বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি জায়গাতেই রিক্সা দেখা যায়। এ রিক্সা প্রথম কে উদ্ভাবন করে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো-জোনাথন স্কোবি নামে একজন মার্কিন মিশনারি ১৮৬৯ সালে রিক্সা উদ্ভাবন করেন। স্কোবি থাকতেন জাপানের সিমলায়। কারো কারো ধারণা- ১৮৬৫-৬৯ সালের মধ্যে পালকির বিকল্প হিসেবে রিক্সার উদ্ভাবন হয়। কলকাতা থেকে ঢাকায় রিক্সা নিয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামে ১৯১৯ সালে রিক্সা আসে রেঙ্গুন থেকে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে রিক্সা একটি ঐতিহ্যবাহী বাহন। তবে দেশভেদে রিক্সার গঠন ও আকারে বিভিন্ন পার্থক্য দেখা যায়। সেটাও খুব স্বাভাবিক। জাপানি রিক্সাগুলো ছিল দুই চাকার। একজন মানুষ ঠেলাগাড়ির মতো করে টেনে নিয়ে যেত। এটাকে বলা হয় হাতে টানা রিক্সা।
কলকাতা শহরে হাতে টানা রিক্সা এখনো দেখা যায়। এটা একটি অমানবিক পরিশ্রমের কাজ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৫ সালে অমানবিক আখ্যা দিয়ে হাতে টানা রিক্সা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করে। ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিলটি পাস হয়। কিন্তু এটা এখনো কার্যকর হয়নি। অবশ্য বর্তমান সরকার বিলটি সংশোধন করেছে। ১৯২০ সালে ভারতে সুদূর পূর্বের আকারে সাইকেল রিক্সা চালু হয়। ট্রাইসাইকেলের তুলনায় বড়।
চীনে প্রাচীনকাল থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত এক ধরনের চেয়ারের প্রচলন ছিল। আর এটার ব্যবহার উচ্চ বংশীয় ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্রীতদাসরা পিছন দিক থেকে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেত। তবে বর্তমানে প্রচলিত রিক্সা সর্বপ্রথম দেখা যায় ১৮৯৮ সালে। আর ১৮৭৪ সালে জাপান থেকে ১,০০০টি রিক্সা আমদানির মাধ্যমে সাংহাইতে রিক্সা শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। অন্যান্য দেশের মতো এখনকার রিক্সা শ্রমিকরা ছিল গরিব। ১৯৪০ সালের মধ্যে রিক্সা শ্রমিকদের সংখ্যা ১,০০,০০০ জনে উন্নীত হয়।
রিক্সার উৎপত্তিস্থল জাপান হলেও তা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৩৩ সালে ফুয়েইকো নামক এক ব্যক্তির হাত ধরে জাপান থেকে রিক্সার প্রবেশ ঘটে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে রিক্সার চলন ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ট্যাক্সি ব্যবহার জনপ্রিয় হওয়ার আগ পর্যন্ত। ইউরোপের দেশ সুইডেনে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের রিক্সা।

কিছু গবেষক রিক্সা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রকৌশলী বোরহান। তার উদ্ভাবিত বিভিন্ন সরঞ্জামাদির মধ্যে রয়েছে- শক অ্যাবজর্বিং বাম্পার, হুইল ক্যাপ, রিক্সা ফাঁদ। এ রকম একটি ফাঁদ রয়েছে ঢাকার বাংলামোটর মোড়ে।
বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১ এর বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রিক্সায় চড়ে উপস্থিত হয় দলগুলোর দলপতিরা। বিভিন্ন ফ্যাশন অনুষঙ্গে-জুতায়, পোশাকে, দেয়ালচিত্রে, গামছায়, ঘর সাজানোর উপাদান, ঘরোয়া আসবাবে অথবা শৌখিন শোপিসে রিক্সাচিত্র স্থান পেয়েছে। রিক্সাচিত্রের মোটিভ কাজে লাগিয়েছেন বিখ্যাত ডিজাইনার বিবি রাসেল। রিক্সাচিত্রের আদলে ছবি এঁকেছেন নাজলী লায়লা মনসুরসহ আরো অনেকে। চিত্রকরদের মতে, রিক্সাচিত্রের টান বা আঁচড়গুলো খুবই সাবলীল, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্ট। এ টানগুলো হয় ছোট ও নিখুঁত। অথচ এদের কারো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। শুধুমাত্র নিজের কল্পনা থেকেই এঁকে থাকেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম শামীম কায়ছার ও এমআইএসটি’র প্রভাষক আবু রায়হান মো: সিদ্দিক মিলে তৈরি করেছেন সৌরশক্তি চালিত রিক্সা। সৌরশক্তি চালিত রিক্সা চালু হলে দিনে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা সম্ভব।
রিক্সার কারণে প্রায়ই যানজটে পড়তে হয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের তথ্যমতে, ঢাকায় কমপক্ষে পাঁচ লক্ষাধিক রিক্সা চলাচল করে। এ শহরের ৪০ শতাংশ মানুষই রিক্সায় চড়ে। শহরের বিশেষ কিছু জায়গায় রিক্সা চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ দেশের রিক্সার গঠন শৈল্পিক দিক থেকে স্বতন্ত্র। শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে রিক্সাচিত্র। ফুল-ফল, নদ-নদী, প্রকৃতি, পাখি, ঐতিহাসিক স্থান ও চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকার ছবি রিক্সাচিত্রে ঠাঁই পায়। রিক্সাচিত্র বাংলাদেশের নিজস্ব চিত্রশিল্প। সাধারণত বাংলাদেশের রিক্সার পিছনে, হুডে ও ছোট ছোট অনুষঙ্গে এ চিত্র লক্ষ করা যায়। যা ১৯৫০ এর দশক থেকে প্রচলিত। বর্তমানে বিভিন্ন জায়গা থেকে কম্পিউটারে কাটছাঁট করে সাজিয়ে টিনের ধাতব প্লেটে সেগুলো ছাপ দিয়ে খুব সহজেই তৈরি করা হয় রিক্সাচিত্র।
২০১১ সালে সাইকেল রিক্সায় বৈদ্যুতিক মোটর সংযোজন করার মাধ্যমে যন্ত্রচালিত রিক্সার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে এজাতীয় রিক্সা চলতে দেখা যাচ্ছে। দূষণহীন যান হিসেবে সাইকেল রিক্সা খুব জনপ্রিয়। রিক্সার বহুল ব্যবহার এবং নিজেস্ব ঐতিহাসিক কাঠামোর কারণে ঢাকাকে রিক্সার রাজধানী বলা হয়।