শেয়ারবাজার কোনো স্বাভাবিক মার্কেট নয়। এটি এক ধরনের অস্বাভাবিক মার্কেট। ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ডেইলি কেনাবেচা হয়। এই ৪০০-৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ৯৫ শতাংশ হচ্ছে জুয়া খেলা থেকে। মার্জিন লোন নিয়ে তারা গ্রুপের মাধ্যমে এটি করে। তারা হারে। কখনো কখনো জিতেও। দু’-তিনজন হয়তো জিতে যায় কিন্তু বেশির ভাগই হারে। ওরা জাঙ্ক স্ট্রক অর্থাৎ যেসব কোম্পানির কোনো ইনকাম নেই সেগুলোকে উপরে তোলে। চাহিদা সৃষ্টি করে কৃত্রিমভাবে। তখন আসল বিনিয়োগকারী যারা তারা চুপ করে যায়। তারা অনেকে হয়তো বিক্রি করে হয়তো বসে রয়েছে সাইডে। আর বাকিরা এটি ধরে বসে থাকে। তারা বেরও হতে পারছে না। কারণ মার্কেটে একটি ফ্লোর প্রাইজ আছে। এর নিচে নামা যাবে না, যায় না। এর মধ্যেই থাকতে হবে। ফ্লোর প্রাইজের উপরে থাকতে হবে। কিন্তু ওই লেভেলে বেচাকেনা করা যায় না। এ শ্রেণীতে কোনো ক্রেতা থাকে না। রেজাল্ট হচ্ছে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা যে সমস্ত ভালো শেয়ার কিনেছে এসব ফ্লোরে আছে। ফলে এখানে কোনো ক্রেতা নেই। তাই ওরা বিক্রি করতে পারে না। একটি বিক্রি করে আরেকটিতেও আসতে পারে না। আবার প্রয়োজনে টাকা-পয়সাও বাইরে নিতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, ফ্লোর প্রাইজ দিলো কেন? এটি দিয়েছে এখন থেকে ১৫ মাস আগে। ২০২২ সালের ১ জুলাইয়ের দিকে দিয়েছিল। দিয়েছে যেন শেয়ারবাজারটা আরো পড়ে না যায়। এটি টেম্পোরারি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বলেছিল কিছু দিন পরে তুলে নেবে। কিন্তু এখনো আর তোলা হয়নি। এভাবে তারা ১৫ মাস কাটিয়ে দিয়েছে। এতে ফল হচ্ছে ওই যে যেগুলো বললাম। যেখানে দুই হাজার কোটি টাকা আড়াই হাজার কোটি টাকা বিক্রি হওয়া উচিত ছিল প্রতিদিন সেখানে এখন ৪০০ বা ৫০০ কোটিতে নেমে এসেছে। ৪০০-৫০০ কোটি টাকার ৯৫ শতাংশ জুয়া খেলা থেকে আসছে।
এখন নির্বাচনের সময় বলে আর তুলতে চাচ্ছে না সিকিউরিটি একচেঞ্জ কমিশন। যদি এটি তুলে নেয়া হয় তাহলে স্বাভাবিক হয়ে আসবে মার্কেট। এখানে আরেকটি কথা আছে, এই বাজারটি তো বিচ্ছিন্ন কিছু না। অন্যান্য মার্কেট যেভাবে আচরণ করছে এটিও অনেকটা সেভাবেই করছে। এখানে পুরো ইকোনমি খারাপ যাচ্ছে। ম্যাক্রোক্রমে পজিশন পুরো খারাপের দিকে। ফরেন এক্সেঞ্জ রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। আর ইনভেস্টমেন্ট কমে যাচ্ছে। ইনভেস্টমেন্ট গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে।
গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এলসি সেটেল হয়েছে। ফলে টাকা মূল্য হারাচ্ছে দ্রুত। এগুলো দিয়ে আমরা ইকোনমির হেলথ পরিমাপ করি। তো সব কিছু মিলে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল তিনটি রেটিং এজেন্সি পুওর। এ তিনটি রেটিং এজেন্সি বাংলাদেশকে ডাউন গ্রেড করে দিয়েছে। আগে যেখানে গ্রেডিং ছিল বোধ হয় বি-প্লাস। সেখান থেকে নিচে নেমে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে, যেকোনো ব্যবসায়ী পুরো ক্যাশ টাকা না দিয়ে কোনো কিছু ইমপোর্ট করতে পারবে না। আর চুয়াম বাংলাদেশকে লোনও দেবে না। প্রাইভেট সেক্টরকে তো দেবেই না। সরকারকেও লোন দেবে না সহজে। লোন দিলেও উচ্চ সুদ দাবি করবে। তাদের রিস্ক কাভার করার জন্য।
আইএমএফ যে লোনটা দিচ্ছে ইতোমধ্যে একটি কিস্তি দিয়েছে। সেকেন্ড কিস্তি তারা হয়তো দেবে কিন্তু তা দিয়ে আমাদের সঙ্কট উত্তরণ হবে না। হ্যাঁ, আমাদের সঙ্কট থেকে উত্তরণটা হতে হলে রাজনৈতিকভাবে একটি বোঝাপড়ায় আসতে হবে। কারণ এখন যেটি হচ্ছে মানুষ খুব অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। কোনো ব্যবসায়ী কোনো রিস্ক নিতে চাচ্ছেন না। বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোটায়। কোনো বিদেশী সহজে এখানে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। সব কিছু মিলিয়ে এগুলো খারাপ বলে শেয়ারবাজারটাও খারাপ যাচ্ছে। এটি সত্যি, শেয়ারবাজার নিজে নিজে কিছু খারাপ অবশ্যই হয়েছে। বাকিটা খারাপ বা স্থবির হয়েছে ওই যে ম্যাক্রো-ইকোনমিক ফান্ডামেন্টাইজগুলো আমাদের ঋণাত্মক হচ্ছে বলে। এ কারণে আমাদের শেয়ারবাজারের দুরবস্থা। গত দুই বছরে ভালো কোনো কোম্পানি আসেনি। সরকার কোনো প্রণোদনাও দেয়নি। ফাইন্যান্স বিলে এ বাজারের জন্য কোনো প্রণোদনা ছিল না। তো সব কিছু মিলিয়ে হাতাশার মধ্যে আছে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা। সমস্ত ব্রোকার হাউজে কোনো বিনিয়োগকারী নেই। কিছু কর্মকর্তা আছে। এর অর্থ হচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ঘরে বসে আছে। তাদের কাছে বেশি অপশনও নেই। তাদের টাকা-পয়সাও নেই। ইম্প্রেশন হচ্ছে ওখানে খরচ বেশি লাগছে। সারপ্লাস মানি তো হচ্ছে না যে শেয়ারবাজারে আনবে। কারণ দ্রব্যমূল বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। হাতে টাকা থাকে না। ফলে তখন তো আর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ আসে না। এখানে আরেকটি বিষয় আছে, বিষয়টি হলো- সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। ৭.২৫ বোধ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসির রেট বলে এটিকে। সেটি বাড়ানো হয়েছে। কিছু দিন আগেও বাড়ানো হয়েছে পয়েন্ট ৭৫। এর কারণে মার্কেটে ইন্টারেস্ট বেড়ে যাবে। এটি বাড়লে শেয়ারবাজারের ওপর উল্টো প্রভাব পড়ে। মানে সুদের হার বাড়লে শেয়ারবাজার ডাউন হবে। এটিও একটি কারণ। কারণ এখানে যে রিটার্ন আসবে তার থেকে ওখানে বেশি আসবে। সুতরাং শেয়ারবাজারের সাথে সুদের হারের একটি সম্পর্ক আছে। যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াচ্ছে এ জন্য এখানে আবার মার্জিন লোন নিলে সেটিরও সুদ বেড়ে যাবে। ফলে পোষাতে পারবে না মানুষ। সব কিছু মিলিয়ে এখন নেগেটিভ টেরিটরিতে মুভ করছে সব। তাই আজো মাইনাস মার্কেট। এটিও আরেকটি রিজন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সুদের হার বাড়ানো ঠিক হচ্ছে না। কারণ সুদের হার বাড়লে মার্কেট ইন্টারেস্টেড ল্যান্ডিং রেট যখন বাড়বে তখন মানুষের কেনাকাটা কমে যাবে। এটি ইনফ্লেশনকে কমিয়ে রাখার জন্য ওই পলিসিটি দরকার। আমেরিকাসহ অ্যাডভান্স ইকোনমিগুলোতে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে কাজ দেয় না এ জন্য মানুষ মূলস্ফীতিটা পরিমাপ করে খাদ্যদ্রব্যে। এখন সুদের হার বাড়লে চাল, ডাল, চিনি, আটা এগুলো মানুষ কি কম খাবে! এটি হয় না। অর্থাৎ এটি স্থিতিস্থাপক নয়। যেখানে স্থিতিস্থাপকতা নেই চাহিদার সেখানে সুদের হার বাড়িয়ে, ডিমান্ড কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। এটি তাও বিদেশীরা বলছে, আমাদের কিছু অর্থনীতিবিদও বলছেন, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি মনে করি, পলিসি ঠিক নেই।
এখন খুব খারাপ পরিস্থিতি। বাংলাদেশ ব্যাংককে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এখানে কারো হাতে কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা নেই যে, ফরেন একচেঞ্জ রিজার্ভ বাড়াবে। ফরেন একচেঞ্জ রিজার্ভ যদি না বাড়ে, হবে না। এর মূল কারণ হচ্ছে বিদেশী লোন। ফরেন একচেঞ্জ রিজার্ভ বলতে পারে যে এতদিন উপরে ছিল এখন পড়ছে কেন। ইমপোর্ট তো এতটা বাড়েনি; বরং ইমপোর্ট কমেছে। তাহলে ব্যয়টা কোথায় যাচ্ছে। যাচ্ছে বিদেশী লোন পেমেন্টে।
এই সরকারের আমলে আগে যে লোন ছিল এখন তার পাঁচ গুণ হয়েছে। আগে ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার। এটি ছিল ২০০৯ সালের দিকে। আর এখন হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। অধিকাংশ আবার পে করা শুরু হয়েছে। সহজ কথায় বললে বলা যায়, ‘ঋণ করে ঘি খেতে গিয়ে আমরা দুরবস্থায় পড়েছি’। এর ফল এমনই হবে, ইকোনমি স্থবিরতায় চলে আসবে। যারা অর্থপাচারকারী বড়লোক তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। অসুবিধা হবে সাধারণ লোকগুলোর। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকবে সাধারণ মানুষের কেনার মতো কোনো ক্ষমতা থাকবে না। এটিই হবে, হচ্ছে। ৯০ শতাংশ লোকের এই অবস্থা নিচের দিকে ৫ শতাংশ লোক খুবই কষ্টের মধ্যে থাকবে। সুতরাং কোনো ম্যাজিক দিয়ে, ফর্মুলা দিয়ে কোনো কাজ হবে না।
হ্যাঁ, এটি হতে পারে। এসব কিছু থেকে উত্তরণ ঘটবে যদি একটি ভালো ইলেকশনের দিকে যায় জাতি। ভালো ইলেকশন বলতে কি? মানে পার্টিসিপেশন, পার্টিসিপেটরি, ইনক্লুসিভ, অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনগণ অনুভব করতে হবে যে, ইলেকশনটি ভালো হয়েছে। আমি মনে করি ব্যক্তিগতভাবে ইলেকশন নিউট্রাল গর্ভমেন্টের অধীনে হওয়া উচিত। এটি ছাড়া এ দেশে ভালো কোনো ইলেকশন হয়নি, ভবিষ্যতে হবেও না। এখন প্রশ্ন হলো- ইকোনমির সাথে ইলেকশনের সম্পর্কটা কি? সম্পর্ক আছে। আগের ইলেকশন বিষয়ে বিদেশীরা মনে করত এটি তো ঠিকই আছে। ওরা একটি সিস্টেমে গেছে। বাংলাদেশী মানুষও এমন মনে করত, উৎসাহ পেত। ভেতরে কনফিডেন্স পেত। কনফিডেন্স না থাকলে কোনো কিছু হবে না। এখন যেটি হচ্ছে সেটি হলো- হতাশায় ডুবে আছে মানুষ। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কনফিডেন্সটা ফিরে আসত। তখন শেয়ারবাজারও ভালো হয়ে যেত। আর কোনো সমস্যা হতো না। ফ্লোর প্রাইজ থাকা অবস্থায় ভালো হয়ে যেত। এখন ওরকম ইলেকশন হয় কিনা এবং তেমন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় কিনা, দেখার বিষয়। যদি না হয়, সবার সমস্যা আছে। বড় ব্যবসায়ী বড় ব্যবসায়ী থাকবে না। ছোটরা কিনতে পারবে না। ফলে ছোটরা আরো ছোট হয়ে যাবে।
