অসীম। প্রতিবেশী মিয়ানমারে সামরিকজান্তা সরকার বিদ্যমান যারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের দমন-নিপীড়ন চালিয়ে তাদের বিরাট অংশকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আরাকানে স্বাধীনতাকামী আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি সক্রিয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও অপর প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তান এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। এক দিকে চির বৈরী ভারতের সাথে পাকিস্তানের কাশ্মির নিয়ে বিরোধ, অন্য দিকে মার্কিন ও ভারতের মদদপুষ্ট গণি সরকারের পতন পরবর্তী তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। কয়েক দশক ধরে চলা সঙ্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে তালেবানরা আবার সরকার গঠন করেছে। তালেবানের সাথে রয়েছে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক। ফলে কাবুলের বর্তমান তালেবান সরকারের সময়ে আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাবের অবসান ঘটেছে। এতে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব কমার পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রভাব বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে সিপিইসির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানও জোরদার করার সুযোগ করে পাচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিবেশী ও মিত্র চীন আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার এবং দ্রুত প্রবেশের জন্য পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে সিপিইসি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সিপিইসি হলো চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা এক বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর। করিডোরটি চীনের প্রস্তাবিত ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড নীতির অন্তর্গত এবং এটি চীনের অর্থ সহায়তায় গড়ে তুলা হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার অর্থনীতিকে বিন্যস্ত করার পরিকল্পনা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি পাল্টে দেবে।
ভারত মহাসাগরের বুকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দ্বীপদেশ মালদ্বীপ তার অনিন্দ্যসুন্দর সৈকত, কোরাল রিফ আর সামুদ্রিক প্রাণিবৈচিত্র্যের জন্যই সর্বাধিক পরিচিত। এমন একটি জায়গাতেও ভূ-রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছায়া ফেলেছে। মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের মাঝখানে একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে দিয়ে যে জাহাজ চলাচলের রুট বা শিপিং লাইনগুলো আছে, তার মাঝামাঝি খুব স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানে থাকা মালদ্বীপে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে ভারত ও চীন প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছে। মালদ্বীপ আসলে দীর্ঘকাল ধরে ভারতের প্রভাববলয়ে ছিল। মালদ্বীপে উপস্থিতি থাকার ফলে দিল্লিও ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তাদের নজরদারি বা মনিটরিং জারি রাখতে পেরেছে। মালদ্বীপের সাথে চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সূচনা ১৯৭২ সালে। তখন থেকেই চীন দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে। পরবর্তী সব সরকারের সাথেই তারা সদ্ভাব রেখে চলার চেষ্টা করে। ১৯৮৫ সাল থেকে চীনা কোম্পানিগুলো মালদ্বীপে নানা ধরনের বিনিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ করে। মালদ্বীপ ২০১৪ সালে চীনের অতি উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক ট্রান্সপোর্ট করিডর ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পে শ্রীলঙ্কার পরে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বিআরআইতে যুক্ত হয়। গত কয়েক বছরে চীন মালদ্বীপে প্রচুর বিনিয়োগ করে। ইয়ামিন সরকারের সময়ে মালদ্বীপ চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পায়। এখন পর্যন্ত চীন মালদ্বীপে যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে সড়ক ও আবাসন প্রকল্প নির্মাণ, প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উন্নয়ন, মালে ও হুলহুলের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ। এ ছাড়া মালদ্বীপের পর্যটন ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেছে চীন। প্রসঙ্গত, মালদ্বীপে বিদেশী পর্যটকদের বড় অংশই চীনারা। চীন, ভারতের পাশাপাশি এখানে আরেকটি দেশ চলে আসে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মহাসাগরে মালদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ডিয়েগো গার্সিয়া (যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) থেকে এর নৈকট্যের কারণে ক্ষুদ্র এই দেশটিও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক কিছু। মালদ্বীপের কৌশলগত গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এটি ছিল ভারতের বাইরে কোনো দেশের সাথে মালদ্বীপের প্রথম প্রতিরক্ষা চুক্তি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দু’টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটের অন্যতম সদস্য হওয়ায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী মালাক্কা প্রণালী অবস্থিত। মালাক্কা প্রণালী আন্দামান সাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের সাথে যুক্ত করেছে এবং মালয় উপদ্বীপকে সুমাত্রা দ্বীপ থেকে পৃথক করেছে। এই প্রণালীটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাহাজগামী সমুদ্রপথের একটি, ইউরোপ ও পূর্ব-এশিয়ার মধ্যকার সমুদ্র বাণিজ্য এর মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। এ ছাড়া সুন্দা প্রণালী ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রণালী। এটি ভারত মহাসাগরে সাথে জাভা সাগরের সংযোগ স্থাপন করে। এই দু’টি প্রণালীর অবস্থান নিঃসন্দেহে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালেয়েশিয়া ছাড়াও থাইল্যান্ডে অনেক মুসলমান আছে। এ ছাড়া রয়েছে তেলসমৃদ্ধ ব্রুনাই। দক্ষিণ চীনসাগরে সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক বিরোধের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। চীনের সাথে দক্ষিণ চীনসাগর নিয়ে আঞ্চলিক বিরোধ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে প্রভাবিত করে। এই বিরোধগুলোর মধ্যে দক্ষিণ চীনসাগরের কিছু অংশ বিশেষ করে নাতুনা দ্বীপপুঞ্জের চার পাশে চীনের সাথে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দাবি জড়িত। দক্ষিণ চীনসাগরের অবস্থান দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বাড়িয়েছে।
মধ্য এশিয়া
তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের মতো দেশগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত রাশিয়া, চীন ও আফগানিস্তানের সাথে তাদের নৈকট্য রয়েছে। অঞ্চলটি শক্তি সম্পদ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলসমৃদ্ধ। এটি মধ্য এশিয়াকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে এবং এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বে অবদান রেখেছে। একাধিক বৈশ্বিক শক্তির সংযোগস্থলে অবস্থান এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে মধ্য এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি অঞ্চল। মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। যেহেতু এই অঞ্চলটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেহেতু প্রধান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থ এবং নীতিগুলো, সেই সাথে আঞ্চলিক রাজনীতির গতিশীলতাও বিকশিত হয়। রাশিয়া, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিসহ (তুরস্ক, ইরান) প্রধান খেলোয়াড়দের মধ্যে মধ্য এশিয়া মহাশক্তির প্রতিযোগিতার বিষয়। একদা রুশ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার প্রভাব বিস্তার নিয়ে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। আর আজ এই অঞ্চলে ক্ষমতা এ সম্পদ নিয়ে প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে আরো বড় ও জটিল ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। এই শক্তিগুলো এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক শক্তি সম্পদ এবং বাজারে প্রবেশ এবং প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। রাশিয়ার একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, এই প্রতিযোগিতাটি তার নিজের কাছে ঘরোয়া খেলার মতো। রাশিয়া মধ্য এশিয়ার অনেক রাষ্ট্রের সাথে দৃঢ় ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বিশেষ করে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস (সিআইএস) এবং যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার (সিএসটিও) মাধ্যমে। রাশিয়ার এই কয়েকটি দেশে সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং অবকাঠামো, বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় তার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। বেইজিং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ওয়াশিংটন চীন ও রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি বাহক মধ্য এশিয়ায় তৈরি করতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্য
প্রায়ই চীন, রাশিয়া ইরানের নৌমহড়া হয় ভারত মহাসাগর তথা ওমান উপসাগরে। এটি পাশ্চাত্যের জন্য একটি মেসেজ। এতে কিছুটা ভারসাম্য এলেও, চীন ও রাশিয়ার কিছু কার্যকলাপ অগ্রহণযোগ্য। রাশিয়া কর্তৃক সিরিয়ায় ইদলিব প্রদেশে আসাদ বিরোধীদের ওপর বিমান হামলা অগ্রহণযোগ্য। তুরস্কে প্রায় ৪০ লাখ সিরীয় শরণার্থী রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে আরব দেশগুলো বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আরব বিশ্বের জ্বালানির ওপর বাড়ছে ইউরোপের দেশগুলোর নির্ভরতা। রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাত যত দীর্ঘ হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোর গুরুত্ব তত বাড়বে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য এক বিশেষ কেন্দ্রবিন্দু। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের আবাসস্থল। এই অঞ্চলের দেশগুলো, যেমন- সৌদি আরব, ইরান, ইরাক ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যাপী শক্তির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই দেশগুলোর বৈশ্বিক শক্তির বাজারের উপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় করে তুলেছে। এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বশক্তির মধ্যে কৌশলগত স্বার্থ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তেলের মজুদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি প্রধান সরবরাহকারী অঞ্চল। এই অঞ্চলের শক্তি উৎপাদন ও বণ্টনে যেকোনো বাধা বিশ্ব অর্থনীতি, শক্তির দাম এবং এই সম্পদের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর স্থিতিশীলতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এই অঞ্চলের অনেক দেশ কৌশলগতভাবে প্রধান মহাদেশ ও অঞ্চলগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন- সৌদি আরব, ইরান ও তুরস্ক, এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত যা অঞ্চলটিকে বাণিজ্য ও ট্রানজিট রুটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। মিসরের সুয়েজ খাল, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার হরমুজ প্রণালী এবং ইয়েমেনের বাব-এল-মান্দেব হলো অত্যাবশ্যক সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট, বিশ্বের বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের মধ্য দিয়ে যায়। এই কৌশলগত অবস্থান তাদের বিশ্ব বাণিজ্য এবং ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় করে তোলে ।
এই অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হচ্ছে তুরস্ক। তুরস্ক-জর্জিয়া ও বুলগেরিয়ার মধ্যে কৃষ্ণসাগর এবং সিরিয়া ও গ্রিসের মধ্যে এজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। তুরস্কের এই ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীর কৌশলগত অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার সুযোগ দিয়েছে, যা দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও ভূ-কৌশলগত রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে পরিগণিত করেছে। তুরস্কের এই ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুরস্ক দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আনাতুলিয়া উপদ্বীপের সম্পূর্ণ অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছে, যার ফলে দেশটি এশিয়া ও ইউরোপ-উভয় মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে এবং তার এ অবস্থান দেশটির শক্তির উত্থানের জন্য মূল কারণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো প্রায়ই আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) জাতিসঙ্ঘের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তঃসরকারি সংস্থা, ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এবং মুসলিম বিশ্বের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো প্রায়ই বিশ্বব্যাপী ইস্যুতে একত্রিত হয় যা মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে, যেমন ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব, ইসলামোফোবিয়া সম্পর্কিত সমস্যা এবং বিশ্বব্যাপী মুসলিম অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মুসলিম দেশ যেমন- কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরব কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে দৃঢ় বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করেছে এবং আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে নিজেদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবস্থান করার চেষ্টা করেছে, তাদের কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করেছে।
তবে চলমান সঙ্ঘাত, যেমন- ইসরাইল-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ইয়েমেনের অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা প্রায়ই শিয়া-সুন্নি বিভাজন হিসেবে দেখা হয়, পুরো অঞ্চলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও প্রক্সি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি নতুন পরাশক্তি চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি মাইলফলক চুক্তি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুই চিরশত্রুর মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের অবসান হয়ে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এ চুক্তির ফলে আরেকটি আশার দরজা খুলে গেছে। তা হলো- ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রক্সিযুদ্ধের সমাপ্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
উত্তর আফ্রিকা
উত্তর আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো তাদের অবস্থান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি অঞ্চল। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন আন্তর্জাতিক অভিনেতাদের জন্য আগ্রহের বিষয় এবং উত্তর আফ্রিকা প্রায়ই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। উত্তর আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি সেতু করে তোলে। এটি প্রধান বাণিজ্য রুটের সংযোগস্থলে অবস্থিত ও ভূমধ্যসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে, যা বিশ্বব্যাপী শিপিং ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আফ্রিকা তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদসহ যথেষ্ট শক্তি সম্পদের আবাসস্থল। আলজেরিয়া ও লিবিয়ার মতো দেশগুলো উল্লেখযোগ্য তেল এবং গ্যাস উৎপাদক, তাদের শক্তি রফতানি বিশ্ববাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মিসর সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণ করে যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট। খালটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করে এবং এটি বিশ্ববাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী, যা জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের চারপাশে দীর্ঘ ভ্রমণকে বাইপাস করতে দেয়। উত্তর আফ্রিকার শুষ্ক জলবায়ুর কারণে পানি একটি জটিল সমস্যা। নীল নদ এবং অন্যান্য উৎস থেকে মিঠা পানির সম্পদের প্রাপ্তি এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক বিতর্কের একটি উৎস। নীল নদের পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধ চলমান রয়েছে, প্রাথমিকভাবে এই বিরোধে মিসর, সুদান ও ইথিওপিয়া জড়িত। ইথিওপিয়া দ্বারা জিইআরডি নির্মাণ বিতর্কের একটি প্রধান বিষয় হয়েছে। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ, আরব বসন্ত, বিদ্রোহ ও পশ্চিম সাহারায় অস্থিরতার মতো দ্বন্দ্বসহ উত্তর আফ্রিকা চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছে। পশ্চিম সাহারার সার্বভৌমত্ব নিয়ে পলিসারিও ফ্রন্ট এবং মরক্কোর মধ্যে দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। যদিও একটি যুদ্ধবিরতি অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অধরা রয়ে গেছে। এই সঙ্ঘাতের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে, যার মধ্যে শরণার্থী সঙ্কট এবং সন্ত্রাসবাদের উদ্বেগ রয়েছে। উত্তর আফ্রিকা অভিবাসী ও উদ্বাস্তুদের ইউরোপে প্রবেশের জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করে যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো প্রায়ই আরব লিগ এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটে জড়িত থাকে। তাদের বৈদেশিক নীতির সিদ্ধান্তগুলো এই সংস্থাগুলোর নীতিগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। সাব-সাহারান আফ্রিকা সাব-সাহারান মুসলিম দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, কারণ এই অঞ্চলের প্রত্যেকটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। সাব-সাহারান আফ্রিকান মুসলিম দেশগুলো আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক গতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে। সাব-সাহারান আফ্রিকান মুসলিম দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুমুখী- জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, বাণিজ্য পথ ও আঞ্চলিক কূটনীতির মতো কারণগুলো অন্যতম। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব এবং ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও বিকশিত হতে থাকবে। কারণ এই অঞ্চলটি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বেশ কয়েক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটেছে। এক সময় ফরাসি আধিপত্য থাকলেও সাব-সাহারার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে অঞ্চলজুড়ে চীন তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। অবকাঠামো, বাণিজ্যচুক্তি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বিনিয়োগের মাধ্যমে, চীন নিজেকে সাব-সাহারান আফ্রিকায় একটি প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই অঞ্চলে চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রভাবও প্রবল, এ ছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সাব-সাহারান আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট, যেমন- ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্য রুট বরাবর অবস্থিত। তারা আফ্রিকার মধ্যে ও আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য চলাচলের সুবিধার্থে ভূমিকা পালন করে। সাব-সাহারান আফ্রিকা ভূ-রাজনৈতিক সঙ্ঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম, সোমালিয়ার আল-শাবাব ও সাহেল অঞ্চলের বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীর বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। সাব-সাহারায় আফ্রিকার একটি উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, যা এটিকে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি প্রভাবশালী উপাদান করে তুলেছে। নাইজেরিয়া, মালি, নাইজার ও চাদের মতো উল্লেøখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যাসহ অনেক সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশ তেল, গ্যাস, খনিজ ও আবাদযোগ্য জমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সংস্থানগুলো বিশ্বব্যাপী শক্তি সুরক্ষা এবং সংস্থান সরবরাহের জন্য অত্যাবশ্যক। সেনেগাল ও নাইজেরিয়ার মতো সাব-সাহারান আফ্রিকান মুসলিম দেশগুলো ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা শান্তি মধ্যস্থতা, মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগে নিয়োজিত।
ভূ-রাজনীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ ?
একই দর্শন, চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে শান্তির জন্য সারা পৃথিবীর মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রচেষ্টাই হলো ভূ-রাজনীতির মূল লক্ষ্য। আমাদের তরুণ প্রজন্মরা ভূ-রাজনীতির প্রভাবের কারণে তাদের সংস্কৃতির আদলে গড়ে উঠছে চিন্তা-চেতনা। সুতরাং আমাদের মধ্যে যে ভালো দিক আছে দর্শনের, মঙ্গলের, কল্যাণের, ঐক্যের, সাম্যের ও বিশ্বে মানবতার মুক্তির যে পথ রয়েছে সে বিষয় তরুণ প্রজন্মকে অবহিত করা।
বৈশ্বিক শান্তির জন্য হিংসা-জিজ্ঞাংসা শূন্য বিশ্ব তৈরির জন্য মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর, সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দানকারী ব্লক তৈরি করা জরুরি। এই জন্য ভূ-রাজনীতি, ভূ-কৌশলগত, ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আর তার জন্য দরকার নেতৃত্বের প্রজ্ঞা। এই নেতৃত্বের প্রজ্ঞা বেশির ভাগ তৈরি হয় মুসলিম বিশ্ব থেকে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, ভূ-রাজনীতি আমাদের দান করেছে বিপুল সম্ভাবনাময় সম্পদ সম্ভাবনা অবস্থানগত সুবিধা, কৌশলগত সুবিধা, জনসংখ্যাগত সুবিধা। তাই এগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই তাহলে বিশ্বের নেতৃত্ব ও শান্তি-সমৃদ্ধি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই ভূ-রাজনৈতিক, ভূ-সম্পদ ও ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ সেই সোনালি যুগে ফিরে আসা। আমরা যদি সারা বিশ্বের মুসলমানরা আঞ্চলিকতা ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবেই আমরা ভূ-রাজনীতিকে কাজে লাগাতে পারব। এ জন্য আমাদের তরুণ, শিক্ষিত ও আধুনিক বলয়কে কাজে লাগিয়ে মানবতার মুক্তির ও মানবতার শান্তির পথ সুদৃঢ় করতে হবে। শেষ কথা, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমাগত বিবর্তিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বন্দ্ব, মৈত্রী ও ক্ষমতার লড়াই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গতিশীল এবং জটিল করে তোলে, যা বিশ্বরাজনীতি ও নিরাপত্তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশের মধ্যেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতা আছে এবং রাজনৈতিক সঙ্কটও কাজ করছে। শুধু তাই নয়, এ দেশগুলোর মধ্যে কতগুলো আঞ্চলিক বিভক্তিও আছে এবং এ বিভক্তি তাদের মধ্যে ঐক্যের বিভক্তিও বলা যায়। আর এ ঐক্যহীনতা মুসলিম দেশগুলোতে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর ভেতরে বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো এবং আরো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোতে বহিঃশক্তির যে হস্তক্ষেপ রয়েছে, সেটি মুসলিম বিশ্বের সংহতির জন্য এবং মুসলিম বিশ্বকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তাই মুসলিম দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার বিবাদ ভুলে ঐক্যের সেতুবন্ধ তৈরি করবে এই আশা সমগ্র মুসলিম জাতির।
