আনাস ক্লাস থ্রিতে পড়ে। শহরে থাকে। গ্রামের বাড়ি খুব বেশি যাওয়া হয় না।
এ জন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না সে।
আজ স্কুল ছুটি হলে আনাস স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিল। আসার সময় আকাশের দিকে তাকাতে লক্ষ করল। আকাশে কী যেন উড়ছে। লাল নীল রঙিন। দেখতে খুব সুন্দর।
কী এটা? কী এটা? ভাবতে ভাবতে বাসায় এলো।
আজ বাবা বাসাতেই আছে। বাসায় এসেই দৌড়ে বাবার কাছে গেল।
আব্বু আব্বু- আজ স্কুলথেকে ফেরার সময় দেখলাম আকাশে রঙিন কী যেন উড়ছে।
ওটা কোনো বিমান ছিল না। তুমি বলতে পারো ওটা কী ছিল? মামুন সাহেব বুঝতে পারলেন ওটা ঘুড়ি।
এখন গ্রামে ধান কাটা শেষ। বিকেল বেলায় মাঠে গেল। দেখা যায় আকাশে রঙবেরঙের ঘুড়ি উড়াচ্ছে ছেলেরা। এখন গ্রামের মেয়েরাও পিছিয়ে নেই।
সেই দেখেই হয়তো কারো বাসা থেকে কেউ উড়াচ্ছে।
-ওটা হলো ঘুড়ি। আমরাও ছোটবেলায় অনেক ঘুড়ি উড়াতাম বাবা।
কাজ ফেলে ঘুড়ি উড়াতাম বলে তোমার দাদু আমার উপর অনেক রাগ করতেন।
অনেকসময় মারও দিতেন।
আব্বুর কথা শুনে আনাসের ঘুড়ি উড়ানোর অনেক ইচ্ছে জাগল।
-আব্বু, আব্বু আমিও ঘুড়ি উড়াব। আমাকে একটি ঘুড়ি এনে দাও না?
-আচ্ছা ঠিক আছে তোমাকে ঘুড়ি এনে দেবো।
-কিন্তু ঘুড়ি কিভাবে উড়ায় আমি তো জানি না।
-ঠিক আছে তোমাকে শিখিয়ে দেবো।
আনাসের আম্মু কয়েক দিন থেকে গ্রামে যেতে চাইছিল।
সুযোগ হলেই বলছিল। চলো কিছু দিন গ্রামে বেড়িয়ে আসি।
আমাদের ধানও আনতে হবে। নতুন ধান কাটা হয়েছে।
মামুন সাহেব ভাবল-
তাহলে গ্রামে যেয়েই আনাসকে ঘুড়ি উড়ানো শিখানো যাক।
গ্রামের ধানক্ষেতে ঘুড়ি উড়ানোর আসল মজাটা পাবে।
মামুন সাহেব স্ত্রীকে ডেকে বললেন- চলো কালকে সকালে গ্রামের বাড়ি যাই।
গ্রামে বেড়িয়ে, আনাসকে ঘুড়ি উড়ানো শিখিয়ে, ধান নিয়ে আসা যাবে।
গ্রামে যাবে শুনে আনাস খুশিতে লাফিয়ে উঠল।
সবকিছু গুছিয়ে পরদিন সকালেই গ্রামে পৌঁছে গেল।
বাড়ির সামনে থেকে আনাসের ছোট কাকাকে জয় এগিয়ে নিয়ে গেল।
কাকাকে দেখেই আনাস দৌড়ে কাকার কোলে উঠল।
বাড়ি এসেই আনাস কাকার কাছে ঘুড়ি উড়ানোর বায়না ধরল।
আনাসের বাবা বললো তোর ভাতিজাকে ঘুড়ি উড়ানো শেখাব বলেই এবার গ্রামে আসা।
যে ক’দিন এবার গ্রামে থাকব তুই ওকে নিয়ে ঘুড়ি উড়াবি।
বড় ভাইয়ের কথা শুনে জয় আনাসকে সাথে নিয়ে বাঁশবাগানে গেল।
বাঁশবাগান থেকে কঞ্চি কেটে লেগে পড়ল ঘুড়ি বানানোর কাজে।
নতুন খাতার সাদা পাতা কেটে ঘুড়ি বানিয়ে সেই পাতায় গাছের পাতা ও ফুল-ফলের রস ঘসে। সবুজ, হলুদ ও লাল রঙে ঘুড়িটাকে রাঙিয়ে তুলল।
সবশেষে ঘুড়ির মাথায় বেতের তৈরি বাঁশি লাগিয়ে দিলো। ঘুড়ি বানানো শেষ। এবার উড়ানোর পালা। কিন্তু এখনো বিকেল হয়নি। প্রচুর রোদ বাতাসও কম। তাই অপেক্ষা করতে হবে।
কিন্তু আনাসের অপেক্ষা করা সহ্য হচ্ছিল না। বারবার কাকাকে বলছে চলো চলো এবার বাতাস বেড়েছে।
কিন্তু জয় জানে এই বাতাসে এত বড় ঘুড়ি উড়বে না।
তখন সময় কাটানোর জন্য আনাসকে বলছে- এত সুন্দর ঘুড়ি বানালে। এত বড় ঠিক যেন তোমার সমান।
তাহলে এত সুন্দর আর প্রথম বানানো ঘুড়িটা তোমার দাদু-দিদা, আব্বু আম্মুকে দেখাবে না?
আনাস- তাই তো। দৌড়ে বাড়ির ভেতর থেকে সবাইকে ডেকে নিয়ে এলো।
জয় ঘুড়ি উঠিয়ে আনাসের পাশাপাশি রাখল।
মামুন সাহেব স্মৃতিস্বরূপ মোবাইলে ছবি তুললেন।
এসব করতে করতে রোদের তীব্রতা কমে এলো। সাথে বাতাসের গতিও বেড়ে গেল।
অবশেষে এলো আনাসের ঘুড়ি উড়ানোর ক্ষণ। আনাস অনেক খুশি। মাঠে এসে দেখল গ্রামের অনেকেই ঘুড়ি উড়ানোর জন্য এসেছে।
আনাসকে দেখে সবাই এলো আনাসের কাছে।
আনাসের ঘুড়ি দেখে সবাই প্রশংসা করতে লাগল।
এত বড় আর এত রঙিন ঘুড়ি কারো হাতেই নেই।
এবার ঘুড়ি উড়ানোর সময়। জয় আনাসের হাতে ঘুড়ি ধরিয়ে দিয়ে বললো-
তুমি এভাবে ধরে রাখো। আমি সুতো ছেড়ে দূরে যাই।
যখন ছেড়ে দিতে বলব তখন উপরের দিকে ধাক্কা দিয়ে চলে আসবে।
আনাস ঘুড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রইল। জয় সুতো ছাড়ছে আর এগিয়ে যাচ্ছে।
আনাসের প্রথম ঘুড়ি উড়ানোর পুরো মুহূর্তটা মামুন সাহেব মোবাইলে ভিডিও করলেন।
অবশেষে জয় আনাসকে ডেকে বলল- উপরের দিকে ছেড়ে দাও আনাস?
আনাস উপরের দিকে ছেড়ে দেয়ার সাথে সাথে জয় সামনের দিকে দৌড় দিলো আর ঘুড়িটা পুনন.. করে বাজতে বাজতে উপরের দিকে উঠতে লাগল।
তাই দেখে আনাস খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।
আনাসের খুশি দেখে মাঠের সবাই খুশিতে হাততালি দিচ্ছে।
আনাস দৌড়ে কাকার কাছে এলো।
কাকার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে ধরে ঘুড়ি উড়াতে লাগল।
সুতো ছাড়তে ছাড়তে ঘুড়ি অনেক উপরে চলে গেছে।
আনাস দেখল ইয়া বড় ঘুড়ি এখন দেখতে একদম মার্বেলের মতো ছোট দেখাচ্ছে।
মাঝে মধ্যে যখন বাতাসের বেগ বাড়ে তখন বাঁশিও খুব জোরে বাজে। তখন ঘুড়ি ধরে রাখতেও অনেক শক্তি লাগে।
এভাবে ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে সন্ধ্যা হয়ে এলো।
কাকার সাথে আনাসও ঘুড়ি নামিয়ে বাড়ি চলে এলো।
এভাবেই আনাসের জীবনে প্রথম ঘুড়ি উড়ানোর আনন্দটা যেন সবার সারা জীবন মনে রাখার মতো স্মৃতিতে জমা হয়ে গেল।
আনাস ক্লাস থ্রিতে পড়ে। শহরে থাকে। গ্রামের বাড়ি খুব বেশি যাওয়া হয় না।এ জন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না সে।আজ স্কুল ছুটি...
