বিশ্বব্যাপী পালিত নানা জাতিগোষ্ঠীর উৎসবগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন হিসেবে মনে করা হয় বর্ষবরণ উৎসবকে। তাই বর্ষবরণের প্রাচীনতা ঐতিহ্যের ধারক। পৃথিবীর সব দেশে ও সব জাতির মাঝেই নববর্ষ পালনের রীতি বিদ্যমান। পুরনো বছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে আবারো আমাদের মাঝে চলে এলো আরো একটি নতুন বছর। উদয় হলো নতুন দিনের নতুন সূর্যের। পুরনোকে ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে নতুনকে স্বাগত জানানোর যে রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা-ই নববর্ষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বে যতগুলো অব্দ বিদ্যমান তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশে প্রচলিত অব্দ হলো খ্রিষ্টাব্দ। ৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে দিউনিসউথ প্রথম এ অব্দের প্রচলন করেন। তখন ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত (খ্রিষ্টাব্দে) বছরের প্রথম দিনটি পড়ত। বর্তমান বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে জানুয়ারির ১ তারিখকে নববর্ষ হিসেবে বরণ করে উৎসব আনন্দে মেতে ওঠে। আসলে প্রতিটি উৎসবই আসে আনন্দের বারতা নিয়ে, হোক তা আমাদের দেশীয় বা জাতীয় কিংবা অন্য দেশীয় বা বিজাতীয়।
আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-প্রবঞ্চনার হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে নবপ্রজন্ম নতুন বছরকে স্বাগত জানায় আগামী দিনের নতুন স্বপ্নে সোনালি প্রত্যাশার পাখা মেলে। তাই তো নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে- ‘বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও/ক্ষমা করো আজিকার মতো/পুরাতন বর্ষের সাথে/পুরাতন অপরাধ যত।’ কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন- ‘অনন্ত সূর্যাস্ত-অন্তে আজিকার সূর্যাস্তের কালে/সুন্দর দক্ষিণ হস্তে পশ্চিমের দিকপ্রান্ত-ভালে/দক্ষিণা দানিয়া গেল, বিচিত্র রঙের তুলি তার/বুঝি আজি দিনশেষে নিঃশেষে সে করিয়া উজাড়/দানের আনন্দ গেল শেষ করি মহাসমারোহে।
মানবমণ্ডলী সুপ্রাচীনকাল থেকেই কোনো না কোনো দিন-ক্ষণ, মাস-বছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চন্দ্র-সূর্য দেখে, হয়তোবা গ্রহ-নক্ষত্র দেখে অথবা রাত-দিনের আবর্তন ও ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোনো বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র, লগ্ন বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চন্দ্র সন নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চন্দ্র সনে বছর হয় সাধারণত ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় সাধারণত ৩৬৫ দিনে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, মানুষ যে দিন বর্ষ গণনা করতে শিখল সে দিন চাঁদের হিসেবেই শুরু করে বর্ষ গণনা। সূর্যের হিসাবে বা সৌর গণনার হিসাব আসে অনেক পরে। সৌর ও চন্দ্র গণনায় আবার পার্থক্য রয়েছে। সৌর গণনায় ঋতুর সাথে সম্পর্ক থাকে। বাংলাদেশে সুদীর্ঘকাল থেকে তিনটি দিনগণনা সন বা বর্ষের প্রচলন রয়েছে, আর তা হলো- খ্রিষ্টীয় সন, বাংলা বা বঙ্গাব্দ সন ও হিজরি সন। আবার এসব বর্ষ প্রচলনের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, মানুষ প্রথম দিকে চাঁদের হিসাবেই নতুন বর্ষ গণনা শুরু করে। চাঁদের হিসাবে ১০ মাসে বছর হতো। সেখানে ঋতুর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। সূর্যের হিসাবে বা সৌর গণনার হিসাব আসে অনেক পরে। সৌর ও চন্দ্র গণনায় আবার পার্থক্য রয়েছে। সৌর গণনায় ঋতুর সাথে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু চন্দ্র গণনায় ঋতুর সাথে সম্পর্ক থাকে না।
বর্ষপঞ্জিকা তৈরির বিষয়টি লক্ষ করা গিয়েছিল সুমেরীয় সভ্যতায়। মিসরীয়রা আবার জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাব-নিকাশে বেশ এগিয়ে। এই মিসরীয় সভ্যতাই পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডার আবিষ্কার করে বলে ধারণা করা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিসরীয় সে ক্যালেন্ডার নিয়ে করেছেন বিস্তৃত গবেষণা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা এ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয়। ইউরোপকে বলা হয় শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্গ। সভ্যতার সব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কিন্তু তারাই করেছে। আর এ দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল গ্রিক ও রোমানরা। রোমানরা আবার তাদের প্রথম ক্যালেন্ডার লাভ করে গ্রিকদের কাছ থেকে।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে ইংরেজি সাল বা খ্রিষ্টাব্দ অনুসরণ করি প্রকৃতঅর্থে তা হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। আর এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মূলত সৌর বছর। ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন। এই গ্রেগরির নামে এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এ. ডি লেখা হয় তা ল্যাটিন অ্যানো ডোমিনির সংক্ষিপ্ত রূপ। এই অ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভুর বছর অর্থাৎ খ্রিষ্টাব্দ। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রিষ্টান পাদ্রি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিষ্টের জন্ম বছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিষ্টাব্দ লিখন রীতি চালু করেন। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়।
আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপনের ধারণাটি আসে প্রায় ৪০০০ বছর আগে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। তখন মেসোপটেমীয় (বর্তমান ইরাক) সভ্যতার জনগণ প্রথম নতুন বছর উদযাপন শুরু করে। মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার আবার চারটি ভাগে বিভক্ত। যেমন- সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরীয় সভ্যতা ও ক্যালডীয় সভ্যতা। এদের মধ্যে বর্ষবরণ উৎসব পালন করা শুরু হয় ব্যবিলনীয় সভ্যতায়। সে সময় বেশ জাঁকজমকের সাথেই পালন করা হতো এই বর্ষবরণ। তবে সেটি কিন্তু এখনকার মতো জানুয়ারির ১ তারিখে পালন করা হতো না। তখন নববর্ষ পালন করা হতো বসন্তের প্রথম দিনে। বসন্তকালে প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠাকেই তারা নতুন বছরের শুরু বলে চিহ্নিত করেছিল। তখন তারা চাঁদ দেখেই বছর গণনা করত। যে দিন বসন্তের প্রথম চাঁদ উঠত, শুরু হতো তাদের বর্ষবরণ উৎসব, চলত টানা ১১ দিন। এই ১১ দিনের আবার আলাদা তাৎপর্যও ছিল। ব্যবিলনীয় সভ্যতার পর জাঁকজমক করে নববর্ষ পালন করা শুরু করে রোমানরা। প্রাচীন রোমের প্রথম সম্রাট রোমুলাসই ৭৩৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম রোমান ক্যালেন্ডারটি ছিল চন্দ্রকেন্দ্রিক এবং এতে মাস ছিল ১০টি। আর সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ ছিল ১ মার্চ। তা ছাড়া তাদের ক্যালেন্ডারে তারিখও ছিল না। পরে রোমান সম্রাট নুমা পন্টিলাস জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারিকে ক্যালেন্ডারে যোগ করেন। সমস্যা ছিল আরো, রোমানদের ক্যালেন্ডারে তারিখও ছিল না। ধীরে ধীরে চাঁদের বেড়ে ওঠার ছবি দিয়ে তারা মাসের বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করত। চাঁদ ওঠার সময়কে বলা হতো ক্যালেন্ডস, পুরো চাঁদকে বলতো ইডেস, চাঁদের মাঝামাঝি অবস্থাকে বলত নুনেস।
পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন ঘটান এবং একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন; যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। তিনি ক্যালেন্ডস, ইডেস, নুনেসের ঝামেলা শেষ করে বসিয়ে দেন তারিখ। ফলে বছরে মোট ৩৫৫ দিন হয়। যেহেতু চাঁদের হিসাবে প্রতি মাসে দিন হয় সাড়ে ২৯। আর তাই চাঁদের হিসাব করায় তাদের বছরে ১০ দিন কম থেকে গিয়েছিল। এভাবে বছর হিসাবের ফলে চাষিরা সমস্যায় পড়ে যায়। পরে অনেক চিন্তাভাবনা করে সম্রাট সিজার চাঁদের হিসাব না করে, সূর্য দিয়ে হিসাব করে বছরকে ৩৬৫ দিনে এনে এ সমস্যার সমাধান করেন।
জানুয়ারির ১ তারিখে নববর্ষ উদযাপন করার রীতিটি এসেছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হতে যেখানে বছরের শুরু হয় জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে। বিশ্বের যেসব দেশ এই ক্যালেন্ডারকে সিভিল ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা সবাই ইংরেজি নববর্ষ পালন করে থাকে। তবে অনেক দেশই ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করার আগে নববর্ষের রীতিটি গ্রহণ করেছে। যেমন- ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে স্কটল্যান্ড এবং ১৭৫২ সাল থেকে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটিশ কলোনিগুলো নববর্ষের রীতি অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু তারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে পরিচিত হয় ওই বছরের সেপ্টেম্বরে।
আধুনিক বিশ্বে নববর্ষ হিসেবে ১ জানুয়ারিকে প্রচলিত করার ব্যাপারে ‘রিপাবলিক অব ভেনিস (বর্তমানে বিলুপ্ত) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ তারা ১৫২২ সাল থেকে এ দিনকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণনা করতে শুরু করে। এরপর ১৫৫৬ সালে স্পেন, পর্তুগাল; ১৫৫৯ থেকে প্রুশিয়া, সুইডেন; ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স; ১৭০০ সাল থেকে রাশিয়া এই রীতি অনুসরণ শুরু করে।
অন্য দিকে ইংরেজি নতুনবর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন- ইসরাইল। দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। তবে ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। কারণ সে দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এই রীতি পালনের বিরোধিতা করে থাকে। আবার মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন- সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান, ইথিওপিয়া ও নেপাল। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।
পুরনো গ্লানি মুছে নতুনভাবে বাঁচার প্রত্যয়ে শুরু হয় নববর্ষ। যে কারণে উন্মাদনাও একটু বেশি থাকে নববর্ষকে ঘিরে। বিভিন্ন উৎসব পার্বনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই নতুন দিনে নতুন বছরে আমাদের অনেক চাওয়া-পাওয়া ও আশা-প্রত্যাশাও ব্যাপক। তার অনেকটাই পূরণ হবে আবার কিছুটা পূরণ নাও হতে পারে। তার পরও বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখতে হবে, স্বপ্ন দেখাতে হবে। কেননা সেই অধরা স্বপ্নই হয়তো লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। তাই আমরা স্বপ্ন নিয়েই এগোতে চাই। আজ যে নতুন অরুণোদয় হলো নতুন সকালের উদয় হলো সে সকাল জাতিকে আরো উজ্জীবিত দিন এনে দেবে- এটিই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
পরিশেষে নতুন বছরে কামনা, পুরনো বছরের ভুলগুলো শুধরে ইতিহাস থেকে ভালো ভালো শিক্ষা গ্রহণ এবং অতীতের সফলতা-ব্যর্থতাকে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমাদের সামনের দিকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। তার সাথে প্রত্যাশা রইল নতুন বছর সব ধরনের স্থবিরতা কাটিয়ে সবার জীবনে কল্যাণ বয়ে আনুক; আনুক শান্তি-সমৃদ্ধি-স্বস্তি। বাংলাদেশের মানুষ থাকুক সদা দুধে-ভাতে- এ প্রত্যাশা রইল আজকের এই দিনে; শুভ নববর্ষ ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ।
