দুই চার গাঁয়ের এমন কোনো মানুষ নেই যে নিরু মামাকে চিনে না। নতুন নতুন ঘটনা সামনে এনে নিরু মামা সবার মনই জয় করে নিয়েছে। কিশোরদের নতুন উৎসাহ মানেই নিরু মামা। লোকটা ভীষণ ভালো। সহজ-সরল। সবার সাথে মিশতে পারার বিরাট একটি গুণ আছে তার। সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কারুর প্রয়োজনে নিরু মামা কোনোদিনই না করতে শিখেনি। তার কথা হলো এক জনমে যত মানবসেবা করা যায় ততই মঙ্গল। মরে গেলে তো এসব করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে সবাই জানে নিরু মামা ভূত নিয়ে ব্যাপক কাজ করছে। ভূতে আছর করা রোগীদের নিয়মিত সেবা দিচ্ছে। ভূত আটক করে গ্রামবাসীর বিপদ মুক্ত করছে।
বহু গুণে গুণান্বিত এই নিরু মামা ক’দিন থেকে আরো একটা নতুন কাজ করছে। সাকিব ও তার বন্ধুরা নিরু মামার এই কাজে খুব উৎসাহিত। নিরু মামা নিজের মুখে বলেছে সে একটি ভালো ভূতের ছানাকে লালন-পালন করে বড় করছে। ভূতনী না-কি বাচ্চাটা রেখে মারা গেছে। আর বাবা ভূত কোথায় না-কি নিরুদ্দেশ হয়েছে। ছানাটিকে দেখে তার খুব মায়া লেগেছে। তাই সে এই ভালো কাজটি হাতে নিয়েছে।
শহর থেকে নদীর দিকে বড় একটি ড্রেন নেমে গেছে। ড্রেনের পাশে ল্যাম্পপোস্ট। আর ল্যাম্পপোস্টের গোড়ার কাছে ড্রেনের ঢাকনা সামান্য ফাঁকা। বাকিটা সম্পূর্ণ ঢাকনা দেয়া। বর্ষাকালে এই ড্রেন দিয়ে শহরের পানি নামে নদীতে। এখন শীতকাল বৃষ্টি নেই। তাই ঢাকনার নিচের ড্রেনটাও এখন শুকনা।
আজ কয়েক দিন থেকে নিরু মামা এই ল্যাম্পপোস্টের গোড়ার ফাঁকা অংশের কাছে বেশ সময় দিচ্ছে। কখনো সকালে। কখনো বিকেল অথবা রাত অবধি! আজো সে বড় বড় দু’টি শোল মাছ নিয়ে ওই জায়গায় যাচ্ছে। এমন সময় রাকিবের সাথে দেখা।
-মামা, কোথায় যাচ্ছ?
-যদি ভয় না পাস তবে একটা ভালো খবর আছে।
- কী খবর মামা!
- ভালো ভূতের ছানাটাকে খাবার দিতে যাচ্ছি। এতিম বাচ্চা।
-কী বলছ মামা! তার মানে!
-হ্যাঁ তাই বলছি। সাকিবের কাছে শুনিসনি? এই খবর তো বেশ কয়েক দিন আগের খবর। ভূতের ছানাটার আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুই কোথায় যেন যাচ্ছিস যা। তোদের সবাইকে বলিস কাল রাতে ভূতের ছানাটা দেখাব।
এই খবরটা রাকিব শুনেনি। তাই কথা না বলে ভয়ার্ত মনে হনহনিয়ে চলে গেল। তবে আগ্রহের মাত্রা বেড়ে গেল। সে তাই প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে নিরু মামার এই খবর সব বন্ধুকে বলে তবে ঘরে ফিরল। ছানা
পরের দিন রাতে সবাই হোমওয়ার্ক শেষ করে নিরু মামার পিছু ধরল। নিরু মামা দু’টি পাঙ্গাশ মাছসহ সবাইকে নিয়ে ওই স্থানে গেল। একটু দূরে ভাগিনাদের দাঁড় করিয়ে রেখে সে মাছ দু’টি রেখে আসল ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায়। কী আশ্চর্য ব্যাপার নিরু মামা সরতে না সরতেই ছায়ামূর্তির মতো কি একটা যেন ওই ভাঙা অংশ দিয়ে বের হলো। মাছ দু’টি নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ড্রেনের ভেতরে চলে গেল। সত্যিই ভূতের ছানা! যদি তাই না হবে তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে কেমনে লুকালো!
সবাই ভূতের ছানা দেখল। হইচই পড়ে গেল। লোক জমায়েত হলো। কেউ বিশ্বাস করল। কেউ হেসে পাশকাটিয়ে চলে গেল।
পরের দিন বিকেলে নিরু মামা ও তার ভাগিনাদের নিজের কার্যালয়ে ডাকলেন মেয়র সাহেব। সেখানে তখন অনেক মানুষের ভিড়। মেয়র সাহেব নিরু মামাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুই হাজার টাকা ও একটা ক্রেস্ট হাতে তুলে দিলেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বললেন-নিরু যে কাজগুলো করছে তা প্রশংসনীয়। সে জনসেবার পাশাপাশি একটা ভোঁদড়ের ছানাকে বাঁচাতেও কম পরিশ্রম করেনি।
মেয়র সাহেবের মুখের ভোঁদড়ের ছানা শব্দটা সবাই ভূতের ছানা হিসেবে শুনল। নগদ টাকা আর ক্রেস্ট পাওয়ায় নিরু মামা ও ভাগিনাদের কী যে উৎসাহ! আবারো সবাই জানল নিরু মামা মানে শুধুই নিরু মামা। ভূত লালনপালন করে পৃথিবীতে একমাত্র এই নিরু মামাই পুরস্কার পেল!
তবে এই কথা কেউ জানতে চাইল না যে, ভোঁদড়ের ছানাটি নদী থেকে ড্রেনের ভেতরে ঢুকে আটকে গিয়েছিল। বেরোতে না পারার কারণে খুব খারাপ অবস্থা হয়েছিল। নিরু মামা এই পথে যাওয়ার সময় এটিকে আবিষ্কার করে। সে-ও জানত না। ভাগ্যিস ক্ষুধার তাড়নায় নিরু মামার হাত থেকে ছুঁ মেরে মাছ নিয়ে ছানাটি পালিয়ে ছিল। নিরু মামা পরের দিন থেকে ছানাটিকে এভাবে মাছ দিয়ে সাহায্য করে আসছিল। অতঃপর ভাগিনাদের এখানে নিয়ে এসে এই ভূত দেখানো। দেখার পর নিরু মামা ও ভাগিনাদের চাঞ্চল্যকর হইচই। রাতে এই হইচইয়ের খবর পৌঁছায় মেয়র সাহেবের কানে। মেয়র সাহেব ও তার প্রশাসন ভোঁদড় ছানাটিকে উদ্ধার করে রাতেই অবমুক্ত করেন। ভালো কাজ করার জন্য পুরস্কৃত করেন নিরু মামাকে।
দুই চার গাঁয়ের এমন কোনো মানুষ নেই যে নিরু মামাকে চিনে না। নতুন নতুন ঘটনা সামনে এনে নিরু মামা সবার মনই জয় করে নিয়েছে। কিশোরদের...
