বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে অবস্থা একে আমি বলব একটি অবস্থা। একদিক থেকে যদি আমরা জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার দেখি দেখব সেটি খুব খারাপ নয়। অন্য দিকে বাস্তব অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানো দুরূহ। ফলে এটি একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে তারা বলেছে ৫.৬% জিডিপি গ্রোথ হবে আমাদের। এটি অবশ্য অনেক দিনের পরিকল্পনা। আমাদের এর চেয়ে বেশি অর্জন হচ্ছিল সে তুলনায় এটি কম। তবে ৫.৬ প্রবৃদ্ধি খুব একটা খারাপ নয়।
অন্য দিকে, আমাদের অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এবং উদ্বেগের বিষয় আছে। এর মধ্যে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীত। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি কমেনি। অনেক দিন ধরে প্রায় ১০%-এর ধারেকাছে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আগস্ট মাসে এটা ৯.৯৬ পর্যন্ত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে এসে অল্প একটু কমেছে। সম্ভবত ৯.৭৬ হয়েছে। মূল্যস্ফীতির ফলে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি যেসব মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা দারিদ্র্যসীমার নিচে যারা আছে তাদের জীবনযাত্রার মান তো আরো নিচের দিকে নেমে যায়। যাচ্ছে এবং এতে করে দারিদ্র্যসীমার নিচের লোকদের সংখ্যাও বেড়ে যায়। এমনিতেই আমাদের দেশের যদিও ওভারটাইম বেশ কিছুটা কমেছে। তবুও আমরা দেখতে পাই যে সাম্প্রতিককালে বার্ষিক দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের যে কমতি সে কমতি হার কমে গেছে। কাজেই এখানে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে অর্থনীতিতে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় ইসু হচ্ছে বহিঃখাত। আমাদের রেমিট্যান্সের অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। সাথে সাথে আমদানিও কমে গেছে। সার্বিকভাবে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নেতিবাচক। নেতিবাচক হওয়ার মাত্রাটাও বেড়ে গেছে। ফলে মুদ্রার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন হচ্ছে খুব। এটিও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। কেননা আমাদের অনেক পণ্যই আমরা আমদানি করি। যদি মুদ্রার মান কমে যায়। তখন আমদানিকৃত পণ্যের দাম স্থানীয় মুদ্রায় বেড়ে যায়। সেটা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়।
এর সাথে সাথে আরেকটা সমস্যা হচ্ছে রিজার্ভ সমস্যা। আমাদের রিজার্ভের মাত্রা অনেক কমে গেছে। এটা ক্রমেই কমতে কমতে গত দুই বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন ২১ মিলিয়ন ডলারের সামান্য একটু বেশি আছে রিজার্ভ। এই রিজার্ভ কমার গতি রুখতে হলে এক দিকে যেমন রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। অন্য দিকে রেমিট্যান্স বাড়ানোরও চেষ্টা করতে হবে এবং যেসব বৈদেশিক সাহায্য আমরা পাই সেসব সাহায্য যথাসময়ে যদি ব্যবহার করতে না পারি তাহলে আমাদের রিজার্ভের উন্নতি হবে না। রিজার্ভের উন্নতি না হলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি তথা মূল্যস্ফীতি কমানো মুশকিল হবে।
বর্তমান অবস্থার উন্নতি না হলে আইএমএফ ঋণ দেবে কি না এটি একটি বড় প্রশ্ন।
আইএমএফ কী করবে সেটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। আইএমএফের তো বেশ কয়েকটি শর্ত ও বিষয় রয়েছে। একটি আছে রিজার্ভের বিষয়। রিজার্ভ ওদের চাহিদা অনুযায়ী আছে কি না ওরা দেখবে। রির্জাভের বিষয়টি আগে উল্লেখ করেছি। অন্য দিকে ট্যাক্স ও জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর একটি বিষয় তাদের অন্য আরেকটি বিষয়। ট্যাক্স ও জিডিপির অনুপাতে খুব বেশি প্রোগ্রেস হচ্ছে না আমাদের। যদিও বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আরেকটা হচ্ছে ব্যাংক খাতের ঋণ। যেটা ক্যাশ লোন। ক্যাশ লোন তো বিরাট অঙ্কের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে তথ্য প্রকাশ করে তার থেকেও অনেক বেশি। কাজেই আইএমএফ যদি সন্তুষ্ট হয় যে না ফলাফল খুব ভালো না হলেও সরকার তো অন্তত চেষ্টা করছে, এটা যদি সরকার কনভেন্স করতে পারে তাহলে আইএমএফ হয়তো সেকেন্ড ইনস্টলম্যান দিতে পারে। তবে থার্ড ইনস্টলম্যানে গিয়ে হয়তো আরো কড়াকড়ি করতে পারে।
ঋণ যদি না দেয় তাহলে অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঋণ না দিলে আগের যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো আরো প্রকট হয়ে উঠবে। ঘাটে ঘাটে সমস্যা বাড়তে থাকবে। রিজার্ভ আরো কমতে পারে। মূল্যস্ফীতিও আরো বাড়তে পারে। আর মূল্যস্ফীতি আরো বাড়লে সব জিনিস সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। রিজার্ভ আরো কমে গেলে অর্থনীতিতে চাপ আরো বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সামাল দেয়া কষ্টকর হবে।
বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি কৃষি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পেরেছি? না নিলে কী করা উচিত? এসব এখন আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে কৃষি উন্নয়ন নিয়ে।
কৃষি ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন ফার্টিলাইজার সাটসেটি, ফার্ম মেশিনের ক্ষেত্রে সাটসেটি, সিডের সাটসেটি ইত্যাদি। তবে কৃষিতে সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে পরিবেশ বা আবহাওয়ার ওপর অনেক কিছু নির্ভরশীল। আবহাওয়ার ওপর তো আমাদের কোনো কন্ট্রোল নেই। আবহাওয়া এবং খারাপ পরিবেশ আমাদের কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন খুব ব্যাহত করছে। যেমন- অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ভাঙন ইত্যাদি। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের নজর দিতে হবে আরো। আমাদের কৃষকদের সমস্যা সমাধানে যতœশীল হতে হবে। কৃষিঋণ আরো সহজ করে দিতে হবে। কৃষিঋণ উত্তোলন এবং পরিশোধ সহজ করতে হবে। কৃষি সরঞ্জামাদিও আরো আধুনিকায়ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি উন্নয়নে আমাদের কৃষিক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
