সময় বহমান। বহমান সময়কে ভাগ ভাগ করে আদিকাল থেকে মানুষ সময় হিসাব করে আসছে। জানা গেছে, সময়কে ভাগ করে হিসাব করা শুরু হয়েছিল গ্রিক সমাজে। গ্রিকদের আগে কেউ সময়কে হিসাব করত কি না তা জানতে পারিনি। সময় হিসাব করার গ্রিক পদ্ধতির উৎস ছিল চন্দ্র ও সূর্য। বিশেষ করে চন্দ্রের ক্রম হ্রাস ও বৃদ্ধিকে অবলোকন করে গ্রিকরা সময়সীমাকে নির্ধারণ করত। গ্রিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহাপুরুষ ছিলেন সক্রেটিস (৪৬৯-৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব)। সক্রেটিসকে জ্ঞান, দর্শন ও চিন্তার জনক বলা হযেছে। সক্রেটিস একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন এবং তিনি মূর্তিপূজা থেকে নিজেকে বিরত রাখতেন; যদিও সক্রেটিসের বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভাস্কর। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি এথেন্সের প্রচলিত দেবতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন এবং যুবকদের বিভ্রান্ত করছেন। সক্রেটিস এথেন্সের কবিদের ‘প্রকৃত অজ্ঞ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, কবিরা স্রষ্টা প্রদত্ত শক্তি ও প্রেরণা থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করেন, জ্ঞান থেকে নয়। অর্থাৎ সক্রেটিস ভাবতেন, কবিরা স্রষ্টা প্রদত্ত শক্তি এবং প্রেরণাকে চিন্তা ও জ্ঞানে রূপান্তরিত করতে পারেন না। সক্রেটিস শিল্পীদের ব্যাপারেও মন্তব্য করেন। তিনি মনে করতেন, শিল্পীরা এমন অনেক বিষয়ে জানেন না; যা তিনি (সক্রেটিস) নিজেও জানেন না। কিন্তু শিল্পীরাও কবিদের মতো সব ব্যাপারে নিজেদের চরম জ্ঞানী মনে করত; আর এই মনে করাটাই তাদের প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে রেখেছিল। এথেন্স সমাজে প্রচলিত চিন্তা, বুদ্ধি ও বুদ্ধিদাতাদের ব্যাপারে সক্রেটিসের এই বিরূপ মন্তব্য সমস্ত এথেন্সবাসীকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। ফলে নতুন জ্ঞান ও চিন্তার উদ্ভাবক সক্রেটিসকে এথেন্সের প্রশাসকরা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হলে তিনি এথেন্সের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়ে বলেছিলেন; সত্যের প্রকাশ ও তার ওপর দৃঢ় থাকতে গিয়ে আমার আগে অনেককেই নিধন করা হয়েছে। আর আমিই যে শেষ নিধন তা-ও নয়। আমার পরেও সত্য প্রকাশককে নিধন করা হবে। সক্রেটিসের এই মন্তব্য পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের সাথে মিল রাখে। সক্রেটিস অযৌক্তিক কিংবা অন্তসারশূন্য চেতনা ও জীবনাচরণকে বরদাশত করতেন না। এর মধ্যে নতুন বছরকে গ্রহণ করার আচরণও ছিল। সময়কে স্বাগত জানানোর যে আচরণ সেই আচরণ এবং কাল নিরূপণের এথেন্সীয় বিশেষ জ্ঞান ও তার প্রকাশপদ্ধতি এথেন্স থেকে ব্যাবিলনেও যাত্রা করে এবং ব্যাবলদেরকে প্রভাবিত করে। এরপর ব্যাবলরাও চন্দ্রের ক্রম হ্রাস ও বৃদ্ধিকে সময় মাপের পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করেছিল। সময় মাপার নব্যযন্ত্র ঘড়ি উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত মানুষ চন্দ্র-সূর্যকেই সময় গণনার পরিমাপক করেছিল। অবশ্য আরো একটি উপায়ে মানুষ সময় নির্ধারণ করত; তা হলো কোনো কিছুর ছায়া দ্বারা। ছায়াও নির্ধারিত হতো সূর্যের আলোর সাহায্যে। সূর্যের আলোর সাহায্যে ছায়ার অবস্থান পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ব্যাবলরা। এই পদ্ধতিতে সময় মাপার এই ধারণার নাম সূর্যঘড়ি। সূর্যঘড়ি দিয়ে দিনের সময় নির্ধারণ করা গেলেও রাত্রীকালীন সময় নির্ধারণ করা যেত না। এরপর মোমঘড়ি তৈরি করা হলো সূর্যঘড়ির আইডিয়া থেকে। মোমবাতি প্রজ্বলনে যে ছায়ার উদ্ভব হয় তার মাধ্যমে রাতের সময় নির্ধারণ করা যেত। লম্বা সময়গুলো অর্থাৎ সপ্তাহ, মাস ও বছর নির্ধারিত হতো চন্দ্র-সূর্য অনুসারে। ব্যাবলরা বসন্তের প্রথম দিনকে বছরের পয়লা দিন নির্ধারণ করেছিল। চাঁদ দেখেই তারা এই দিন ঠিক করে নিয়েছিল। এই দিন থেকে ১১ দিন পর্যন্তু চলত তাদের বর্ষবরণের উৎসব। এই ধারা রোমানদেরকেও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। রোমান উপখ্যান মতে রোমের প্রথম সম্্রাট রোমুলাসই (৭৩৮ খ্রিষ্টপূর্ব) কালে চাঁদ দেখে ১ মার্চ নতুন বছর শুরু করতেন। এরপর সম্রাট জুলিয়াস সিজার বছর গণনার তারিখ আবারো নির্ধারণ করেন এবং ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি বর্ষপুঞ্জি সংস্কার করেন। তার নামানুসারে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়। এই ক্যালেন্ডার মোতাবেক ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিন নির্ধারিত হয়। গ্রেগরীয় এই ক্যালেন্ডার ব্রিটেনে চালু হয় ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। ব্রিটিশ কলোনির তত্ত্বাবধানে এই বাংলাদেশেও সেই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করার রেওয়াজ প্রচলিত। ক্যালেন্ডারের পাতা আর মানুষের জীবনাচরণ এক নয় এবং ক্যালেন্ডার নিয়ে খুব একটা আপত্তিও লক্ষ করা যায় না। তবে ক্যালেন্ডারের সন্ধিক্ষণের যে জীবনাচরণ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেটা নিয়ে যথাবিস্তর আপত্তি রয়েছে এবং সেখানে নির্বুদ্ধিতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; যা মানুষকে ভেতর থেকে সাংঘর্ষিক অথবা আত্মঘাতী করে তুলেছে।
সময় মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সময় এই জন্য সম্পদ যে, সময় মানব জীবনের সাফল্য ও উন্নতি-অবনতির সোপান। জ্ঞানেরও মৌলিক উপাদান সময়। সময়ের শুরুটাকে আনন্দ-ফুর্তির মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারার মানে এই নয় যে, আগত দিনে সময় মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। বরং সময়ের সন্ধিক্ষণে নিজের পুনর্মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। কেউ যদি বিগত ও আগত সময়ের সন্ধিক্ষণে বসে নিজের কৃতকর্মের মূল্যায়ন করতে স্থিত হয়, তবে তারপক্ষে সন্ধিক্ষণের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণে ফুর্তি করা অসম্ভব। অথচ মানুষ সময়ের শুরুটাকে স্বাগত জানাতে উৎসবে মেতে ওঠে আর সেই উৎসবে সেটাই করে, যা তার করা জরুরি ছিল না। থার্টিফাস্ট নাইট এর যে ধারণা মানুষ পোষণ ও পালন করে, সেটি অমূলক ব্যতীত কিছু নয়। কিছু মানুষের ধারণা থার্টিফাস্ট নাইট উদযাপনের মধ্য দিয়ে আগত সময় সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হয়ে ওঠবে। কিংবা বিগত দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা। মানুষের এই ধারণাটা নির্বুদ্ধিতাকে বেগবান করে। কেননা সময়ের নিজের এমন কোনো সক্ষমতা নেই যা দিয়ে মানুষের ভাগ্যকে সময় বদলে দিতে পারে। কিংবা বিগত দিনের ব্যর্থতাকে ভুলে দিতে পারে। মানুষের কাছে সাফল্য ধরা দিতে পারে কিংবা পারে না, যদি মানুষ সময়ের সাথে সাথে নিজের কর্মকে পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্প্রসারিত করতে পারে অথবা পারে না। কাজকে উপেক্ষা করে সাফল্য প্রত্যাশা করা নির্বুদ্ধিতা। মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তি-বুদ্ধিতে একটা পর্যায়ে এসে মনে করছে, পৃথিবীতে মানুষ এখন অনেক যৌক্তিক জ্ঞানসম্পন্ন বুদ্ধিমান জাতি। অথচ সেই মানুষ এখনো কল্পনানির্ভর হয়ে থার্টিফাস্ট নাইট উদযাপনের মতো একটা অকাজ ও অযৌক্তিক অন্তঃসারশূন্য দর্শনকে প্রতিপালন করছে। অগ্রবর্তী এই মানুষদের নির্বুদ্ধিতা ও খেয়ালিপনার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, তারা সময় গণনার পদ্ধতিকে ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি মনে করছে। এমন সব খেয়ালিপনা ও নির্বুদ্ধিতারই সমালোচনা করেছিলেন দর্শনশাস্ত্রে অগ্রগামী পুরুষ সক্রেটিস। বহুদেবত্ত্ববাদী মূর্তিপূজক এথেন্সকে নির্বুদ্ধিতা ও খেয়ালিপনার নিকষ অন্ধকার থেকে বের করতে চেয়েছিলেন তিনি। সক্রেটিসের কারণেই এথেন্সকে জ্ঞানের সূতিকাগার বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেই এথেন্সেই সক্রেটিসকে উপক্ষো করা হয়েছিল। ফলে নির্বুদ্ধিতা ও খেয়ালিপনায় মোড়ানো থার্টিফাস্ট নাইট ধারণার মতো আরো কিছু অন্তঃসারশূন্য ধারণার বিস্তার ঘটেছে পৃথিবীতে।
এথেন্সবাসী সময় গণনার আইডিয়াটা নির্ধারণ করে নিয়েছিল চন্দ্র ও সূর্যের বৈশিষ্ট্য দেখে, সে কথা আমরা আগেই বলেছি। চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে সময় নিরূপণের যে বৈশিষ্ট রয়েছে সে কথা বলা হয়েছে পবিত্র কুরআনেও। কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ১২ নম্বর আয়াতে; আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- ‘আমি রাত ও দিনকে দু’টি নিদর্শন করেছি, অতঃপর নিষ্প্রভ করে দিয়েছি রাতের নিদর্শন এবং দিনের নিদের্শনকে দেখার উপযোগী করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর এবং যাতে তোমরা স্থির কর বছরগুলোর গণনা ও হিসাব এবং আমি সব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি’। আবার সূরা বাকারার ১৮৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তোমার নিকট তারা জিজ্ঞাসা করে, নতুন চাঁদের বর্ধিষ্ণু দশাগুলোর বিষয়ে; বলে দাও যে, এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজের সময় ঠিক করার মাধ্যম’। কাজেই নিরবচ্ছিন্ন বয়ে চলা সময়কে ভাগ করে করে গণনা করার পদ্ধতিতেই জন্ম নিয়েছে নতুন বছরের ধারণা। এই ধারণা কোনোভাবেই ভাগ্য উন্নয়ন ও অবনতির সাথে সামঞ্জস্য রাখে না। অতএব খেয়ালিপনার এই উৎসবে মেতে যুবকরা যে বিভ্রান্ত হচ্ছে; তা হতে দেয়াও এক ধরনের খেয়ালিপনা বই অন্য কিছু নয়।
