ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পথ বেয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তখন শহীদদের আত্মত্যাগের স্মরণে চালু হয় ভাষা শহীদ দিবস। তারপর অধিকতর মূল্যায়ন হয়েছে জাতিসঙ্ঘের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের ভেতর দিয়ে।
জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ফোরাম ইউনেস্কো বিশ্বের প্রতিটি ভাষার জনগণকে সচেতন করে তোলার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্তটি জানার পর কানাডীয় ১০ জনের একটি গ্রুপ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রচেষ্টা শুরু করেন। রফিকুল ইসলাম নামের প্রবাসী বাংলাদেশী ভাষাপ্রেমিক জাতিসঙ্ঘের তদানীন্তন মহাসচিব কফি আনানের কাছে প্রস্তাব প্রেরণ করেন। এ প্রস্তাব তখন বাংলাদেশের পক্ষে ইউনেসকোতে পাঠানো হয়।
ইউনেস্কোর সোস্যাল অ্যানথ্রোপোলজিস্ট আর ভাষাবিদরা ব্যাপক গবেষণা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে ইউনেস্কোর ৩১তম এই সম্মেলনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এভাবেই আমাদের মাতৃভাষার জন্য আত্মবিসর্জনের দৃষ্টান্ত স্থাপনের ইতিহাস আন্তর্জাতিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়।
২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলো তথা বিশ্বময় উদযাপিত হচ্ছে। লন্ডনেও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এখানে বাংলা ভাষার চর্চা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পর লন্ডনে সবচেয়ে বেশি বাংলা চর্চা হয়। ব্রিকলেন ‘বাংলা টাউন’ এখন ‘তৃতীয় বাংলা’ হিসেবে খ্যাত। গ্রেট ব্রিটেনে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশীর বসবাস। শুধু টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বাস করেন ৫০ হাজারের অধিক।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হলে চা রফতানির কাজে সিলেটের মানুষ লন্ডন যাত্রা শুরু করেন। এরপর জাহাজশ্রমিক হিসেবে ব্যাপক হারে মানুষ এখানে পাড়ি জমিয়েছেন। উচ্চতর পড়ালেখার জন্যও এসেছেন অনেকে। ভ্রমণ, কর্মসংস্থান এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ নিয়েও হাজার হাজার মানুষ প্রবাসী হয়েছেন। উচ্চশিক্ষিতরা বিভিন্ন পেশায় জড়িত হলেও অসীম সাহসী সাধারণ মানুষে এখানে গড়ে তুলেছেন একের পর এক রেস্টুরেন্ট। গত শতকে বাংলাদেশীদের প্রতিষ্ঠিত প্রায় ১০ হাজার রেস্টুরেন্ট এখন ব্রিটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমার সম্পাদিত বাংলাদেশী ব্যবসা-বাণিজ্যের নাম ঠিকানা ও ফোন নাম্বার সম্বলিত ‘ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরি’তে এ বিষয়ে ব্যাপক তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।
২০০৮ সালে আমি বিলেতে বাংলাচর্চা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন শীর্ষক একটি গবেষণা গ্রন্থের কাজে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। তখন বাংলা ভাষা ও বাংলা সাংবাদিকতা নিয়ে অনুসন্ধানকর্ম কতটা দুরূহ ব্যাপার তা হাতে কলমে টের পেয়েছি। আমি তখন এশিয়ান ১৮ হাজার রেস্টুরেন্টের ঠিকানাসহ ‘ইউকে এশিয়ান রেস্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি’ প্রকাশ করি। এর মধ্যে সাড়ে ৯ হাজার অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশী মালিকানা প্রমাণ করেছি। ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ ব্রিটেনের মূলধারায় ডকুমেন্ট হিসেবে এখন তা প্রযোজ্য। এ ছাড়া আমার সম্পাদিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) ৫৭টি দেশের তত্ত্ব ও তথ্যসমৃদ্ধ ডাইরেক্টরি ‘মুসলিম ইন্ডেক্স’ ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। সেখানেও বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা স্থান পেয়েছে খুবই গুরুত্বের সাথে।
অনুসন্ধানে অবশ্য আরো অনেক মজার তত্ত্ব ও তথ্য বেরিয়ে এসেছে। শুধু বাংলাদেশী নয়, বিদেশীরাও বাংলা নিয়ে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ প্রেমিক ড. উইলিয়াম রাদিচে বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক কাজ করছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াস (স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ)-এর শিক্ষক। সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গুরুত্বের সঙ্গে চর্চা হয়। অভিবাসীদের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেয়ায় ব্রিটেনে বাংলা ভাষাও গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিদেশীদের মধ্যে ইংল্যান্ডের জেমস কিথ, ড. সু লয়েড উইলিয়াম ও জেমস লয়েড উইলিয়াম এবং চেকোস্লাভিয়ার পণ্ডিত কে সানি বাংলা ভাষাচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। এ ছাড়া বাংলা চর্চায় রাশিয়ার দানিয়েল চুক এবং মাদাম দিকোভা, জাপানের কাজিমো আজুমা এবং সুইয়োসি নারা, চীনের দং ইউ চেন এবং ম্যা লি উন প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এদের বাইরেও আরো বহু বিদেশী বাংলা ভাষা চর্চা ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পঠন-পাঠনে বিদেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অবদান রাখছে। ইউনিভার্সিট অব লন্ডন, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, প্যাট্রিস লুলুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক নামী-দামি প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার গবেষণা হয়।
সম্প্রতি প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পঠন-পাঠন ও গবেষণা চালু হয়েছে। বিশ্বখ্যাত ক্যাম্ব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার চর্চা করে চলেছেন বেশ গুরুত্বের সাথে। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে এসবই নতুন মাত্রার সৃষ্টি করেছে।

বর্তমান পৃথিবীতে ২৯ কোটি লোকের ভাষা বাংলা। জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর সাত হাজারের অধিক ভাষার মধ্যে এর অবস্থান সপ্তম, মাতৃভাষার দিক থেকে পঞ্চম। বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, আরো ১২ কোটি বাস করেন ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে। বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে এ-ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা। ফলে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে এর চর্চা ও পঠন-পাঠন।
বিলেতের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কাজের ভাষা হিসেবে বাংলা শেখার দরকার পড়ছে সে দেশের নাগরিকদের। ক্রমবর্ধমান বাংলাভাষী মানুষের কারণেই এমনটি সম্ভব হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চল এমনকি কানাডার কিছু এলাকার প্রধান ভাষা বাংলা। বাংলাভাষী মানুষ বিশ্বায়নের এ যুগে যেখানেই সমাজবদ্ধ হয়েছেন, সেখানেই মুখরিত হয়েছেন নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা চর্চায়। এভাবেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বিশ্বময় বাংলা ভাষা।
এসব ইতিহাস যথাযথভাবে সংগ্রহ করা উচিত। এ জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক। আরো প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের এম্বেসি ও হাইকমিশনে বিশেষ সেল। এ যাবৎকালে যা কিছু কাজ হয়েছে, তা ইতিহাসের প্রাথমিক স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। লন্ডনে আমরা যখন কোনো মৌলিক বিষয়ে কাজ করি বা গবেষণা করি, তখন রিসার্চ কাজে অসংখ্য রেফারেন্স বুক ও জার্নাল পাওয়া যায়। তথ্যসূত্র (সাইটেশন) উল্লেখপূর্বক আমরা তা কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু আমাদের ভাষা, সাহিত্য কিংবা সাংবাদিকতা নিয়ে তেমন কোনো মৌলিক কাজ না থাকায় রেফারেন্স জোগাড় সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

এটা অবশ্য সত্য যে, মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ ও পরিশ্রম। সেই সাথে কৌতূহল বা জানার আগ্রহ। কিন্তু অনুকূল পরিবেশ ও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে তা নিয়ে বেশি দূর এগোনো যায় না। তবে সমাজের সুশীল অংশ যদি এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে তাহলে মঞ্জিলে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ আন্দোলনই আমাদের স্বাধীনতার স্বর্ণতোরণে পৌঁছে দিয়েছে।
গত বছরের আগস্ট থেকে ইস্ট লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল ও ব্রিকলেন নিয়ে ছয় মাসব্যাপী একটি গ্রুপ ওয়ার্ক করেছি। সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে।
শত বছরের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন বয়সের নানা বর্ণের লোকজনের সাথে প্রতিদিন কথা বলেছি। নোট নিয়েছি বা রেকর্ড করেছি। ২০ বছর ধরে এখানে সাংবাদিকতা করছি। তারপরও অনেক বিষয় অধরাই ছিল। ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষাপট ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন করে বহু কিছু জানা হলো। শতাব্দীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বিলেতের কারি ক্যাপিটেল খ্যাত ব্রিকলেন ও ফাইন্যান্সিয়াল সিটি ক্যানারিওয়াফ এবং হোয়াইটচ্যাপেলকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম, আইরিশ, জুইসসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন ও প্রত্যাগমন এবং বাঙ্গালির ব্রিকলেন বিজয় ও বাংলা টাউন ঘোষণা মূল আলোচনায় স্থান পেয়েছে। বিলেতে বাংলা চর্চা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন সম্পর্কেও আলোকপাত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন তথা হোয়াইটচ্যাপেল ও ব্রিকলেন কেন্দ্রিক রাজনীতিতে উনাকিং পরাজিত ও জুর্জ গ্যালাওয়ের বিজয়ী হওয়া এবং পরবর্তীতে রুশনারা আলী এমপি নির্বাচিত আর টাওয়ার হ্যামলেট্স কাউন্সিলে নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের মহা তরঙ্গ। আলতাব আলি হত্যাকাণ্ড, ক্রসরেল ও খুদিলার আন্দোলন অনেকটা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
শেষ দিনে পনেরো জন স্থানীয় স্টেকহোল্ডার, দুইজন ব্রিটিশ, একজন ইউরোপীয় ও একজন জাপানি সমাজ বিকাশ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির মন্তব্য রেকর্ড করলাম। পূর্ব লন্ডনের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সংহতি নিয়ে মূলধারার এ কাজ অনেক দায়িত্বশীলতা, নিষ্ঠা ও নিয়মানুবর্তিতার সাথে করতে হচ্ছে। ইমিগ্রেশন থেকে বর্ণ-বৈষম্য, খোলাবাজার থেকে আধুনিক অট্টালিকা, এলএমসি, রয়্যাল লন্ডন হসপিটাল, ক্রসরেল- এই সবই গবেষণাকর্মের অংশ। তবে প্রতিদিন আসল কাজের বাইরে আরো কিছু সময় দিতে হয়েছে। কমিউনিটির অনেকের সাথে দেখা হয়, তাদের যাপিত জীবন নিয়ে কথা হয়। মাঝে মাঝে বেশ মজার এবং স্মৃতিময় ঘটনাও ঘটেছে।

বিলেতে আমাদের ইতিহাস চর্চার মূল্য অনেক বেশি। বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া সহজ। তবে বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ। আমার অনুসন্ধানে উনিশ শতকের প্রথম দিকে সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হলে চা রফতানির কাজে সিলেটের মানুষ বিলেত যাত্রা শুরু করেন। এরপর জাহাজশ্রমিক হিসেবে ব্যাপক হারে মানুষ বিলেত পাড়ি জমিয়েছেন। উচ্চতর পড়ালেখার জন্যও এসেছেন অনেকে। ভ্রমণ, কর্মসংস্থান এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ নিয়েও হাজার হাজার মানুষ প্রবাসী হয়েছেন। উচ্চ শিক্ষিতরা বিভিন্ন পেশায় জড়িত হলেও অসীম সাহসী সাধারণ মানুষ বিলেতে গড়ে তুলেছেন একের পর এক রেস্টুরেন্ট। গত শতকে বাংলাদেশীদের প্রতিষ্ঠিত সাড়ে নয় হাজার রেস্টুরেন্ট এখন ব্রিটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে বসবাসের শতক অনেক আগেই পেরিয়েছে অভিবাসী বাংলাদেশী জনগোষ্ঠী। ব্রিটেনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত চারজন এমপি রয়েছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক, রুপা হক ও আফসানা বেগম শক্তিশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। হাউজ অব লর্ডসে আছেন পলা মঞ্জিলা উদ্দিন। বিভিন্ন কাউন্সিলে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছেন বহু বাংলাদেশী। ব্রিটিশ বাংলাদেশী কূটনীতিবিদ আনোয়ার চৌধুরী ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছেন।
নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা গড়ে তুলেছেন মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। যেখানে ধর্ম ও ভাষা চর্চা চলছে সমান্তরালভাবে। বহুজাতিক সমাজের আবাসস্থল মাল্টিকালচারাল লন্ডন সিটিতে ১৩১টি স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজ আছে। ভাষার দিক থেকে বাংলার অবস্থান এখন চতুর্থ।

ব্রিকলেন বাংলা টাউন বিলেতের মানচিত্রে একটা আইকনের মর্যাদা পেয়েছে। কিছু কিছু স্কুল-কলেজে জিসিএসই ও এলেভেলে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ একটা বিষয় হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। বিলেতের মাধ্যমিক স্কুলে ছেলে-মেয়েদের বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে দ্বিতীয় কোনো ভাষা পড়তে হয়। টাওয়ার হ্যামলেটসের স্মিদি স্ট্রিট স্কুলে পাইলট প্রজেক্টের অধীনে মডার্ন ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে বাংলা পড়ানো শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে।
বাংলা টাউন থেকে শুরু করে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বাংলায় হয়েছে। মসজিদ, দোকানপাট, হাসপাতাল, পার্ক সবখানে বাংলার ব্যবহার বেড়েছে। নিউহাম, ওয়েস্টহাম, ক্যামডেন, বার্মিংহাম, মানচেষ্টার, কার্ডিফ ও নিউক্যাসলের মতো এলাকাগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান ও রাস্তার নাম বাংলায় লেখা আছে।
বাংলাদেশী কমিউনিটিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আলোচনা ও জাতীয় দিবসগুলো বাংলা চর্চার প্রধান অবলম্বন। বাংলা সংবাদপত্র ও রেডিও-টেলিভিশন এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বাংলা ভাষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চার লক্ষ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক প্রবাসী স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বিলেতে চলে এসেছেন।
লন্ডনে বঙ্গবন্ধু স্কুল, ওসমানী স্কুল, কবি নজরুল প্রাইমারি স্কুল, আলতাব আলী পার্ক, বাংলাদেশ সেন্টার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার পরিচয় ধারণ করে আছে। ড্রাইভিং টেস্টের থিওরি পরীক্ষায় এবং এনএইচএস হাসপাতালগুলো ভয়েস ডিরেকশনে অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় নির্দেশনা চালু হয়েছে। স্থানীয় স্কুলগুলোতে স্বকীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ও সিলেটি ভাষা তালিকাভুক্ত হয়েছে। অসংখ্য লাইব্রেরিতে এখন বাংলা বই গুরুত্বের সাথে রাখা হয়।

ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় দিন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ বিশেষভাবে বিদেশীদের বাংলা চর্চায় উৎসাহ জুগিয়েছে। বাংলাদেশী হিসেবে নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য বাংলার প্রতি আন্তর্জাতিক বিশ্বের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর লন্ডনের আলেক্সজান্ডার প্যালেসে ডক্টর ইউনুসকে দেয়া সংবর্ধনা সভায় ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় এমপিসহ প্রায় দুই হাজার মানুষের উপস্থিতি ও ইউরোপীয় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার এরই প্রমাণ বহন করে। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়েচে ভেলে, রেডিও জাপান, চীন আন্তর্জাতিক বেতার, মস্কো রেডিও, রেডিও ভেরিটাস, কানাডার বাংলা রেডিও চ্যানেলসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
বিলেতে অধ্যয়ন শেষে অনেক বাংলাদেশী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। দেশ থেকেও অনেকে গিয়েছেন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার দেশে দেশে। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করছেন বাংলাদেশের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্য। ফলে সেসব স্থানেও বাংলা ভাষা চর্চা হচ্ছে নানাভাবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, টেকনোলজিক্যাল গ্লোবালাইজেশন মানবজাতির ভাষাকেও বিশ্বায়িত করে তুলছে দ্রুতগতিতে। সম্প্রতি সিয়েরা লিয়ন বাংলা ভাষাকে তাদের দেশে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। এভাবেই বাংলা ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবীব্যাপী।
দীর্ঘ দিন বিদেশে বসবাসের ফলে অনেক বাংলাদেশী বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাজনীতিতে আপন কর্মদক্ষতা গুণে অনেকে লাভ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদপদবি। এতে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশী জাতির মর্যাদা বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের শাখা সংগঠন। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, বিশ্বে জনমত গঠন, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে প্রবাসীরা বাংলা ভাষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এভাবে বিলেতে বাংলাদেশীরা বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।