গত বছরের ডিসেম্বরে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, যা গত জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। পাশাপাশি গত জুনে ব্যাংকটি এক হাজার ১৬০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক অবনতি ঠেকাতে গত বছরের ডিসেম্বরে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এই সময়ে আর্থিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদামতো নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) রাখতে পারছে না ব্যাংকটি। এ দিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোর উন্নয়নে এক বছর আগে সমন্বয়ক নিয়োগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে থেকে কিছু ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নতুন করে আরো কয়েকটিতে পর্যবেক্ষক বসানো হয়। এসব ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে এখন এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বেশির ভাগ ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কোনো কোনো ব্যাংক নতুন করে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা সমন্বয়ক ও পর্যবেক্ষকদের সাথে সভা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। গভর্নরের সাথে এটি ছিল তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা। বর্তমানে সমন্বয়ক আছেন সাত ব্যাংকে। সেগুলো হচ্ছে- ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, বিডিবিএল ব্যাংক। এ ছাড়া পর্যবেক্ষক রয়েছেন আট ব্যাংকে। সেই ব্যাংকগুলো হলো- সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। সভায় গভর্নর এসব ব্যাংককে বেঁধে দেয়া লক্ষ্য অর্জনে তদারকি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্যাংকগুলোতে সুশাসন যাতে নিশ্চিত হয়, তা তদারকি করতে বলেছেন। এ ছাড়া যেসব ব্যাংকে কোনো উপায়ে অনিয়ম ঠেকানো যাচ্ছে না, সেগুলোর উন্নতিতে কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়কদের সাথে এটি প্রথম সভায় ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিতে আরো উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এসব ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়নে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তা যেন কোনোভাবে লক্ষ্যচ্যুত না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়ে গত বছরের ৪ আগস্ট আব্দুর রউফ তালুকদার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করতে চারটি চলকের ওপর ভিত্তি করে ১০টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা হয়েছে। চলকগুলো হচ্ছে শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত ও প্রভিশনের পরিমাণ। চারটি চলকের ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা আলাদা (ওয়ান-টু-ওয়ান) ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তিন বছর মেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিটি ব্যাংকের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন।

চার চলকের ওপর ভিত্তি করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলকগুলো হচ্ছে- শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনের পরিমাণ। বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, আমরা কোনো ব্যাংক বন্ধের পক্ষে নই, আমানতকারীর টাকা যেন নিরাপদ থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে চাই। আমরা চাই সব ব্যাংক ব্যবসায় করবে, লাভ করবে এবং বাজারে টিকে থাকবে। এই ব্যাংকগুলোর অবস্থার উত্তরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। দ্রুতই সেগুলোকে সবল করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। একশ্রেণীর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে মানুষ টাকা ফেরত পাচ্ছেন না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের অনাস্থা এসেছে। আমরা চাই, ব্যাংকের প্রতি যেন তা না আসে। সে জন্যই ব্যবস্থা নিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অপর্যাপ্ত জামানত, অনিয়মের মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ, খেলাপি ঋণের আধিক্য, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি দেখানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম জেঁকে বসেছে ব্যাংক খাতে। তাই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কায় ১৯৯৪ সালে প্রথম ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আরো কয়েকটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়। দেশে ব্যাংক রয়েছে ৬১টি। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি ১৫ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়ক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করছেন। তার মানে দেশের এক-চতুর্থাংশ ব্যাংক এখন পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়ক দিয়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ আগ থেকেই অনিয়ম ধরা পড়ায় ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগ দিয়েই দুর্বল ব্যাংককে পৃথকভাবে তদারকির উদ্যোগ নেন নতুন গভর্নর। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১০টি দুর্বল ব্যাংককে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের অগ্রগতি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ করবেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যাংকগুলোতে সমন্বয়ক বসানো শুরু হয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়মের মধ্যে রাখা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়ক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত থেকে সভায় ব্যাংকের স্বার্থ পরিপন্থী কিছু হলে তারা মতামত দেবেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না এ বিষয়ে তারা প্রতিবেদন দেবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক যতদিন মনে করবে ততদিন ওই দু’টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষকরা কাজ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ না করলেও কোন ব্যাংক কী করছে সেটি দেখার ক্ষমতা ও দায়িত্ব তাদের। তারা তা দেখেনি। পর্যবেক্ষকও সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। তাকে ঠিকমতো কাজ করতে দেয়া নাও হতে পারে। আমরা দেখেছি একজন পর্যবেক্ষক কাজ করতে না পেরে পদত্যাগ করে চলে গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক আরেকজন বসিয়ে দিয়েছে। আসল কথা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংককে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালন করতে হবে। ছোটখাটো ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করলে হয়তো কাজ হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি মনিটর করতে পারে। কোনো অনিয়ম হলে তারা তা সরাসরি দেখতে পারে। আমরা এর আগেও তো দেখেছি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে কাজ হয়নি। তারা কাজ করতে পারেনি। একটি ব্যাংকের প্রভাবশালী ১৫ জন পরিচালক আর ১০ কর্মকর্তার সামনে পর্যবেক্ষক কি করবেন। তবে প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হলে আলাদা কথা। অনেক পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়ক সভায় অংশ নিয়ে সম্মানী নিলেও কোনো ভূমিকা রাখছেন না। সভাগুলোতে যেসব অনিয়ম হচ্ছে, তা-ও তুলে ধরছেন না। এমনকি সভা শেষে কেউ কেউ প্রতিবেদনও জমা দিচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। আরো কয়েকটি ব্যাংক দুর্বল হওয়ার তথ্য পরিদর্শনে ধরা পড়ছে। আগে যেসব ব্যাংকে পর্যবেক্ষক দেয়া হয়েছে, সেগুলোরও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। ফলে এই মডেল ব্যর্থ হলে পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক বসানো ছাড়া উপায় থাকবে না। দেশের বিভিন্ন ‘দুর্বল’ ব্যাংকে দায়িত্ব পাওয়া পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়কদের গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পর্যবেক্ষকদের সাহসী ও উদ্যোগী হয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে এবং ব্যাংকগুলোকে ভালো পর্যায়ে নিতে চেষ্টা করতে হবে।

অর্থনীতিতে গভীর সঙ্কট চলছে। কাঠামোগত সমস্যা, সুশাসনের অভাব, সময় মতো সংস্কারের পথে না যাওয়াই এর মূল কারণ। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধার দেয়া হচ্ছে সমাজের ধনিক শ্রেণীর কাছে, যারা তা পরিশোধ করছেন না; আর আর্থিক খাতের কিছু সমস্যা ক্যান্সারের মতো, এগুলো চিহ্নিত করে তা সারানোর উদ্যোগ নিতে হবে। মোটা দাগে দু’টি বিষয় সামনে রেখে ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। একটি হচ্ছে- সমন্বিত সংস্কার; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এর আওতায় শক্তিশালী হবে। এ জন্য আইনি পরিবেশ ও এ খাতের তথ্যের অবাধ সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকবে। আরেকটি হচ্ছে- ব্যাংক কমিশন গঠন; এ কমিশন ব্যাংক খাতের গোড়ার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ তুলে ধরবে। প্রায় এক দশক ধরেই ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা বলা হচ্ছে। সরকার মাঝে উদ্যোগ নিয়েও তা আর গঠন করেনি। বারবার আলোচনায় এসেছে ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি। ব্যাংক থেকে কাগুজে কোম্পানিকে ঋণ দেয়ার ঘটনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। আগে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার আদায় ও বিচারের কতটা অগ্রগতি হয়েছে, বিষয়টিও সামনে আসছে। অন্য কোনো বিষয়ে নজর না দিয়ে এখানে শুধু কয়েকটি ব্যাংক সাবাড়কারীর বিচারের কথাই বলা যায়। এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও প্রশ্ন করছেন, তারা কি শুধু দর্শক হয়ে ব্যাংক খাতের লুট করা দেখবেন? সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসিক ব্যাংক লোপাটের ঘটনা নিয়ে তদন্ত কেন শেষ হচ্ছে না, সে বিষয়ে। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের আগে এবং পরে আরো যেসব ব্যাংকে কেলেঙ্কারি হয়েছে, সেগুলোতে কি কিছু হয়েছে? সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা তো সবাই বহাল তবিয়তে আছেন, রাজনীতি করছেন। বলাবাহুল্য যে, উদ্যোক্তারা ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সারির নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, তার পরিবার, স্বজন ও সহযোগী। শুধু ব্যাংকটিকে নতুন নামে বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে, যা এখনো সফল হয়েছে বলে কেউ দাবি করতে পারছে না। দেশে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়নি বা বন্ধ হয়নি বলে মন্ত্রী বা আমলারা দাবি করেন, তারা যে তথ্যটি আড়াল করেন তা হলো, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ ব্যবস্থায় এগুলোকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অনাদায়ি ঋণ অবলোপন ও খেলাপি ঋণের বোঝা সামলাতে দফায় দফায় করদাতাদের টাকা দিয়ে মূলধনের ঘাটতি পূরণ না করলে সেগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ওই টিকিয়ে রাখার মূল্য কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষই দিচ্ছে। গত এক যুগের প্রধান ঘটনাগুলো তালিকা করলে প্রথমেই আসবে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা। এরপরই বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জনতা ও প্রাইম ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের অনিয়ম, জনতা ব্যাংকের অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ অনিয়ম। এ ছাড়া আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম, ইউনিয়ন ব্যাংকের বেনামি ঋণ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঘটনা। আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায়।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে প্রধান করে গঠিত ব্যাংক সংস্কার কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল ১৯৯৯ সালে। কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা খেলাপি ঋণের অন্যতম কারণও। স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা ব্যাংকিং খাত সংস্কারের সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ কারণে সংস্কার কর্মসূচি সফল করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। মূলত এই অঙ্গীকারই কখনো দেখা যায়নি বলেই খেলাপি ঋণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছিল, বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার প্রবণতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে। আবার প্রভাবশালী, ওপর মহলে ভালো যোগাযোগ আছে এবং ধনী, এমন কিছু ব্যবসায়ী ঋণ ফেরত দেয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেন না। বাংলাদেশে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এখন নিচ্ছেন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান এসব ঋণগ্রাহক।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হওয়া সংজ্ঞা হচ্ছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা। দেশে প্রথম খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। তবে পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞাটি ছিল ১৯৯৪ সালের। এর পর থেকে যতগুলো সরকার এসেছে, সবাই এর সংজ্ঞা নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আবার খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ কতবার পুনঃতফসিল করা যাবে, তারও পরিবর্তন করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর শুরুতে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালাটিও ধরে রাখতে পারেনি। প্রভাবশালীদের তদবির ও চাপে পিছু হটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছে বিশ্বব্যাপীই। বিশ্বমন্দার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ডলারের দামের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে উৎপাদিত পণ্য সেভাবে বিক্রিও হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। আয় ও ব্যয়ের হিসাবে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান। এতেই ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে তারা। এতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে। সুশাসনের প্রচণ্ড দুর্বলতা আর্থিক খাতে বড় বড় কেলেঙ্কারির জন্ম হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের, আমানতের নয়ছয় হয়েছে। লাভবান হয়েছেন কেবল ঋণখেলাপিরাই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে ঋণখেলাপিদের ব্যাংক ডাকাত বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পোষকতা বন্ধ হয়নি কখনোই। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ দেশের লাখোকোটি মানুষ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিল, সেই চেতনার বাস্তবায়ন কী হয়েছে এখনো, শোষণমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কি কায়েম হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে? এ প্রশ্নগুলো এখন আমাদের নাড়া দিয়ে যায় বারবার। যখন বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা তথা আর্থিক খাতে নানা কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো চোখের সামনে একের পর এক আসছে, যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি বেড়ে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লুটপাটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংককে শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন একশ্রেণীর প্রভাবশালী অসৎ টাউট বাটপার চরিত্রের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সমাজের তথাকথিত হোমরা-চোমরা ব্যক্তিরা। যখন গ্রামের অতি সাধারণ দরিদ্র কৃষক ব্যাংক থেকে নিয়ে তা যথাসময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ তাদেরকে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় আটক করে নিয়ে যায়। অথচ বড় বড় খেলাপির হাজার হাজার কোটি টাকা অনাদায়ি থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে তেমন জোরালো কোনো ব্যবস্থা নিতে সঙ্কুচিত বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বড় বিচিত্র মনে হয় স্বাধীন বাংলাদেশের এই বৈপরিত্যমূলক ব্যবস্থা। এর জন্যই কী বাংলাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিল ১৯৭১ এ? এ প্রশ্ন জাগে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে। কে দেবে তার যথাযথ জবাব? নাকি তা নিভৃতে কেঁদে যাবে শুধু।