দিন শেষে ক্লান্ত সূর্যটা তার ক্ষীণ আলোকরশ্মিগুলোকে সম্বল করে আছে। ধীরে ধীরে পশ্চিম দিগন্তে ছোপ ছোপ লালিমায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। এ দৃশ্য দেখে মাঠে খেলতে থাকা শিশুদের চোখ মুখ বেয়ে উপচে পড়ে আনন্দ। হাঁটতে হাঁটতে আমি মসজিদের পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া পাকা রাস্তা পার হয়ে নিচে নেমে পড়ি। ধানক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে চলেছি প্রকৃতির সাথে কিছু সময় একাত্ম হতে। শীতের বিকেল। নরম রোদ গায়ে মেখে হাঁটতে ভালোই লাগে। উত্তর দিক থেকে আসছে হালকা হিম-শীতল সমীরণ। একাকী হাঁটছি। দেহ-মনে বয়ে যাচ্ছে প্রশান্তির এক হিল্লোল। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলি জমি। সবুজের চরাচর। সবুজের এ দৃশ্য জীবন সজীব করে। মন করে শীতল। ঝিরিঝিরি বাতাসে অবারিত মাঠে ধানের শীষগুলো আন্দোলিত হচ্ছে মৃদুভাবে। দিনশেষে উদরপূর্তি করে পাখিরা নীড়ে ফিরছে। নীড়মুখী পাখিদের ডানা ঝাপটানো দৃশ্য প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলছে, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো। গোধূলির রহস্যময় সৌন্দর্য। রক্তমাখা পশ্চিম দিগন্ত। তেজি সূর্যটা নুইয়ে পড়ার দৃশ্য। খানিক বাদেই সূর্য গুটিয়ে নেবে তার আলোর চাদর। দিগন্ত ছুঁয়ে যাবে রাতের নিকষ কালো আঁধার। বাতাসে গাছের পাতাগুলো এদিক-ওদিক দুলছে। শীতের শিশিরভেজা সন্ধ্যায় আবহমান বাংলার প্রকৃতি মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। গাঁয়ের কৃষকরা যে যার মতো করে বাড়ি ফিরছে। রক্ত-ঘাম এক করে জমিতে শীতের মৌসুমি ফসল রোপণ করেছেন তারা। কেউ সবজি কেটে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। পরের দিন সকালে হাটে বিক্রি করবে। কেউ বা আবার গরুর জন্য ঘাস কেটে মাথায় করে বাড়ি ফিরছে। তাদের মুখে সহজ-সরল হাসি। আমি সালাম দিয়েছি তাদের। তারাও সালামের জবাব দিয়েছেন। প্রকৃতির এমন পরিবেশে যে কারো ভালো লাগবে। আমি আনমনে হেঁটে চলেছি, হঠাৎ দেখি ধানক্ষেতে সুন্দর একটি প্রজাপতি বসে আছে। নাম তার বহ্নিলতিকা। ইংরেজি নাম ঞধহিু ঈড়ধংঃবৎ প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম অপৎধরধ ারড়ষধব ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো যেন তার অমর আত্মা। আমি প্রজাপতিটিকে একটা কৌতূহল নিয়ে দেখতে থাকলাম। বারবার উড়ে উড়ে যেন অন্তিম প্রেরণার সন্ধান করছে। এ প্রজাপতি সচরাচর দেখা মিলে সব জায়গায়। তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বহ্নিলতিকা হরিণছাড়া নামে পরিচিত। এ প্রজাপতি বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। বহ্নিলতিকার ডানার বিস্তার ৫০ থেকে ৬৫ মিলিমিটার। পুরুষের ডানার ওপরের অংশ গাঢ় কমলা বা ইট-লাল, স্ত্রীর ক্ষেত্রে যা খয়েরি হলুদ। সামনের ডানার পার্শ্বপ্রান্ত বরাবর একটি কালো ফিতের ওপর সাদা সারি দেখা যায়। দুই ডানার খোপ ও মধ্যাঞ্চলে কালো বিন্দু রয়েছে। পুরুষের ডানার নিচের দিকে সামান্য মাছের মতো কমলা, স্ত্রীর ক্ষেত্রে যা ফ্যাকাশে খয়েরি হলুদ। দুই ডানার নিচের দিকেও একই রকমের কালো দাগের ছোপ রয়েছে। পেছনের ডানার নিচের দিকে বিস্তৃত কালো আঁচলের ওপর এক সারি বড় ও সুস্পষ্ট সাদা বিন্দু থাকে। ডানা ঝাপটায় ধীরে ধীরে, মাটির কাছাকাছি ওড়ে। শিকারি প্রাণীরা এর ওপর হামলে পড়ে না। কারণ খেতে অরুচিকর। তবে কখনো শিকারি প্রাণীর কাছে ধরা পড়লে মৃতের মতো পড়ে থাকে এবং পায়ের সন্ধির গ্রন্থি থেকে বাজে গন্ধযুক্ত হলুদাভ তৈলাক্ত তরল পদার্থ নিঃসারণ করে। এদের ডিম জলপাই আকারের। এই বহ্নিলতিকা প্রজাপতির জীবন পাকে ৩২ থেকে ৪৭ দিন।