গ্রামের দক্ষিণ দিকে ইছামতী নদী তরতর করে বয়ে চলেছে। উত্তর দিকে তাকালে অফুরন্ত সবুজের সমারোহ। মৌসুমি ফুল আর ফসলে ভরা অসংখ্য ক্ষেত।
মাঠের আইল ধরে সামনে আগালে চোখে পড়ে রোমেলদের পুরোনো তালপুকুর। তালপুকুরের পাশেই বড় বড় দুটো বুড়ো শিরীষ গাছ। শিরীষ গাছের বাঁপাশে তিন যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক বয়সী অশ্বত্থ। বছর খানেক আগে সে গাছের উঁচু ডালে বাসা বানিয়েছিল মা চিল। খুব সুন্দর করে শুকনো লতাপাতা, খড়কুটো, কাগজ, টুকরো কাপড় আর ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে মজবুত করে বাসা বানিয়েছিল সে।
বাসা তৈরি হওয়ার পর ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নিশ্চিন্তে নতুন বাসায় ওঠে মা চিল। এখানে খাবারের অভাব নেই। ওপরে অসীম নীল আকাশ আর নিচে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত। পাশে জলাশয়।

ইচ্ছে হলেই প্রতিদিন দু’চারটি পুঁটি কিংবা ধানক্ষেতের পাশ থেকে ইঁদুর বা ব্যাঙ ধরে আনতে খুব একটা কষ্ট হয় না মা চিলের। বাচ্চাদের এখন বেশি বেশি খাবারের দরকার। নিত্য নতুন বায়না করে তারা। সে জন্য এখানে বাসা বানিয়েছে সে।
বাচ্চারা বড় হয়ে উঠছে। দুটো বাচ্চাই ফুটফুটে সুন্দর। মাথার দিকটায় তুলতুলে মখমলের মতো ধবধবে সাদা রঙের পালক। ডানা দুটো লালচে খয়েরি। ডানার শেষপ্রান্তে কালো পালকে সাজানো। বুকে-পিঠে সাদা আর খয়েরি কারুকাজ। বাচ্চাদের কাজল কালো চোখের দিকে তাকালে মায়ের মন খুশিতে নেচে ওঠে।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মা চিল ঘুম থেকে জেগে যায়। এরপর বাচ্চাদের জাগিয়ে দিয়ে খাবারের খোঁজে বের হয় সে। কোনোদিন মাছ, কোনোদিন হাঁসের বাচ্চা, কোনো দিন মুরগির ছাও আবার কোনো কোনো দিন পোকামাকড় ধরে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চারা মজা করে খায় আর খুশিতে টিউ টিউ করে শব্দ করে। সকালে খাবার শেষ হলে মা চিল বেরিয়ে যায়। সারাদিন ঘুরে ঘুরে খাবার জোগাড় করে সন্ধ্যাবেলা ফিরে আসে। তারপর বাচ্চাদের খাইয়ে দিয়ে পালকের নিচে ওমে ওমে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বাচ্চারা চিউ চিউ করে ডানার নিচে ঘুমিয়ে পড়ে।
মা চিলের দুই ছানার নাম চিলিং আর চিচিং। ওরা এখনো উড়তে শিখেনি। চিচিং একদিন মায়ের কাছে বায়না করল-কাঁকড়া খাবে। আর চিলিং বায়না ধরল, সে কিছুতেই কাঁকড়া খাবে না হাঁসের ছানা খেতে চায়।

মা চিল পড়ল দোটানায়। কাঁকড়া ও মাছ সহজে পাওয়া গেলেও হাঁসের ছানা মেলানো কষ্টকর।
কী আর করা। বাচ্চারা খেতে চেয়েছে। তাই যে করেই হোক একটি হাঁসের ছানা তার চাই-ই চাই। পরদিন সকাল সকাল সে আকাশের দিকে উঠে গিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল কোথায় একটি হাঁসের ছানা পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর দূর থেকে একটি হাঁসের প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজ শুনতে পেল মা চিল। শাঁ শাঁ করে সেদিকে উড়ে যেতে লাগল।
পাশের গ্রামের এক গৃহস্থের আঙিনা থেকে সে যেই না ছানার দিকে ছোঁ মারল অমনি প্যাঁক প্যাঁক শব্দে মা হাঁস চারপাশ মাতোয়ারা করে ফেলল। গৃহস্থ বেরিয়ে এসে বন্দুক তাক করতেই একটি গুলি শাঁ করে চলে গেল মা চিলের ডানার ভেতর দিয়ে। কোনোরকমে উড়তে উড়তে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বাসায় পৌঁছাল চিল । হাঁসের ছানা আর কাঁকড়া তখনো তার ঠোঁটে। খাবার দেখে চিলিং আর চিচিং ভীষণ খুশি হলো কিন্তু মায়ের ডানায় কেন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত সে কথা বুঝতে পারল না। বাচ্চাদের রাতের খাবারের পর মা চিল সারাদিনের সমস্ত ঘটনা খুলে বলল কিভাবে তার ডানা ভেঙে গেছে। মায়ের কথা শুনে চিচিং খুব আহত হলো। চোখে জল চলে এলো। চিলিং মায়ের গলা জড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
দু’জনে বলল- মাগো, আমরা আর কখনো তোমার অবাধ্য হবো না। কখনো আর অন্যের জিনিস খেতে চাইব না। তুমি আমাদের যা যা এনে দেবে আমরা সেটিই খাব আর খুশি থাকব। মা চিল তখনো ব্যথায় কাতরাতে থাকে। চিলিং মাকে পানি এনে খাইয়ে দেয় আর চিচিং মধু ও চুন দিয়ে মায়ের ডানায় প্রলেপ দিয়ে দেয়। মা খুশি হয়ে দু’জনকেই ডানার নিচে নিয়ে আদর করতে লাগল।