মধ্যযুগের অন্যতম খ্যাতিমান কবি আব্দুল হাকিম যথার্থই বলেছেন, আরবির নন্দন ফার্সি, ফার্সির নন্দন বাঙলা। বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম বর্ণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রিয় খাদ্য গো-মাংসকে একত্র করে এর নাম দেয়া হয়েছে ক-অক্ষর গো-মাংস। যার অর্থ করা হয়েছে মূর্খ। বাঙালি জাতির জন্য এটা এক লজ্জাজনক ইতিহাস। আর ঘৃণার স্ফুরণ ঘটিয়েছেন বাংলাকে এভাবে অমর্যাদা করে। বাংলা যে মুসলমানদের ভাষা তা তাদের দেয়া ক-অক্ষর গো-মাংস বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই, তাহল ‘ক’অক্ষর বা বর্ণ যাদের প্রিয়, গো-মাংস তথা গরুর গোশতও তাদের প্রিয়। শব্দযুগলকে একত্র করে তথাকথিত তৎকালীন পণ্ডিত সম্প্রদায় এর অর্থ করেছেন মূর্খ। যা সত্যিই আফসোসের বিষয়। এ ইতিহাস বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির জাতীয় জীবনে ন্যক্কারজনক একটা অধ্যায়ের সূচনা করে। বাংলা মুসলমানের ভাষা বলে এ ভাষাকে ‘ম্লেচ্ছদের ভাষা’ ‘অন্ত্যজ অস্পৃশ্যদের ভাষা’ বলে গালি দিতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেননি। বাংলা যে মুসলমানদের ভাষা তার আর একটি প্রমাণ হচ্ছে রাজা রামমোহন রায়ের বাংলা ব্যাকরণের নামকরণের ক্ষেত্রে। আমরা লক্ষ করি রাজা রামমোহন রায় বাংলা ব্যাকরণ না লিখে তিনি লিখেন ‘গৌড়ীয়ব্যাকরণ’। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেন, গৌড়জন যাহে সুধা করিবে পান নিরবধি।
বাংলা শব্দটি বলতে তারা খুব কষ্ট পেতেন। শুধু কষ্টই পেতেন না বরং অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতেন। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তার বিখ্যাত ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,‘বাঙলাদেশের বঙ্গ নাম লইয়া ঐক্যবদ্ধ হওয়া হিন্দু আমলে ঘটে নাই, তাহা ঘটিল তথাকথিত পাঠান আমলে এবং পূর্ণ পরিণতি পাইল আকবরের আমলে। সমগ্র বঙ্গদেশ সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে ১৩৫২ ঈসায়ীতে সুবা বাঙালা রাজ্যে পরিণত হইল।‘ কেউ কেউ বলেছেন, বাংলা হচ্ছে জেলেদের ভাষা, শুধু তা-ই নয়; ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আদেশ জারি করেন যে, ‘অষ্টাদশপুরাণানি রামস্য চরিতানিচ। ভাষায়াং মানব শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।‘ অর্থাৎ আঠারো খানা পুরাণ এবং রামের জীবনী যদি কেউ বাংলায় অনুবাদ করইয়, কিংবা পাঠ করে তাহলে সে রৌরব নামক নরকে প্রবেশ করবে। বাংলা মুসলমানদের ভাষা বলেই তো ব্রাহ্মণ ঠাকুরের এ আদেশ কার্যকর করেছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বাংলায় ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ অনুবাদের কারণে জীবগোস্বামী কৃষ্ণদাস কবিরাজকে শাস্তিও দিয়েছিলেন।
‘মুসলিম শাসনামলে বাংলাভাষার ওপর আরোপিত সেন রাজাদের নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটে এবং মুসলিম রাজা-শাসক অভিজাত শ্রেণীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। এটাকে বাংলা ভাষার নবজন্ম বলা যায়।
এ সময় বাংলাভাষার অভূতপূর্ব উৎকর্ষ সাধিত হয়। ফলে বাংলা যে মুসলমানদের ভাষা তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। শুধু তা-ই নয়, এ সময়ে বাংলাভাষায় যত্রতত্রভাবে সংস্কৃত, ফার্সিসহ নানান ভাষার শব্দের ব্যবহার বেড়ে যায়। যার প্রমাণ মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের বয়ানে পাওয়া যায় :
‘বাংলাটা যে একটা স্বতন্ত্র ভাষা, উহা পালি, মাঘধি, সংস্কৃত, ফার্সি, ইংরেজি নানা ভাষার সংমিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে গ্রন্থকারগণ (ব্যাকরণের) একবারও ভাবেন না।
কিন্তু আমরা লক্ষ করি ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে এসব সংস্কৃত তথাকথিত পণ্ডিতবর্গ রাতারাতি বাংলা ভাষার প্রতি দরদি হয়ে ওঠেন। সম্ভবত ইংরেজ পণ্ডিতদের মন্তব্যের সূত্রে ‘বাংলাকে সংস্কৃতের দুহিতা’ বিশ্বাস করায় বাংলার প্রতি তাদের ক্ষোভ ঘৃণা কমে আসে। এর আগে তাদের কাছে বাংলা ছিল বিভাষা; বর্জনীয়। এ পর্যায়ে তারা উদ্যোগ নেন বাংলায় মিশে যাওয়া আরবি-ফার্সি শব্দ ঈ (মুসলমানি প্রভাব) মুক্ত করে তাকে পুনর্গঠন করার, যাতে বাংলাকে দুই হাজার বছর ধরে মরে থাকা ‘সংস্কৃতির যোগ্যা দুহিতা’ বলে মনে হয়। এ উদ্যোগের সংগঠক ছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। মোটামুটি হিসেবে ১৮০১ থেকে ১৮৭০ সাল অবধি বাংলা শুদ্ধীকরণ ও সৃজন কাজ চলেছে।৮ নানা ষড়যন্ত্র ও কলা কৌশল অবলম্বন করে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তরের চেষ্টা করেন; অনেকাংশে সফলও অবশ্য হয়ে ওঠেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পূর্ববর্তী বাংলা গদ্য রচনার যে নমুনা ছিল তা পরিত্যাগ করে শতকরা আশি-নব্বইটি বা তারও বেশি সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করে বাঙলার মূল স্রোতধারা বিনষ্ট করে ফেলে।
ইংরেজদের আগমনের প্রাক্কালে বাংলা গদ্যসাহিত্যের চাহিদা দেখা দেয়, আর তার জোগান দেয়ার ভার পড়ে সংস্কৃত আক্রান্ত পণ্ডিতদের ওপর। প্রথম ভাগ অবধি পরিচালিত তাদের তৈরি অধিকতর দানবীয় আর কোনো কিছুর কথা ভাবা কষ্টকর। বইপত্র লেখা হতো, বিষয়বস্তুতে চমৎকার, চিন্তা ধারায়, কিন্তু এমন এক ভাষায়; যে ভাষার শতকরা ৯০ ভাগ প্রকৃত বাংলা শব্দ তাড়িয়ে, সংস্কৃত থেকে শব্দ ধার করে এনে বসিয়ে এমন ভাষা তৈরি করা হয়েছে, যা লেখকগণ নিজেরা উচ্চারণ করতে পারেন না। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এর বিরুদ্ধে অসফল আন্দোলন চলছে। তথাপি বর্তমান সময় অবধি সাহিত্যের বাংলায় বহু শব্দ রয়েছে, যা একেবারেই উপযোগী নয়। এসব শব্দ হয় একরকম যখন পতিত হয় তা একেবারেই অন্যরকম সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি সাহিত্যের ভাষা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এভাবে ষড়যন্ত্র করে বাংলা ভাষাকে ‘সংস্কৃতের দুহিতা’ বলে অভিহিত করেছেন। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালনঙ্কারসহ সংস্কৃত পণ্ডিতগণ সাধু বাংলা বা সহজ বাংলা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তা ছিল কৃত্রিম বাংলা তথা সংস্কৃত। যা জনগণ গ্রহণ করেনি। এ অবস্থা উপলব্ধি করে ইংরেজ পণ্ডিত বহু ভাষাবিদ হ্যালহেড যে মন্তব্য করেন তা এতদপ্রসঙ্গে স্মরণীয় :
‘বাংলা গদ্যের এই নব রূপায়ণ ঐতিহ্য-বিরোধী এবং ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করেছে।’
বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘বাঙালা সংস্কৃতের দুহিতা নহে, তবে দূর সম্পর্কীয়া আত্মীয়া বটে।’
বিদ্যাবাচস্পতি বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অবশ্য বাংলা ভাষার আসল ইতিহাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি, তিনি বাংলা ভাষার বর্তমান চেহারা দেখেই উপর্যুক্ত মন্তব্য করেছিলেন।
ভাষাকে সংস্কৃতায়ন করার এ অপচেষ্টা সাধারণ জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। তাদের মুখের ভাষাই সমাজে প্রচলিত থাকে। যা তৎকালীন পণ্ডিতবর্গ ‘যাবনি মিশাল’ বলে নামকরণ করেছেন। এভাবে বাংলা ভাষা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক. মৌখিক ভাষা (চলতি ভাষা), দুই. লিখিত ভাষা (সাধু ভাষা)।
সংস্কৃত পণ্ডিতদের প্রবর্তিত এ সাধু ভাষাকে পরবর্তীকালে লেখ্য ভাষা হিসেবেও গ্রহণ করতে চাননি। তারা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন :
কালীপ্রসন্ন সিংহ, টেকচাঁদ ঠাকুর প্রমুখ। পরবর্তীকালে তৎকালীন লেখকদের অন্যতম বঙ্কিমচন্দ্রসহ এমনকি রবিঠাকুর পর্যন্ত সবাই একে একে তথাকথিত সাধু বাংলাকে বেশির ভাগ পরিহার করে মুসলমানই বাংলা (যাবনি মিশাল) এ ফিরে আসেন। সে বাংলাকে পরিমার্জন করে সেটাকেই প্রমিত ভাষা বলে স্বীকৃতি দিয়ে কথোপকথন এবং পুস্তক প্রণয়নে আদৃ করেছেন। তারপরেও বলতে হয়- এখনো নানাভাবে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতায়ন করার নব্য প্রয়াস লক্ষ করা যায়।
স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন, পণ্ডিত হ্যালহেড ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. এস এম লুৎফর রহমান প্রমুখ পণ্ডিতদের যথার্থ মন্তব্যের নিরিখে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আজকের বাংলা ভাষা এক ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়েছে। সহজ একটি উদাহরণ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আরবি শব্দ নজর। যার অর্থ দেখা। ওর দিকে নজর রাখিস। ওর নজর খারাপ। এটার দিকে তোমার নজর দেয়া উচিত ছিল। ওটার দিকে নজর দাও। ইত্যাকার নানান বাক্য তৈরি করা যায়। কিন্তু তথাকথিত সংস্কৃত পণ্ডিতগণ নজর শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে ‘দৃষ্টি’ শব্দটি ব্যবহারের ফলে নানা অসঙ্গতি লক্ষ করা যায়। এ শব্দটি লিখতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা নানারকম ভুল করে বসে; যেমন- দিস্টি, দিষ্ঠী, দিষ্ঠি, দৃস্টি, দৃষ্টী এরকম হাজারো ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবেই আরবি-ফার্সি শব্দগুলোকে বাংলা ভাষা থেকে কঠিন করে তোলা হয়েছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি-‘ক-অক্ষর গো-মাংস’ বলতে যাদের সম্বোধন করা হয়েছে। এরাই বাংলার উত্তরাধিকারী। এরাই প্রকৃত বাঙালি। এ কথা আজ আমাদের স্বীকার করতেই হবে। ঐতিহাসিকভাবে সত্যে প্রমাণিত হলো বাঙালি মানেই একজন মুসলিম, যা মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘যে সবে বঙ্গেত জনমি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে-সব কাহার জনম নির্ণয় ন জানি।।
আমরা সত্যকে সত বলে জানব। মিথ্যাকে পরিত্যাগ করব। ইতিহাসকে সঠিকভাবে হৃদয়ে ধারণ করব। লালন করব। পালন করব।
মধ্যযুগের অন্যতম খ্যাতিমান কবি আব্দুল হাকিম যথার্থই বলেছেন, আরবির নন্দন ফার্সি, ফার্সির নন্দন বাঙলা। বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম বর্ণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রিয় খাদ্য গো-মাংসকে একত্র...
