- হাসান আলীম
এই সেই নিঝুম বাগানে পথ
এই সেই নিঝুম বাগানে পথ-
পঞ্চাশ বছর আগেকার ছোট্ট সরু মেঠোপথ,
দুই পাশে ঝোপঝাড়, গভীর জঙ্গলময়, অশ্বত্থের, ঝাউ বীথি,
কেয়া আমলকী, নারকেল সুপারির ঘন সবুজ শ্যামলে ঢাকা
পাখপাখালির কিচিরমিচিরে ঘুঘু হরিয়ালে
ভরপুর হৃদয়ের আনন্দ বিতান শ্রীনগর বাবুবাড়ির দীঘল সড়ক-
এই পথে হেঁটে হেঁটে আমি চলে গেছি ময়েনদিয়া বাজার পার হয়ে
শ্রীনগর প্রাইমারী স্কুল আঙিনায়-
এই পথে কত হেঁটেছেন রামকানাই শা’, মুকুন্দ ডাক্তার,
হেঁটেছেন হাজী ইসরাইল মিয়া,
আরো কত যে হেঁটেছিলেন অনাথ বন্ধু কর্মকার,
অতুল চন্দ্র খা, হরিপদ ভট্টাচার্য স্যার-
আহা, তারা কী যে আনন্দে আমাকে শোধাতেন,
কেমন আছো হে, তুমি!
পথের দক্ষিণ কোণে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকেছে আমার একান্ত বন্ধু,
সহপাঠী সুশীল কুমার কর্মকার, কী যে আনন্দ পায়রা উড়ে যেত।
এই সেই পথ এখনো কুয়াশা ভাঙা ভোরে হেঁটে যান অনেকেই-
কুমারের তীরে বাজার মসজিদের নিকটে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে
কখনো কখনো চেলে যেতাম ওপারের স্কুলে!
ও পথে মাঝে মাঝেই দেখা যেত দীর্ঘাঙ্গী সৌম প্রশান্ত মানুষ
এক ভীষণ দয়ার্দ্র আজিজ মুনসী হাজী সাহেবের
যাওয়া আসার ব্যতিব্যস্ত ছায়াছবি!
পতেঙ্গার চাঁদনী হাসির মতো মাজেদ স্যারের পুলকিত মুখ,
গাম্ভীর্যের সনাতনী চেহারার সন্তোষ গুহ স্যারের হাসি
অথবা কখনো ঘ্রাণমাখা ঘাম-গন্ধী কালীপদ স্যার--
আমি আর হারুনর রশীদ, সিরাজ কখনো কখনো
নীরে সাহার প্রাণখোলা হাসি নিয়ে
কী যে মাতামাতি করেছি বিদ্যায়তনের প্রশস্ত হৃদয়ে--
কুমার নদীর ভাপ লেগে থাকতো আমার বিষণœ চোখে
আমি আকুল হৃদয়ে কী যেন চলেছি খুঁজে!
পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা,
সেই স্বর্ণময় সড়কের আবাহন সহোদরা ফরিদা চন্দনা আর
সাধনা ঘোষের সে কী মায়াময় আদুরে চোখের নিভৃত নিবাস!
- নির্মলেন্দু গুণ
ইসক্রা
সূর্য তো অস্ত যায় না,
পৃথিবী ফিরিয়ে নেয় মুখ।
আমরা বলি অস্ত গেছে সূর্য।
সত্য সে-ও সূর্যের মতন,
আপন ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আছে স্থির।
আমরাই সত্য থেকে মাঝে মাঝে
ফিরিয়ে নিই মুখ।
- মহাদেব সাহা
টিকিট
আমি ট্রেনের টিকিট পেলে লঞ্চঘাটের দিকে দৌড়াই,
প্লেনের টিকিট নিয়ে যাই রেলস্টেশনে
বাসের টিকিট হাতে নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটতে থাকি,
আমার জন্য টিকিট করে কী লাভ?
আমি বেহেশতের টিকিট পেলে দোজখের দিকে পা বাড়াই।
- রেজাউদ্দিন স্টালিন
উঠে দাঁড়াতে হবে
আদেশের অপেক্ষা না করে
উঠে দাঁড়াতে হবে
যে আদেশের অপেক্ষা করে
সে পরাধীন
শির-েদের পরও
নিজেকে প্রতিফলিত করতে হবে রক্তের ব্যাসার্ধ পর্যন্ত
এমনকি মেঘের পেটের মধ্যে প্রাণভোমরা ধরতে হবে
সমুদ্র ঝাঁট দিলে দেখা মিলবে সুরাসুর
ভাবলে চলবে না তোমার মাথা নেই
বরং আর্গাসের প্রতিটি রেখা তোমার মাথা
প্রতিটি রোমকূপ নাক
প্রতিটি পশম চোখ
শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুগ্রহ থেকে মুক্ত হও
প্রলয়ের পর সময় শুধু একা দাঁড়িয়ে থাকে
ভাবো স্পার্টাকাসের কথা- শির-েদের পর
আজো সে দাঁড়িয়ে আছে।
- জাহাঙ্গীর ফিরোজ
ভানু গেছে হনুর বগল তলে
শুধু কি রাতেই নামে অন্ধকার?
দেশজুড়ে হাহাকার
নেমেছে আঁধার
তুমি কার কে তোমার?
এই দেশ এই দিন
তোমার আমার।
কালনাগিনীটি দংশিল ভালে
বিশল্যকরণী কে আনবে একালে?
আমাদের রাতদিন একাকার
নেমেছে অন্ধকার;
হাহাকার হাহাকার!
ভানু গেছে হনুর বগল তলে
সব লোকে এই কথা বলে!
আমি জানি তুমি জান খুব
থাক চুপ দাও ডুব
অভাব সাগরে;
কান্নার রোল ঘরে ঘরে।
কার কাছে বাতি
কে ধরেছে ছাতি?
সবই জানা
হায়! রাতকানা!
গন্ধমাদনে খুঁজে পাবে বিশল্যকরণী?
মানি সবাই মানি
নিভৃতে কেঁদে মরে বিচারের বাণী।
- মোশাররফ হোসেন খান
জীবনগল্প
সব গল্পই একসময় শেষ হয়ে যায়
জীবনের গল্প ছাড়া।
কতটুকুই বা বলা যায়?
যতটুকু বলা যায়-
সেটা নিতান্তই সামান্য
খুবই স্বল্প।
কোনো কোনো গল্প থেকে যায় অপূর্ণ
হৃদয়ের গভীরে জাঁতাকলে
যা হতে থাকে চূর্ণ।
লোকটি মারা গেল-
এর অর্থ এখান থেকেই শুরু হলো তার
জীবনের মূল গল্প
সমাপ্তিহীন
এবং অন্তহীন!
সত্য বটে,
ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে
জীবনগল্পের রকম ফের ঘটে...!
- মুজতাহিদ ফারুকী
বৃষ্টি, আহা..
বৃষ্টি বৃষ্টি আহা, অবিরাম আকাশের শুদ্ধ পুত দান
বুক চিরে নেমে আসে, নবী নয় কবির কলবে
নিরিবিলি নান্দনিক অহী
বৈরী আঁধিয়ারে জ্বলে কবিতার হেরা
সংবেদী পাতার সংশ্লেষে
খরাদীর্ণ বাংলার পিপাসার্ত মাঠে
ঝাঁকে পড়ে ভোরে ডাকা পাখি, ফোটে অজস্র সুগন্ধি কুসুম
বানের পানির মতো স্রোতে ভাসে সুন্দরের গান
সুফির ঘূর্ণমান পিরনের ঘেরে চুমু দিয়ে
ভেজা খেতে বেজে ওঠে বিশ্বাসের রাশি রাশি ধান
মৃদুমন্দ প্রেমের আজানে।
