আমরা এমন একটা সময়ের সাক্ষী হতে চলেছি যখন চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখোশপরা মানুষ। এর ভেতর আমরা দুঃসময় অতিক্রম করছি কিন্তু কিছু করার নেই। সমাজে নৈতিকতা-মানবিকতা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। কিন্তু উত্তরদাতা নেই কেউ। পত্রপত্রিকা, নিউজ, ফেসবুকসহ আরো আরো মিডিয়াব্যাপী কেবলই রক্তক্ষরণের দৃশ্য। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব মানুষ হিসেবে আজ লজ্জিত হতে হয়। চরম এই অধঃপতনের শিকার হয়ে জাতি হিসেবে আজ যেন মুখ লুকানোর জায়গাটুকুও নেই। খুন, গুম, ধর্ষণ, ছিনতাই, রাহাজানি নিত্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কাজগুলো কারা করছে। কেন করছে। তারা কারা? তারা কি কোনো হিংস্র পশু! না তারা কেউই পশু নয়, সবাই রক্তমাংসের মানুষ। তারা আমাদেরই একজন। আমরা ভুলে গেছি সৃষ্টিকর্তা আমাদের কী উদ্দেশ্যে এ ধরনীতে পাঠিয়েছেন। কী সেই কর্তব্য যা থেকে আজ আমরা দূরে সরে আছি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেখানে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সেখানে এটির ব্যবহারে আমরা ন্যূনতম খেয়াল রাখছি না। অপরাধ অনৈতিকতা এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে এর নিত্যনতুন কৌশল আমাদের হতবাক করে দিচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ-জিন, ভূতপ্রেত থেকে দূরে থাকতে চাইতো। নির্জন পথ ধরে যেতে ভয়ে আতঙ্কিত মনে মানুষের দেখা পেতে চাইতো। যেন নির্ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। আর এখনকার চিত্র পুরোই উল্টো। মানুষ জিন নয় বরং আজ মানুষকেই চরমভাবে ভয় পেতে শুরু করেছে মানুষ। মানুষ মানুষের কাছ থেকে পালানোর কৌশল রপ্ত করতে চাচ্ছে। আতঙ্কের স্থানে রাস্তাঘাট থেকে বাদ নেই চলন্ত বাসও। এ কোন সময়ের ইতিহাস গড়তে চলেছি! বিবেক আজ অন্ধ, বধির। ন্যূনতম বোধও আজ নেই যেন। আমরা কেবলই অন্ধকারে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছি।

দ্রুত বদলে যাচ্ছে সমাজ। এ বদল সময়েরই অন্যতম দাবি। কিন্তু তা হতে হবে গঠনমূলক। হতে হবে সংবেদনশীল। কিন্তু সমাজের যে বিকৃত পরিবর্তন প্রত্যহ করতে হচ্ছে এটা কোনোভাবেই কী কাম্য! এ জন্যই কি লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে! ইতিহাসের পাতা থেকে জাহেলি যুগ চলে গিয়েও যেন ভিন্নরূপে ফিরে এসেছে। মানুষ মানুষকে হত্যা করছে নির্বিবাধে। কোনো চেতনা কাজ করছে না। একজন নৃশংসভাবে হত্যা করছে আবার তারই ওপর নিত্য করছে তারই সহযোগীরা। মানুষ হত্যার মতো কাজ করেও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। কেমন করে তা সম্ভব হচ্ছে! এ জিজ্ঞাসা সবার। আমাদের বোধ বুদ্ধি বিবেক আজ বন্দী। সত্য প্রকাশের দৃঢ়তা নেই। ক্রমাগত নিজেকেই যেন পাশ কাটিয়ে চলা। তাদের মধ্যে কেউবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে তাকে হতে হচ্ছে ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন। না হয় জায়গা পরিবর্তন করে চলে যেতে হচ্ছে। একটি সুস্থ সুন্দর পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার আশা বর্তমানে অলীক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজের মধ্যে চলমান ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে চলা যায় না। কোনো বিষয়কে তুচ্ছ জ্ঞানও করা সম্ভবপর হয় না। তবুও এই সমাজেরই একজন হয়ে আমি আমার দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারছি। মানুষের পাশে নির্ভরতার হাত বাড়াতে পারছি কী? কিন্তু মানুষকে নির্মমতার দিকে ঠেলে দিতে এতটুকুও কুণ্ঠিত হচ্ছি না। প্রেম-ভালোবাসা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রেমবিহীন জীবন কখনো জীবন নয়। সৃষ্টিকর্তাই আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা না থাকলে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়া যায় না। অথচ আমরা প্রেম বা ভালোবাসা মানেই শুধু জাগতিক বস্তুনির্ভরতা বুঝি। প্রেমের যে দু’টি স্বরূপ তা ভুলে যাই। একটি ঐশ^রিক অপরটি জাগতিক। ঐশ^রিক প্রেম আমাদের হৃদয়কে প্রশস্ত করে। পৃথিবীকে জয় করার বিষয়ে উৎসাহিত করে। জাগতিক প্রেম জীবনের পূর্ণতাপ্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখে। সেই প্রেমের গভীরতা উপলব্ধি না করে বর্তমান সময়ে ভালোবাসার হাতছানি দিয়ে মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আবার কেউ বিশ^াসের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মানুষকে নির্মম হতে বাধ্য করছে। কাউকে প্রেমের ফাঁদে আটকাতে না পেরে এসিড মেরে দগ্ধ করে নিঃশেষ করে দিতে চাচ্ছে। সম্পর্কের গাটছড়ায় কার সাথে কিসের সম্পর্ক তাও বিবেচনায় রাখছে না। কোমলমতি শিশুরাও মানুষের পাশবিক নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এই কি সমাজের চিত্র! এমনই একটি দেশ দেখবে বলেই কি ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা হয়েছিল! আজ বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রশ্ন থেকে বাদ যাচ্ছে না কেউই। সমাজের একটি অংশ আমি আমরা সবাই। পরিবারভুক্ত জীবন আমাদের সবার। সবার একটিই প্রশ্ন; সুস্থ সুন্দর জীবনের আশা করা কি অন্যায়!

সৌন্দর্য ও মহিমান্বিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৎ ও সুশীল হওয়া ব্যতীত পরিবর্তন সম্ভব নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই মানুষ আজ মুখোশ পরা। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি সেক্টরে আজ দুর্নীতি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে নিষ্পেষিত করছে প্রতিনিয়ত। মানুষের কান্নায় আকাশ বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠেছে। বাজারে গেলেই ভিন্ন দৃশ্যের দেখা মেলে। যে জিনিসটা যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক কম নিয়ে ফিরে যাচ্ছে মানুষ। চেহারায় বিষণœতার ছাপ স্পষ্ট। এতটুকুও হাসি নেই মুখে। বাংলাদেশ সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলে ঘেরা। প্রকৃতির রূপ যেন চোখে ধরা। মন খুলে নিঃশ^াস নেয়ার মতো সবুজে মোড়ানো এই দেশ। সেই প্রিয় দেশের মানুষের মুখে যখন স্বস্তির দেখা নেই তখন কেমন করে সুখী হয় মানুষ! জীবন বাঁচানোর সামান্য রসদ কিনতেই অসহায়ত্ব যেন আজ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত সব পরিবারে। একটা সময় ছিল ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দেখেছি আমরা সবাই। কিন্তু বর্তমানে শুধু দুটো শ্রেণীরই দেখা মেলে। এক. ধনী, দুই. গরিব। মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শব্দটা কেবলই শব্দ হয়ে রয়ে গেছে। মানুষ মানুষকে ঠকাতে কোনোভাবেই পিছু হটছে না। যে যেমন করে পারছে মুখোশ পরে চলছে। কেউ ব্যবসায়ে ওজনে কম দিয়ে ঠকাচ্ছে। কেউ আবার আগে থেকেই বাসী ফল বা সবজি ব্যাগে ভরে রাখছে। খরিদ্দার যখন চাচ্ছে তাকে দেখাচ্ছে ভালোটা দেয়ার সময় থলির নিচে রাখা ব্যাগটি ধরিয়ে দিচ্ছে। বাসায় গিয়ে মন খারাপ করা ব্যতীত আর কীই-বা করার থাকে তখন। অফিস আদালতে আজকাল হাসিখুশি মনে চলারও কৌশল শিখতে হবে নতুন করে। নতুবা মানুষ চিনব কেমন করে! পরিস্থিতি যদি এমনই হয় তাহলে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ করা আদৌ কী সম্ভব!

অনেক প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। প্রশ্ন বেড়েই চলেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি জিজ্ঞাসা এর সমাধান কি? সকল বিবেকের কাছে প্রশ্ন আপনারা বলুন কি করতে হবে আমাদের। যতদিন নৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারণ চিহ্নিত হবে না, এই অধঃপতন রোধ করাও সম্ভব হবে না। খুব সহজ একটি পথ তা হলো অন্যের কাঁধে দোষ চাপানো। আমরা আর কিছু পারি বা না পারি এটা ঠিকঠাক করতে পারি। সমাজের বুদ্ধিজীবী মহল থেকে আরম্ভ করে রাজনৈতিক অঙ্গনের সবাই বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে অনেক ভালো ভালো কথা বলে থাকেন। দিয়ে থাকেন অনেক পরামর্শ। মানুষকে প্রণোদনা দিতে দিয়ে থাকেন অনেক প্রতিশ্রুতি। বাস্তবচিত্রে তার ফলাফল অনেকটাই শূন্য। মানুষের বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেউই কাউকে ছাড় দেন না। কখনো কখনো দেখা যায় টেলিভিশনে বিভিন্ন চ্যানেলে অনেক টকশো, বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা হয়ে থাকে। সেখানে দুই পক্ষ মিলে অনেক বাগি¦তণ্ডাও করে থাকেন। এতকিছু করেও কী কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারছি আমরা! দূর অতীত নয়, নিকট অতীতের দিকে তাকালেই সামাজিক অধঃপতনের ভয়াবহতার হিসাব স্পষ্ট দেখা যাবে। একটি স্বনির্ভর জাতি হিসেবে আমরা আজ কতটা পিছিয়ে। যেখানে আমরা শিক্ষা, অর্থ ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়করভাবে অগ্রগামী। যেখানে শিক্ষার আলো আজ প্রতিটি ঘরে ঘরে; সেখানে মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত। মানুষ আজ যেন অন্য এক মানুষ। মুখোশ পরা মানুষ।

মানুষ ও মানচিত্রের যেই চিত্র আজ প্রত্যক্ষ করছে সমগ্র বিশ^ এ থেকে পরিত্রাণের পথ একটাই তা হলো ইসলামের পথে ফিরে আসা। অপরাধপ্রবণতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে আজ মানুষ নিয়ন্ত্রণহীন। শান্তিময় জীবন ও সোনালি একটি সমাজ পেতে হলে সঠিক ইসলামের জ্ঞান জরুরি। ইসলাম ব্যতীত মুক্তির কোনো পথ নেই। আজ ইসলামের জ্ঞান হারিয়েই মানুষ সামান্য সম্পদের লোভে বাবা-মাকে অস্বীকার করছে। জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে বৃদ্ধাশ্রম। বাবা-মায়ের লাশ নিয়েও সন্তানদের মধ্যে সম্পদের কাড়াকাড়ি আজ মিডিয়াজুড়ে। সবাই বিভিন্ন কমেন্ট করছে। ধিক্কার দিচ্ছে। পরিণয়ে পরিণতি ঠেকাতে পারছে না। কী সেই কাজ, যা আমাদের এই দুনিয়ায় সম্পদশালী করবে। আবার পরকালেও নাজাতের পথ তৈরি হবে। মুখোশ খুলে ফেলে দিয়ে সত্যিকারের একজন মানুষ হতে হবে। হাসির আড়ালে থাকবে না কপটতা। বিশ^াসী চরিত্র গঠন করতে হবে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য মৃত্যু। আল্লাহ তায়ালা যা সৃষ্টি করেছেন সব কিছুরই মৃত্যু হবে। এই সম্পদ, ঘরবাড়ি প্রাচুর্য কিছুই থাকবে না। কেবল নাম পরিবর্তন হবে। নিজের জীবনই যখন থাকবে না তখন কোন জিনিসের দাম কত তা দিয়ে কার লাভ হবে! চিন্তার সময় এখনই। সময় বড় নিষ্ঠুর। বয়ে চলাই তার রীতি। সে আপন গতিতে বহমান। কারোর জন্যই সে থামে না। তাই আজ নয় বরং এক্ষুণি করতে হবে কাজটি। সেরা কাজটি। নতুন দিনের সূর্যের মতো আগামীর পথচলা হোক নির্ভরতার-স্বস্তির। অপেক্ষা হোক আনন্দের।