পিচ্চি প্রজাপতিটি আজ তিন দিন ধরে না খেয়ে আছে। কোনো দানা পানি জোটেনি তার ভাগ্যে! ভীষণ অসুস্থ সে । অপূর্ব সোনামাখা জাদুমাখা চাঁদ বদনী মুখখানি দুখের কালো মেঘে ঢেকে আছে! ঝিকমিক অনাবিল মখমল ডানা দুটোর অধিকাংশই ভাঙা! ভেঙে গেছে চিরতরে তার স্বপ্ন সাধ আশা। ভেঙে দিয়েছে দুষ্টু পাজির দল ছেলে ছোকরারা। তার মা বাবা ওদের হাতেই মারা পড়েছে!
মা-বাবার কথা মনে আসামাত্রই চোখে শ্রাবণের ঢল নেমে এলো।
তখন শরৎকাল। কাশফুলে ভরে গেছে সন্ধ্যা নদীর দুই কূল। বাগানজুড়ে ম ম নানান ফুলের সুরভি! পাখিরা দোল খায় বাতাসে। কালো মেঘ ভেসে যাচ্ছে দূর দেশে। অতিথি পাখিরা নিজের দেশ ছেড়ে এ দেশে বেড়ানোর উদ্দেশে কেবল ডানা মেলেছে। থেকে থেকে ঘুঘু আর বউ কথা কও ডেকে চলছে। নীলাম্বরী শাড়ি পরে আছে আকাশের কিছু অংশ। নীলিমার বুকজুড়ে জেগেছে স্বপ্নময় রঙধনু। রাতে চাঁদ ও তারা মাতে জোছনার প্লাবনে। জোনাক পোকা ঝোপঝাড়ে নেভে আর জ্বলে । সব মিলে মায়াবী লাগছিল গোটা দেশকে।
তো, এক দিন, উদাস বিকেলে পিচ্চি প্রজাপতি মা বাবার কাছে বায়না ধরল তাল পুকুরের পাশে যে বাগান বাড়িটা আছে সেখানে তাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মা প্রজাপতি তার দু’গালে আর মাখা পরশ দিয়ে বলল, লক্ষ্মী সোনা, ওখানে ভুলেও আমাকে যেতে বলো না, তুমিও না বলে, না কয়ে কখনও যেও না। ওখানে সব সময় দুষ্টু ছেলের দল ঘুরঘুর করে। পাখিরা মারা পড়ে, গুঁইসাপ ধাওয়া খায়, ফড়িং, ভ্রমর, মৌমাছি এমনকি পিচ্চি পিঁপড়ে পর্যন্ত ঢুকতে পারে না। খুব বেশি ভয় পায়! অতঃপর সে তার বাবার কাছেও বায়না ধরল। বলল, ও বাবা, আমার জাদু বাবা, চলো না ওই বাগানটায়। কত সুন্দর ফুল ফুটে আছে । ঘ্রাণে বাতাস মুখরিত হচ্ছে, প্লিজ সোনা বাবা, আমাকে নিয়ে চলো না! বাবা বলল, ও সোনামা , মা রে, অমন বায়না ধরো না, যাতে আমাদের জীবন চলে যায়। ওই বন হলো আমাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ। ওখানে আমরা কস্মিনকালেও যাই না, ভুল করেও মাড়াইনা। ওই বন হলো আমাদের জন্য অভিশাপ! তার চেয়ে এসো আমরা লুকোচুরি খেলি। পিচ্চি প্রজাপতি আর কথা বাড়াল না। মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো। পিচ্চি প্রজাপতি আর তার প্রজাপতি বাবা লুকোচুরি খেলা শুরু করল ।
তখন গোধূলি বেলা। রাখাল গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে । হাটুরে হাট থেকে থলে ভর্তি সদায় নিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি আসছে। ইমাম সাহেব, মুয়াজ্জিন আর নামাজিরা মসজিদসংলগ্ন পুকুরে ওজু করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক এমন সময় পিচ্চি প্রজাপতিটি খেলতে খেলতে তালপুকুরের পাশের বাগানে আনমনা হয়ে ঢুকে পড়ল। আর যায় কোথায়! দুষ্টু ছেলেরা তাকে ধরার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল। পিচ্চি প্রজাপতি খুব বেশি ভয় পেয়ে উড়ে গিয়ে একটি বাবলা গাছের উপর আশ্রয় নিলো। সেখানেও একটি দুষ্টু ছেলে একটি লাঠিতে আঠা লাগিয়ে তাকে ধরতে চেষ্টা করল কিন্তু সে একটুর জন্য ধরা পড়ল না, ভাগ্যিস লাঠিটা একটি ডালে ধাক্কা খেল! নয় তো সে অনায়াসেই ধরা পড়ত। হে খোদা, তুমি রাহমানির রাহিম। ঠিক এমন সময় অন্য আর একটি ছেলে ঢিল ছুড়ল। পিচ্চি প্রজাপতি কোনো রকম উড়াল দিয়ে একটি ডোবার পাশে গিয়ে পড়ল। বড় বেশি ভয় পেয়ে সে তার মা-বাবাকে জোরে জোরে ডাকতে লাগল, দিশে হারিয়ে কাঁদতে লাগল। পিচ্চি প্রজাপতির কান্না মা-বাবার কানে পৌঁছানোমাত্রই তারা কাঁদতে কাঁদতে উড়াল দিয়ে অভিশপ্ত বাগানে ঢুকে তাকে জোরে জোরে ডাকতে লাগল, পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। একপর্যায় তারা দু’জনই পথ হারিয়ে ফেলল । বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে একে অপরের কাছ থেকে। এ দিকে পিচ্চি প্রজাপতি কোনো রকম কষ্টেসৃষ্টে বাড়ির দিকে উড়াল দিতেই তার ছোট্ট ডানা দুটো বাড়ি খেল একটি রেন্টি গাছের ডালে, সাথে সাথে একটি ডানা ভেঙে গেল অপরটি গেল মচকে। মাগো রে বাবা রে বলে জ্ঞান হারাল!
এ দিকে দুষ্টু ছেলের দল পিচ্চি প্রজাপতির বাবা মাকে দেখামাত্রই আঠালো লাঠিটা আচমকা তাদের ডানা বরাবর ছোঁয়াতেই আটকে গেল। তারা ধরা খেল। ধরা খাওয়ার পরও তাদের মন সন্তানের জন্য আরো বেশি ছটফট করতে লাগল, খুব বেশি কাঁদতে লাগল। আসন্ন মৃত্যু কথা পর্যন্ত তারা ভুলে গেল। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। ঠিক এমন সময় পিচ্চি প্রজাপতি জ্ঞান ফিরে পেল। সে তার মা-বাবাকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ডাকতে লাগল। আহত শরীর নিয়ে কিছু দূর যেতেই তার মা-বাবাকে দেখামাত্রই ডাক দিলো। ওর মা-বাবা ওর ডাকে সাড়া দিতেই দুষ্টু ছেলের দল পিচ্চি প্রজাপতির বাবা মায়ের ডানা দুটো ছিঁড়তে হাত বাড়াল। ঠিক এমন সময় দুষ্টু ছেলের একটিকে পিচ্চি প্রজাপতির মা ও বাবা কামড়ে দিতেই অন্য ছেলেরা পিচ্চি প্রজাপতির সামনেই তার মা-বাবার মাথা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলল! পিচ্চি প্রজাপতি বাবা রে, মাগো রে বলে কেঁদে কেঁদে আবার জ্ঞান হারাল!
ঠিক তিন দিন পর আজ তার জ্ঞান ফিরে আসায় নিজেকে ধিক্কার জানাল! যদি মা-বাবার লাশ পাওয়া যায় এই আশায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঠিকানাবিহীন চলতে লাগল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ছ’বছরের বীণা নামের একটি সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে, যে কি না প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। সে পিচ্চি প্রজাপতির পথ দিয়েই স্কুলে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। সামনে এগোতেই পিচ্চি প্রজাপতিকে কাঁদতে দেখল। পিচ্চি প্রজাপতি বীণাকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগল এবং অনুনয় করে বলতে লাগল আমাকে মেরো না, প্লিজ আমাকে মেরো না, আমরা তো কারোরই ক্ষতি করি না, তবে কেন আমাদের শুধু শুধু মেরে ফেল? আমাদের কী এমন ভুল কী এমন দোষ পেলে যার কারণে আমার মা-বাবাকে এত নির্মমভাবে হত্যা করলে? মারার যখন এতটাই শখ তবে এই নাও আমাকেও মেরে ফেলো। পিচ্চি প্রজাপতির এমন কান্নাজড়িত কথা ছোট্ট বীণার অবুঝ মনে দাগ কেটে গেল। সে অভয় দিয়ে বলল, না না বন্ধু আমি তোমাকে মারবো না। তোমার কান্না আমাকে কাঁদিয়ে ফেলেছে, তোমার দুঃখে আমি মর্মাহত! তোমার কষ্ট আমার বুকে বেদনা ছড়াচ্ছে। জানো, আমার মা-বাবাও আমাকে ছেড়ে দূর আকাশের তারা হয়ে আছে। এই দেখো আমি তো কাঁদছি না। এই বলে সে খুব জোরে কেঁদে দিলো এবং বলল, আমি লেখাপড়া করে তাদের স্বপ্ন সত্যি করব এবং করতে চাই।
পিচ্চি প্রজাপতি দেখলো বীণা তারই মতো দুঃখী। বীণার সাথে সে সই বানাল। তার পর তারা পরম সুখে একই সাথে জীবন কাটাতে লাগল।
পিচ্চি প্রজাপতিটি আজ তিন দিন ধরে না খেয়ে আছে। কোনো দানা পানি জোটেনি তার ভাগ্যে! ভীষণ অসুস্থ সে । অপূর্ব সোনামাখা জাদুমাখা চাঁদ বদনী মুখখানি...
