তামাম সৃষ্টিজগৎ মানুষের নিমিত্তে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ এই বিশ্বচরাচর দেখে বিস্ময়বোধ করেছে। আর এই বিস্ময় থেকে প্রশ্ন এই জগৎ কেন সৃষ্টি হলো? কে এই জগৎ সৃষ্টি করল? মানুষের এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য দার্শনিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে দার্শনিক থেলিসকে বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। জগতের আদি সত্তা নিয়ে মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তবে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা এ নিয়ে গোলকধাঁধার ভেতর পড়ে গেছে। মানুষের কাছে সত্য পরিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও সবাই এক মতে আসতে পারেনি। স্র্রষ্টা আমাদের শিখিয়েছেন আমাদের সত্য ও সরল পথ দেখাও। ওদের পথ নয় যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট। অভিশপ্ত পথ ও পথভ্রষ্ট পথ থেকে মুক্তি সহজ নয় যদি না পরম সত্তা তার প্রতি অনুগ্রহ করেন। প্রগতিশীলতা জোর করে গেলানো যায় কিন্তু সত্য পথের পথিকদের বিভ্রান্ত করা যায় না। কারণ তারা আলো আঁধারির মতো অস্পষ্ট নয়; বরং প্রকাশ্য দিবালোকের মতো স্বচ্ছ। মানুষ দুনিয়ায় আসছে স্র্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে। তাকে জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। সে যদি শুধু বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সৃষ্ট হতো তাহলে দেবতাদের পর্যায়ে চলে যেত। আবার যদি শুধু জীববৃত্তি দ্বারা সৃষ্ট হতো তাহলে পশুপর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু মানুষ দেবতাও নয় আবার পশুও নয়। মানুষকে জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে দেয়া হয়েছে বিবেকবুদ্ধি যাতে সে সত্য পথ বেছে নিতে পারে। কিন্তু জগতের গোলকধাঁধায় পড়ে সে অস্পষ্ট ও ধোঁয়াশার ভেতর পড়ে প্রকৃত সত্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আদি সাম্যবাদী সমাজে মানুষ যখন দলবদ্ধ জীবনযাপন করত, তখন গুহার ভেতর বসবাস করত। গুহাবাসী মানুষ স্বপ্ন দেখত পাখির মতো আকাশে উড়তে এবং মাছের মতো সাঁতার কাটতে। মানুষ আজ পাশ্চাত্যের অন্ধকার থেকে দূরে সরে আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠেছে। তারা ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার স্থলে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা দ্বারা চালিত হচ্ছে। যার কারণে মহাগ্রন্থ’ ও তার অনুসারীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা বস্তুবাদী সমাজ। জীবন দর্শন মানুষ আজ অন্ধকারে হাতড়ানোর মতো নয়; বরং প্রকাশ্য রচিত মতাদর্শে চালিত। জগতের আদি সত্তা বস্তু না চেতনা এটি নিয়ে দ্বন্দ্বের ভেতর পড়ে গেছে। বস্তুবাদীদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা এখানে জন্মায় এখানেই মারা যায়। আমাদের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের কল্পনা হাস্যকর। কিন্তু তারা নগদ যা পাও হাত পেতে লও বাকির খাতা শূন্য থাক। অথবা যাবৎ জীবৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কত্তা ঘৃতং পিঠেৎ। অর্থাৎ যত দিন বাঁচ সুখে বাঁচ, ঋণ করে হলেও ঘি খাও। মানুষের ভেতর এই শিক্ষার দানা বেঁধে গেছে চরমভাবে বলে মনে হয়।

মানুষের জীবনের সঙ্কটের শেষ নেই। মানুষ যখন চরম নৈতিক সঙ্কটে পড়ে গেছে তখন অর্থনৈতিক সঙ্কট তাকে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাদের মুখে মানবতার সুর শোনা যায়। অথচ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে তারা শীর্ষে। এই শ্রেণীর মানুষ সত্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। কারণ সত্যের শিক্ষা মানবতাবাদী হতে শিক্ষা দেয়। আমরা যদি আংশিক সত্য-মিথ্যার ভেতর থেকে যদি জগতকে দেখি তাহলে মানুষের প্রকৃতি রূপের জ্যোতি থেকে মুক্ত থাকতে দেখা যায়। মানুষের মিথ্যার চর্চার কারণে মানবতা পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চলেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং গ্লোবালাইজেশনের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের একচেটিয়া প্রভুত্ব লক্ষ করা যায়। যার কারণে অনুন্নত দেশগুলো চরমভাবে ধরাশায়ী হচ্ছে। তারা ভিসামুক্ত আন্দোলন আর পছন্দ করে না। তারা উৎপাদন দ্রব্যসামগ্রী অনুপ্রবেশে যত বিশ^াস করে তার চেয়ে কম বিশ্বাস করে দক্ষ শ্রমিক অনু প্রবেশকে? যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে টপ ও আন্ডার ডগ। যার ফলে বৈষম্যে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী।

মানুষের ভেতর থেকে দয়ামায়া ভালোবাসা বিদায় নিতে চলেছে। পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধ মানব জাতিকে হতভম্ব করে ফেলেছে। প্রথম বিশ^যুদ্ধে নিহত হয়েছিল চার কোটি ১৪ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ। সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল ৩২০ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নিহত হয়। সম্পদ নষ্ট হয় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। মানুষের হাতে যে পরিমাণ অস্ত্র মজুদ আছে তার দ্বারা পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করা যায়। একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিশারদ বলেছেন, ২০৯৯ সালের দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে একটি সস্তা কম্পিউটার পৃথিবীর সব মানুষের কয়েক কোটিগুণ বেশি স্মৃতিসম্পন্ন হবে। আবার কম্পিউটারের মাধ্যমে চাপ দেয়ার মাধ্যমে এক শহর মানুষকে দুনিয়া থেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করা সম্ভব। এ ধরনের যন্ত্রের সাথে মানুষের আচরণ কেমন হবে তা মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আজ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে বিশে^র মানুষ হতভম্ব। এ যুদ্ধ বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তি দেখা যাচ্ছে না। মানুষ নামক স্বগোত্রীয় জীবকে এভাবে আমরা মরতে দিতে পারি না। তার জন্য জাতিসঙ্ঘের শক্তি বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে বিশ্ব। নইলে এক জাতির ইশারায় ওপর নির্ভর করবে মানব জাতির ভবিষ্যৎ। বিশ^ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ কার কাছে যাবে। সঙ্ঘাত, বৈষম্য, হানাহানি, কাটাকাটি ও আগ্রাসন জাতিগত নিপীড়ন থেকে কিভাবে বিশে^র মানুষ মুক্ত থাকবে তার জন্য দার্শনিক সমাজের এগিয়ে আসা জরুরি। যারা হবেন সত্যের ধারক-বাহক। মানুষকে সত্য শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে সে মানবিক এবং সুন্দর হয়ে উঠবে। মানুষ শুধু জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা গঠিত নয়; বরং মানুষকে দেয়া হয়েছে উন্নত নীতি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষা। তাকে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত করেছে। তাই রূপান্তরিত যারা হয়েছে তারা হলো মানুষ জাতির আলোকবর্তিকা ও সৌভাগ্যবান। তাদের দ্বারাই বিশ^ শান্তির পথ সুগম হবে। মানুষ যদি উগ্রবস্তুবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক হীন স্বার্থ, ধর্মীয় উগ্রতা, ক্ষমতায় উগ্র আকাক্সক্ষা, বুদ্ধিজীবীদের পক্ষপাতিত্ব সামাজ্যবাদ, প্রতিহিংসা দ্বারা চালিত হয় তাহলে বিশে^র বুক থেকে শান্তি বিদায় নেবে, এটি স্বাভাবিক। মানুষকে তাই এ ধরনের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ^কে শান্তির লীলাভূমিতে পরিণত করতে হবে। নববর্ষে শান্তিময় পৃথিবী প্রতিষ্টিত হোক এই কামনা করি। তবেই সে মানুষ হিসেবে মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তাই বলতে ইচ্ছে হয়- সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি/এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোন এক মিলনের বাঁশি/একজনে দিলে ব্যথা/সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা/একের অসম্মান/নিখিল মানব জাতির লজ্জা সকলের অপমান!