শীতের পরেই আসে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্ত তার বাসন্তী রঙে রাঙিয়ে তোলে প্রকৃতি, রাঙিয়ে দেয় মানুষের মন। বসন্ত নিয়ে হাজার কথামালা, শত শত গান। সাহিত্যের বিশাল একটা অংশজুড়ে এই বসন্ত ঋতু। বসন্তকে জীবন ও মনের পরিবর্তনের বাহকও বলা চলে। বসন্ত ভালোবাসার আরেক নাম। ভালো লাগার মোহনীয় ঋতু। আর সেই বসন্তকে রঙিন আভায় পরিপূর্ণ করতে আসে শিমুল ফুল। পাতাহীন গাছে গাছে রক্তরাঙা শিমুলের সমারোহ। যেন দিগন্তছোঁয়া লাল গালিচার আহবান প্রকৃতির মাঝে। সেই আহ্বানে প্রকৃতির সাথে মানুষের মনও চনমনে হয়ে ওঠে। শিমুলের ডালে আগুনঝরা লাল ফুলের মাঝে বসে ডাকতে থাকে কোকিল। কোকিলের সেই কুহুকুহু ডাকে মনের অজান্তেই এক ভালো লাগা খেলে যায়। কোকিল ও চিল এ সময়ে ভালো লাগে। ফাগুনের বুকে আগুন ধরানো সেই শিমুল গাছটি বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে, পথের ধারে, পুকুরপাড়ে, মাঠের পাশে দেখা যায় শোভা ছড়াতে। এমন কোনো মানুষ নেই যে শিমুল চেনে না। এমন কোনো মানুষ নেই যে শিমুলের এই শোভায়িত রূপের প্রেমে পড়ে না। চলার পথে পথিক একটু হলেও থমকে দাঁড়ায়। দু’দণ্ড চোখ বুলিয়ে আবার চলতে থাকে। শিমুলগাছ অনেক লম্বা ও শাখা-প্রশাখা যুক্ত হওয়ায় ফুল উপরে ফুটে, মনে হয় আকাশের সাথে চুপিচুপি কথা বলে ওরা। উপরে ফোটে বলেই দূর থেকেই চোখে পড়ে টকটকে লাল ফুলের সমাহার। শীতের শুরুতে গাছের সব পাতা ঝরে যায়। শীতের শেষের দিকে পাতাহীন ডালে কুঁঁড়ি আসতে শুরু করে। কুঁড়িগুলো কালচে সবুজ রঙের ও কুঁড়ির উপর অংশে হালকা লোমের মতো থাকে। কুঁড়ির ভেতর অংশ পিচ্ছিল থাকে। বসন্তের শুরু থেকে ফুল ফুটতে শুরু হয়। বসন্তের শেষে সব ফুল ঝরে যায়।
এই ফুলের সুবাস নেই। পাপড়িগুলো বেশ ভারী। পাঁচটি মুক্ত পাপড়ি। মাঝখানে থাকে অনেক কেশর। কেশরগুলো সাদা হলে মাথার অংশ কালো। প্রতিটি ফুলে ফল আসে। ফল মোচা আকৃতির। ফল কচি অবস্থায় সবুজ থাকে। ধীরে ধীরে ধূসর রঙ ধারণ করে। ফল পরিপূর্ণ পক্ব হলে গাঢ় ধূসর রঙের হয়। বৈশাখ চৈত্র মাসে ফল ফেটে যায়। চৈত্রের তাপদাহে প্রকৃতি যখন উষ্ণতা ছড়ায় তখন ফল রোদের তাপে ফেটে বেরিয়ে আসে তুলা। বাতাসে ভর করে উড়ে যায় দূর বহুদূর। এভাবেই বাতাসের মাধ্যমে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে বীজ। বীজগুলো মটরাকৃতির ও কালো। প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়ে পড়া এ বীজ থেকেই চারা জন্মায়। কোনো যতœ ছাড়াই বেড়ে ওঠে শিমুল গাছ। গাছ ১৫-২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং শাখা-প্রশাখা যুক্ত। গাছের গায়ে কাঁটা থাকে। এই কাঁটার ধরন একটু ভিন্ন। গাছের অংশে চ্যাপটা হয়ে মিশে থাকে আর উপর অংশে সূচালো। গাছ যত বড় হতে থাকে এই কাঁটার পরিমাণ তত কমতে থাকে। গাছের রঙ ধূসর। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ হয়। আবহমান গ্রামবাংলার রূপ ও নয়নাভিরাম সেই শিমুল শুধু মুগ্ধতা ছড়ায় তা নয়। এর আছে অনেক উপকারিতা। আমার মাথায় দেয়ার যে বালিশ ব্যবহার করি তাই শিমুলের। লেপ, তোশক, বালিশের জন্য শিমুলের তুলার জুড়ি নেই। এছাড়া এর ঔষুধি গুণও আছে।
মালয়, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ চীন, হংকং ও তাইওয়ানে ব্যাপকভাবে এ গাছের চাষ হয়। আমাদের দেশে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া হয়ে শিমুল এসেছে।