নিতুদের বাড়ির সামনে ছোটো একটি ডোবা। আয়নার মতো চকচকে পানি। কানায় কানায় টইটম্বুর। বাতাস বইলে পানিতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হয়। নিতু শব্দ শুনতে পায়। তার কাছে ভালো লাগে শুনতে। মন ছুঁয়ে যায়।
আজ সকাল বেলা নিতু ডোবার দিকে তাকিয়ে ভারি অবাক হলো। পানিতে সারি সারি মাছের ঝাঁক। দল বেঁধে হুটোপুটি করছে। সে তার বাবাকে বলল- আব্বু এগুলো কী মাছ?
আনিস সাহেব হেসে দিয়ে বললেন- পুঁটি মাছ।
পুঁটি মাছ তো সাদা শরীরের হয়। এগুলোর শরীরে লাল দাগ কেন?
লাল দাগ হলো পুঁটি মাছের পোশাক।
নিতু চোখ বড় করে বলল, ওমা! কি বলো আব্বু! পুঁটি মাছের আবার পোশাক হয় না-কি?
হ্যাঁ হয়। মানুষের পোশাক হলে মাছের হবে না কেন! ওদেরও হয়। তবে পুঁটিরা সব সময় পোশাক পরে না। বিশেষ দিনে পরে।
বিশেষ দিন মানে?
আনিস সাহেব মেয়ের ব্যাকুলতা দেখে খুশি হলেন। অজানা বিষয়ের প্রতি নিতুর আগ্রহ বেশ। পটাপট প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে চায়। আনিস সাহেবের ধারণা এ মেয়ে বড় হয়ে ভালো কিছু করবে। তিনি মেয়ের গাল ছুঁয়ে বললেন, বর্ষাকাল হলো পুঁটি মাছের বিশেষ দিন। বৃষ্টি এলে এরা শাড়ি পরে ঘোরাঘুরি করে। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যায়। আমরা যেমন ঈদের দিন নতুন জামা পরে ঘোরাঘুরি করি। ওরাও ঠিক সে রকম। মানুষের মতো।
নিতু বাবার কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হলো। পুঁটি মাছের লাল টকটকে পোশাক আছে এটা সে চোখকে বিশ্বাস করাতে পারে না। তাই প্রতিদিন নিতু ডোবার দিকে তাকিয়ে থাকে। পুঁটি মাছ দেখে। অসম্ভব ভালো লাগে তার। কেউ যেন মাছ ধরতে না পারে এজন্য নিতু বসে বসে ডোবা পাহারা দেয়। ঘর থেকে খুদকুঁড়ো এনে পানিতে গুলে দেয়। তখন পুঁটি মাছগুলো কিনারায় চলে আসে। নাক ভাসিয়ে কপাকপ খায়। আনন্দে নিতু অভিভূত হয়।
কিন্তু নিতু যখন স্কুলে চলে যায় তখন ডোবা পাহারা দেয়ার কেউ থাকে না। নিতুর মা সকাল বেলা তাকে নিয়ে স্কুলে যান। আনিস সাহেব থাকেন অফিসে। ডোবার চারদিক খালি পড়ে থাকে। হুট করে কেউ যদি মাছ ধরে ফেলে তাহলে কেউ জানবেও না। এজন্য স্কুলে নিতুর ভালো লাগে না। বুকের ভেতর খচখচ করে। এই বুঝি কেউ মাছ ধরে ফেলল। মাছের চিন্তায় পড়ায় মন বসে না তার।
বিকেল বেলা নিতু যখন স্কুল থেকে ফিরল তখন সে ডোবায় গিয়ে দেখল পানিতে অসংখ্য ব্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাং ডাকছে। কপাকপ পুঁটি মাছ খাচ্ছে।
নিতুর চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করল। তার শখের পুঁটি মাছগুলো ব্যাঙগুষ্টি খেয়ে ফেলছে। নিতুর মন মানল না। সে তার বাবার কাছে নালিশ করল। আনিস সাহেব নরম করে বললেন, তুমি চিন্তা করো না মা। ব্যাঙ তাড়ানোর বুদ্ধি আছে আমার কাছে। ওই দিন আনিস সাহেব শহর থেকে একটি বড় বোয়াল মাছ কিনে এনে ডোবায় ছেড়ে দিলেন। এক রাতে বোয়াল বেচারা সবগুলো ব্যাঙ খেয়ে সাফ করে ফেলল।
সকালে নিতু ডোবার কাছে গিয়ে দেখল কোথাও কোনো ব্যাঙ নেই। সারা ডোবা জুড়ে পুঁটি মাছের ঝাঁক। শাড়ি পড়ে সাঁতরাচ্ছে। আনন্দে নিতুর মন নেচে উঠল। সে তার বাবাকে বলল, আব্বু ব্যাঙ গেল কই! আনিস সাহেব মিটিমিটি হাসেন। কিছু বলেন না। সেই থেকে নিতুর আর কোনো চিন্তা নেই। সে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে। পড়াশোনা করছে। আর ডোবায় তার শখের পুঁটি মাছগুলো বড় হচ্ছে।